Published : 14 Oct 2023, 03:49 PM
বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলোয় সংবাদমাধ্যমের জন্য ‘মিক্সড জোন’ বলে একটা ব্যাপার থাকে। প্রতিটি ম্যাচ শেষে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের বাইরে যেটা হয়ে থাকে। সেখানে খুব কাছ থেকে সংবাদমাধ্যমের মুখোমখি হন এক বা একাধিক ক্রিকেটার-কোচ। মূল টুর্নামেন্ট কাভার করতে যাওয়া সংবাদকর্মীদের জন্য বিশেষ আয়োজন সেটি। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর বাংলাদেশের সংবাদ সম্মেলন শেষে সবার অপেক্ষার পালা চলল। মিক্সড জোনে কারও আসার নাম নেই। সংবাদকর্মীরা ধৈর্যের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছানোর পর অবশেষে দেখা মেলে তাদের।
হতে পারে, ম্যাচ শেষ হতেই আলোচনায় বসে গিয়েছিল দল। পারফরম্যান্সের তাৎক্ষণিক কাটাছেঁড়া চলছিল। কিংবা হতে পারে, অন্য কোনো কারণে তাদের এই দেরি। তবে দলের আবহ যে থমথমে, তা নিয়ে সংশয় সামান্যই। শারীরিক ক্লান্তিও অবশ্য থাকার কথা তাদের। ভিন্ন দুই ধরনের কন্ডিশনে বিশ্বকাপের তিনটি ম্যাচ খেলতে হয়েছে এক সপ্তাহের মধ্যে। শরীরের তাই কিছুটা বিদ্রোহ করার কথা।
তবে শারীরিক ধকলের চেয়েও বড় ক্লান্তি টানা পরাজয়ের মানসিক ধাক্কা। ইংল্যান্ড ও নিউ জিল্যান্ডের কাছে পরপর দুই ম্যাচে হেরে বাংলাদেশ দলের মানসিকতায় বড় চোট লাগার কথা। সেই ক্ষতকে সঙ্গী করে শনিবার দুপুরে চেন্নাই থেকে পুনেতে পা রাখছে দল।
দলের অবস্থা বুঝতে পেরেই ব্যবস্থা নিচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্ট। আগামী বৃহস্পতিবার ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের লড়াই। সেই ম্যাচের প্রস্তুতি পর্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাই শরীরকে চাঙা করা, মনকে ফুরফুরে করে তোলা। বাংলদেশের সহকারী কোচ নিক পোথাস জানালেন, ক্রিকেট থেকে একটু দূরে সরেই ভারতীয় চ্যালেঞ্জের জন্য তৈরি হবে দল।
“আমাদের আপাতত ভালোরকম বিশ্রাম দরকার। বিশ্বকাপে একটা বিপদের দিক হলো, একের পর এক ম্যাচ খুব দ্রুত চলে আসে। প্রচণ্ড চাপের একেকটি ম্যাচ। এসব ম্যাচ অনেকটাই শুষে নেয়। একটা পরিস্থিতির চক্রে পড়ে যেতে হয়। মনে হয় যে, অনুশীলন করলে ফল মিলবে, আদৌতে তা হয় না। আমাদের ক্রিকেটারদের আমরা ভালোরকম শারীরিক ও মানসিক বিশ্রাম দেব। এরপর ভারতের জন্য তৈরি হব।”

চেন্নাইয়ের হোটেল থেকে পুনের হোটেলে ঘণ্টা তিনেকের ভ্রমণপর্ব বাদ দিলে শনিবার দলের বিশ্রামই। এছাড়াও অনুশীলন রাখা হয়নি রোব ও সোমবার। এরপর মঙ্গল ও বুধবার দুই দিন অনুশীলন করে মহারাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন মাঠে রোহিত শর্মার দলের মুখোমুখি হবেন সাকিব আল হাসানরা।
সাকিবকে নিয়ে অবশ্য কিঞ্চিৎ শঙ্কার জায়গা আছে। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সময় পায়ে টান লাগে তার। পরে বোলিং করলেও নিজের ওভারগুলো শেষ করে বেরিয়ে যান মাঠ থেকে। রাতে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে স্ক্যানও করানো হয় তার। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, স্ক্যান রিপোর্ট পাওয়া যায়নি বলেই জানালেন দলের অপারেশন্স ম্যানেজার রাবিদ ইমাম।
বিশ্রাম শেষে ক্রিকেটীয় প্রস্তুতি যখন শুরু হবে, সেখানে মূল মনোযোগ থাকবে অবশ্যই টপ অর্ডারের মরচে সরানো, ফাঁক-ফোকড়গুলো সারাই-ঝালাই করা। ম্যাচের পর ম্যাচে শুরুতেই নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে ভিত। উদ্বোধনী জুটি দাঁড়াচ্ছে না, টপ অর্ডার ভেঙে পড়ছে নিয়মিত। সবশেষ ১১ ম্যাচের ৯টিতেই ১০০ রান ছুঁতে ছুঁতে উইকেট পড়েছে ৪টি।
টপ অর্ডারের সেই রুগ্ন অবস্থার ছাপ পড়েছে গোটা ইনিংসেই। সবশেষ ১৩ ইনিংসে আড়াইশ ছুঁতে পেরেছে দল দুইবার।

ব্যাটিংয়ের শুরুটা নিয়ে দুর্ভাবনার কথা মেনে নিচ্ছেন পোথাস। তবে কঠোর পরিশ্রমের পথ ধরে ব্যাটসম্যানরা সমাধান খুঁজে নেবে বলেই বিশ্বাস তার।
“এটা স্বীকার করা বা না করার ব্যাপার নয়, এটা তো পরিস্কার (টপ অর্ডারের দুর্বলতা)। যখন কোনো কিছু এতটা স্পষ্ট হয়, তখন তা সবারই চোখে পড়ে। আমাদের জন্য বাস্তবতা এখন হলো, সমাধান বের করা। পথ খুঁজে বের করতে কঠোর পরিশ্রম করছে ব্যাটাররা। উঁচু মানের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে খেললে নিজের সেরা চেহারায় থাকতে হবে। নিজের খেলাটা মেলে ধরার জন্য সময় ও সুযোগ খুব বেশি মেলে না এখানে। কারণ, তারা (প্রতিপক্ষের বোলাররা) সবসময়ই চেপে ধরে। এরকমই হয়, এটা বিশ্বকাপ।”
সেই টপ অর্ডারদের একজন, নাজমুল হোসেন শান্ত টুর্নামেন্ট শুরু করেছিলেন আফগানিস্তানের বিপক্ষে কার্যকর ব্যাটিংয়ে ফিফটি দিয়ে। কিন্তু পরের দুই ম্যাচে রান পাননি। টপ অর্ডারে তানজিদ হাসান ধুঁকছেন পায়ের নিচের জমিন শক্ত করতে। লিটন কুমার দাস ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দারুণ ব্যাটিংয়ে ফিফটি করলেও নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে আত্মঘাতী শটে বিদায় নিয়েছেন প্রথম বলে।
স্কিলের উন্নতি রাতারাতি সম্ভব নয়। শান্ত তাই ভালো করেই জানেন, মানসিকভাবে শক্ত থেকে দলের চাওয়া বয়ে বেড়ানোর বিকল্প নেই।
“প্রতিদিনই তো পরিকল্পনা করা হয়, আমরা কীভাবে ভালো করতে পারি। তবে আমার কাছে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে যে, আমাদের আরও দায়িত্ব নিয়ে ব্যাট করা উচিত। কারণ টপ অর্ডার, অবশ্যই চ্যালেঞ্জ থাকবে… নতুন বল… ওটার জন্যই আমরা ওপরে ব্যাট করি, ওটা আমাদের দায়িত্ব। সবাই সবার ভূমিকা জানে। আমার মনে হয়, আরেকটু দায়িত্ব নিয়ে আমরা যদি ব্যাট করি… এখানে স্কিল খুব বড় ব্যাপার নয়, আরেকটু দায়িত্ব নিয়ে ব্যাট করা উচিত।”
সেমি-ফাইনালের উঠে ইতিহাস গড়ার লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করলেও তিন ম্যাচ শেষে বাস্তবতার কঠিন আঘাতে তা টালমাটাল এখনই। শান্তও এখন বড় স্বপ্নের কথা বলছেন না নির্দিষ্ট করে। একটা ম্যাচে ভালো কিছু করতে পারলেই দলের আবহ বদলে যাবে বলে বিশ্বাস তার।
“অবশ্যই আমাদের ভালো খেলতে হবে। আগে থেকেই শুধু যদি বলে যে ‘এটা করতে চাই, ওটা করতে চাই’, এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কত ভালো ক্রিকেট খেলছি। আমার কাছে তাই মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ হলো, কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারি। একটা ভালো ম্যাচ দলের পুরো পরিবেশ বদলে দেবে, আমার মনে হয়।