নিন্দার কাঁটা থেকে সেঞ্চুরির ফুল
আগের টেস্টে দুই ইনিংসেই বাজে শটে আউট হয়ে তুমুল সমালোচনার শিকার হওয়া ব্যাটসম্যান এবার ঘুরে দাঁড়ালেন দারুণ সেঞ্চুরিতে।
জেডেন সিলসের ডেলিভারিটি ফাইন লেগের দিতে ঠেলেই রানের জন্য ছুটলেন তাওহিদ হৃদয়। ডাগআউট ও ড্রেসিং রুমে থাকা তার সতীর্থরা ও কোচরা ততক্ষণে দাঁড়িয়ে তালি দিতে শুরু করেছেন। সবার মুখে চওড়া হাসি। কিন্তু হৃদয় উদযাপন করলেন না। তার মুখে মুচকি হাসি। তিনি তো জানেন ঘটনাটা কী! আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত দেখেই খোলাসা হলো রহস্য। ব্যাট থেকে নয়, সেই রানটি ছিল আসলে লেগ বাই। যাকে বলে, পুরো ‘অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স!’
শেষ পর্যন্ত অবশ্য বিষাদময় সমাপ্তি হলো না। মধুর প্রাপ্তির জন্য সময়ও বেশি লাগল না। পরের ওভারের প্রথম বলেই সিঙ্গল নিয়ে হৃদয় পৌঁছে গেলেন স্বপ্নের ঠিকানায়। যেটির নাম, প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি!
এবার তিনি ঠিকই উদযাপন করলেন। হেলমেট খুলে ব্যাটে ঝুলিয়ে উঁচিয়ে ধরলেন, তার চেনা উদযাপনের দৃশ্য। চুমু এঁকে দিলেন হেলমেটের সামনে দলীয় প্রতীকে। আরও একবার উল্লাসের উপলক্ষ পেল তার সতীর্থরা।
সেই হৃদয়, আগের টেস্টে বাংলাদেশের পরাজয়ে যাকে বলা হয়েছিল সবচেয়ে বড় ‘খলনায়ক।’ দুই ইনিংসেই তিনি আউট হয়েছিলেন ভীষণ দৃষ্টিকটূ দুটি শটে। বিশেষ করে, দ্বিতীয় ইনিংসের শটটি ছিল অবিশ্বাস্যরকমের বাজে, আত্মহত্যা বললেও যেটিকে কম বলা হয়।
যদিও সেটি ছিল কেবল তার দ্বিতীয় টেস্ট এবং মুশফিকুর রহিম শেষ মুহূর্তে ছিটকে পড়ায় তার সুযোগ মিলেছিল, কিন্তু তার শট দুটি এতটাই অগ্রহণযোগ্য ছিল যে, তার অনভিজ্ঞতাও সেখানে ঢাল হয়ে তাকে সমালোচনার তির থেকে আড়াল করতে পারেনি। সেটিকে পেছনে ফেলার একমাত্র উপায় ছিল ব্যাটকেই ঢাল বানানো। ভুল থেকে শিক্ষা পাওয়া প্রমাণ মেলে ধরা। রানের স্রোতেই সমালোচনাকে ঠেলে দেওয়া।
হৃদয় সেটি পারলেন দারুণভাবে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় দিনটি শেষ করেছিলেন তিনি ২৯ রানে অপরাজিত থেকে। তৃতীয় দিন প্রথম সকালেই দারুণ ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনীতে কাঙ্ক্ষিত মাইলফলকে পা রাখলেন তিনি। তৃতীয় টেস্টেই পেলে প্রথম সেঞ্চুরির স্বাদ।
মুমিনুল হক ছিটকে না পড়লে অবশ্য এই টেস্টেও সুযোগ হতো না তার। ভাগ্যই তাকে করে দিয়েছিল প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ। তিনি লুফে নিলেন দারুণভাবে।
তার নিজের জন্য যেমন, দলের জন্যও এই ইনিংসটি ছিল খুবই জরুরি। আগের দিন ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল দল। তৃতীয় দিন প্রথম সেশনে একে একে বিদায় নেন বড় তিন ভরসা মুশফিকুর রহিম, লিটন কুমার দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। সবাই উইকেট হারান খামখেয়ালি শটে, ক্যারিবিয়ানদের ক্যাচিং প্র্যাকটিস করিয়ে। পরে অল্পতে ফিরে যান হাসান মাহমুদও।
কিন্তু হৃদয় যেন ছিলেন অন্য মাঠে, অন্য ধ্যানে, অন্য প্রাণে। খেলছিলেন যেন ভিন্ন উইকেটে। অন্য প্রান্তে সতীর্থদের আসা-যাওয়ার মাঝেও তিনি উদ্ভাসিত ছিলেন আপন রূপে।
শুধু রানই করেননি, দেখিয়েছিন তাড়না ও গতিময়তা। আগের দিন এখানেই তার দিকে একটু আঙুল তোলার অবকাশ ছিল। ২৯ রান করতে ৮০ বল খেলেছিলেন তিনি। কিন্তু শনিবার সকাল থেকেই তিনি ছিলেন ইতিবাচক। বাজে বল পেলে যেমন ফায়দা নিতে ভুল করেননি, তেমনি তাড়না ও স্কিল দিয়ে ভালো বলকেও পাঠিয়েছেন বাউন্ডারিতে।
আগের দিনের মন্থরতার কারণে ফিফটি করতে বল লেগেছে ১০৯টি। সেখান থেকে পরের ৫০ করেছেন স্রেফ ৬২ বলেই।
লাঞ্চের সময় তার রান ১৭১ বলে অপরাজিত ১০০। এর অর্ধেক হয়েছে বাউন্ডারি থেকে। ১১টি চারের সঙ্গে মেরেছেন টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম ছক্কা।
দলের প্রায় অর্ধেক রান এসেছে তার ব্যাট থেকেই। দলের অবস্থা তাই অনুমেয়ই! লাঞ্চের সময় রান ৭ উইকেটে ২০৫। আসলে রান ধরতে হবে ৮ উইকেটে ২০৫, আগের দিন চোট পেয়ে মাঠ ছেড়ে যাওয়া সাদমান ইসলাম পারবেন না ব্যাটিংয়ে নামতে।
ক্রিজে তার সঙ্গী এখন তাইজুল ইসলাম, বাইরে আছেন তাসকিন আহমেদ। দলকে কতদূর নিতে পারবেন হৃদয়, সেটিই এখন দেখার।
তবে তিনি নিজেকে যেখানে নিয়ে গেছেন, সেটির কৃতিত্ব দিতেই হবে। মিরপুরের ২২ গজের নিন্দার কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে সিলেটের ২২ গজে তিনি ফোটালেন মুগ্ধতার ফুল।
