হৃদয়ের যে দুটি ‘বুলেটে’ বিদীর্ণ বাংলাদেশ
মিরপুর টেস্টের দুই ইনিংসে এমন দুটি শটে আউট হয়েছেন তাওহিদ হৃদয়, যাবতীয় ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণে যেটির ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন।
তাওহিদ হৃদয় কি বাংলাদেশের হয়েই খেলছেন? অনেকে ভাবতে পারেন, এ আবার কেমন প্রশ্ন! কিন্তু মিরপুর টেস্ট দেখে থাকলে প্রশ্নটি খুব অবান্তর মনে হওয়ার কথা নয়। হৃদয় কি আসলেই বাংলাদেশের হয়েই খেলছেন?
প্রথম ইনিংসে ৪২ রান এসেছে তার ব্যাট থেকে। এখনও পর্যন্ত ম্যাচের সবচেযে বড় জুটির অংশীদারও তিনি। কিন্তু সেই বাস্তবতা এখন ভীষণ গৌণ। তিনি নিজেই চাপা দিয়েছেন তার লড়িয়ে ইনিংসটুকু। বরং ভয়ঙ্কর কোনো দুঃস্বপ্নের মতো বিভীষিকা ছড়াচ্ছে তার দুটি শটের দৃশ্যটুকু।
ক্রিকেটে বাজে শট অনেক সময়ই খেলেন ব্যাটসম্যান। উইকেট ছুড়ে দেওয়া, বিলিয়ে দেওয়ার নজির আছে অসংখ্য। কিন্তু মিরপুর টেস্টে হৃদয় যা করলেন, অবিশ্বাস্য বললেও আসলে বলা হয় না কিছুই। কোনো ক্রিকেটীয় ভাবনায় ব্যাখ্যা করা যায় না তার দুটি শট।
প্রথম ইনিংসে তার শটটি দেখেই চোখ বিস্ফোরিত হয়ে যাওয়ার কথা অনেকের। প্রথম দিনে লড়িয়ে ইনিংস খেলে মাঠ ছেড়ে গিয়েছিলেন তিনি ক্র্যাম্প করায়। পরদিন সেঞ্চুরিয়ান সাদমান ইসলামের বিদায়ের পর তিনি নামলেন তরতাজা হয়ে। দলের অবস্থান তখনও বেশ শক্ত। আর একটি জুটি গড়ে উঠলে বড় স্কোরের পথে এগোতে পারত দল। হৃদয়ের কাছে চাওয়া খুব বেশি কিছু ছিল না। আগের দিনের ব্যাটিং ধরে রাখলেই হতো।
হৃদয় যেন স্রেফ বুড়ো আঙুল দেখালেন দলের প্রত্যাশাকে।
একটু আগে দল বড় একটি উইকেট হারানোর পরও হৃদয়ের খায়েশ হলো স্লগ করার। ক্রিকেটে তো স্লগ করারও একটি ব্যাকরণ আছে। কিন্তু হৃদয়ের পা, মাথা, ব্যাট- কোনোকিছুই সেই ব্যাকরণের ধার ধারেনি। ব্যস, নিরীহ ধরনের এক ডেলিভারিতে কুৎসিত ধরনের এক বোল্ড।
সাদমানের বিদায়ের পর হৃদয়ের ওই শট ত্বরান্বিত করে বাংলাদেশের ধস। ৫১ রানের মধ্যে পতন হয় শেষ ৭ উইকেটের।
ক্রিকেটে কখনও কখনও এরকম হয়ে যায়, মুহূর্তের ভুল কিংবা অমনোযোগিতায় ব্যাখ্যাতীত শট খেলে ফেলেন ব্যাটসম্যানরা। কিন্তু এক ম্যাচে দুবার হলে কি সেটির পেছনে ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যা খোঁজা যায়?
পরিস্থিতিটা একটু তুলে ধরা যাক। সাদমান ইসলাম তখন মাত্রই আউট হয়েছেন। প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তিনি। একটা প্রান্ত আগলে রেখে এগিয়ে নিয়েছেন দলকে। তার বিদায়ের পর দরকার এমন একজনকে, যিনি লড়াইটা চালিয়ে যাবেন।
ক্রিজে গেলেন হৃদয়। লড়াই? তিনি যেন পরিহাস করলেন পরিস্থিতিকে।
প্রথম বলটি মিড উইকেটের দিকে খেললেন। পরের বলেই হয়তো তার মনে হলো, ম্যাচ জয়ের জন্য এক বলে প্রয়োজন ছয় রান! রস্টন চেইসের ঝুলিয়ে দেওয়া বলে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে উড়িয়ে মারার চেষ্টা করলেন। সহজ ক্যাচ মিড অনে।
প্রথম ইনিংসের শটে যদি হতাশ আর বিস্ময় মিশে থাকে, দ্বিতীয় ইনিংসের শটটি দেখে অধিক শোকে পাথর হয়ে যাওয়ার কথা। কেবল মনে হতে পারে, এটিও কি সম্ভব…!
এসব শটের ক্ষেত্রে ক্রিকেটে সাধারণত বলা হয় ‘ব্রেইন ফেড’ মুহূর্ত। কিন্তু দুই ইনিংসে হৃদয়ের এমন দুটি শটের যুগলবন্দিকে আসলে এই ক্যাটেগরিতেও রাখা যাচ্ছে না। কোনো ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণ, মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, স্বাভাবিক বোধ, সবকিছুর সীমানা ছাড়ানো শট এই দুটি।
দিনশেষে, ক্রিকেট তো স্রেফ খেলাই। বিনোদন। এখানে কোনো ভুলকে ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা যায় না। তবে এই টেস্টে হৃদয় দুইবার যা করলেন, তাকে ক্রিকেটীয় কাঠগড়ায় তোলা যায় অনায়াসেই।
যদিও এটি তার মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট। তবে সাদা বলের ক্রিকেটে ১২৫ ম্যাচ তিনি খেলে ফেলেছেন। অভিজ্ঞতার ঘাটতির ব্যাপার তাই এখানে খাটে না। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বয়স হয়ে গেছে সাড়ে তিন বছর।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার রেকর্ড দারুণ। ১৮ ম্যাচে চারটি করে সেঞ্চুরি ও ফিফটি করেছেন। ব্যাটিং গড় ৫৬। কিছুদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে ৩৫০ রানের রেকর্ড ইনিংস খেলেছেন। ডাবর সেঞ্চুরিও করেছেন আগে। সামনে তাকিযে মুশফিকুর রহিম-উত্তর যুগে বাংলাদেশের মিডল অর্ডারের সম্ভাব্য স্তম্ভ ভাবা হচ্ছে তাকে।
সেই প্রত্যাশা তিনি মেটাতে পারবেন কি না, সময়ই বলবে। তবে সেই ভাবনায় কাঁটা হয়ে ফুটবে এই ম্যাচের শট দুটি। তার টেম্পারমেন্টের চরম বাজে বিজ্ঞাপন হয়ে থাকবে ম্যাচটি।
ভবিষ্যতকে সময়ের হাতে তুলে দিয়ে যদি স্রেফ এই ম্যাচে তাকানো হয়, ব্যাটে-বলে ছোট-বড় কিছু ঘাটতি আর ব্যর্থতা মিলিয়েই এখন শঙ্কার দোলাচলে দুলছে বাংলাদেশ। তবে যদি শুধু একজনের কথা বলতে হয়, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আঙুল উঠে যায় হৃদয়ের দিক।
হৃদয়ের শট দুটি যেন বুলেট, বিদীর্ণ করে দিয়েছে বাংলাদেশের আশা। এখন চেষ্টা চলছে অস্ত্রোপচার করে সম্ভাবনাটুকু জীবিত রাখার।
