০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

হৃদয়ের রূপকথায় বাংলাদেশের স্বপ্নময় প্রত্যাবর্তন

রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে অবিস্মরণীয় ইনিংস উপহার দিলেন তাওহিদ হৃদয়, সিলেট টেস্টে খাদের কিনারা থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়াল বাংলাদেশ।

আরিফুল ইসলাম রনি আরিফুল ইসলাম রনি

Published : 07 Nov 2026, 05:35 PM

Updated : 07 Nov 2026, 05:35 PM

কিছু কিছু দিন আসে, রূপকথা যখন বাস্তব হয়ে ধরা দেয়, স্বপ্নেরা সত্যি হয়ে চোখে মায়াঞ্জন বুলিয়ে দেয়। বাংলাদেশ ক্রিকেটে এমন একটি দিন এলো। তাওহিদ হৃদয়ের ওপর কী ভর করল কে জানে! টেস্ট ক্রিকেটের নবীন ব্যাটসম্যান হয়ে উঠলেন ইতিহাস গড়ার মহানায়ক। বীরোচিত ব্যাটিংয়ে তিনি উপহার দিলেন অবিশ্বাস্য এক ইনিংস। একের পর এক রেকর্ড লুটিয়ে তার পায়ে। খাদের কিনারায় থাকা দল ফিরে পেল জয়ের আশা দেখার সাহস।

সিলেট টেস্টে রেকর্ডের সুনামি বইয়ে দিয়ে অবিস্মরণীয় ইনিংস খেললেন হৃদয়। কোণঠাসা অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অভাবনীয়ভাবে লিড নিল বাংলাদেশ।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪৫৬ রানের জবাবে এক পর্যায়ে বাংলাদেশের রান ছিল ৭ উইকেটে ১৮৪। কার্যত যা, ৮ উইকেটে ১৮৪। আগেই নিশ্চিত ছিল চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া সাদমান ইসলাম নামতে পারবেন না ব্যাটিংয়ে। সেখান থেকে প্রতিরোধ আর পাল্টা আক্রমণের মহাকাব্য রচনা করে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হলো ৩৮৬ রানে।

রেকর্ডময় ইনিংসে ২২ চার ও ১১ ছক্কায় ৩৫৯ বলে ২৪২ রানে অপরাজিত রয়ে যান হৃদয়। বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ডে তিনি পেরিয়ে যান তার আদর্শ ও একই শহর বগুড়ার সন্তান মুশফিকুর রহিমকে।

তামিম ইকবালের ৭ ছক্কা পেরিয়ে বাংলাদেশের রেকর্ড তিনি এগিয়ে নিয়ে যান অনেকটা। আরেকটি ছক্কা হলে বিশ্বরেকর্ডই ছুঁয়ে ফেলতেন!

প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যানও তিনিই। স্রেফ তিন টেস্ট খেলেই তার মতো ডাবল সেঞ্চুরি পাননি আর কেউ। রেকর্ড ও কীর্তি গড়েছেন তিনি আরও অনেক।

এই নায়কোচিত অভিযানে বুক চিতিয়ে তাকে ভরসা জুগিয়েছেন তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদ। অষ্টম উইকেটে তাইজুলের সঙ্গে জুটি হয়েছে ১১৭ রানের, যা এই মাঠের সর্বোচ্চ, বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। নবম উইকেটে তাসকিনের সঙ্গে ৮৫ রানের জুটিও এই মাঠের রেকর্ড।

শেষ দুই জুটিতে আসে ২০২ রান, সেখানে ১৬১ রানই হৃদয়ের। অনেক সিঙ্গল তিনি নেননি। লোয়ার অর্ডারদের আগলে রেখে ওভারের চতুর্থ বা পঞ্চম বলে সিঙ্গল নিয়েছেন। এভাবেই গড়েছেন এই সৌধ।

অথচ এই টেস্টে বা এই সিরিজে তার মাঠে নামার কথাই ছিল না। আগের টেস্টে তিনি শেষ মুহূর্তে সুযোগ পেয়েছিলেন মুশফিকুর রহিমের চোটে। সেই ম্যাচে দুই ইনিংসেই বাজে শটে আউট হওয়ায় তুমুল সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন। এই টেস্টেও তিনি খেলতে পারছেন মুমিনুল হক সুস্থ না থাকায়। সুযোগ পেয়ে আগের টেস্টের ভুলে প্রায়শ্চিত্ত তো করলেনই, নিজের নিয়তি নিজেই লিখলেন নতুন করে।

আগের দিন ৪০ ওভার খেলে বাংলাদেশের রান ছিল ৩ উইকেটে ৮৮। সেই মন্থর ইনিংস আর ‘ইন্টেন্টের’ ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ ছিল অনেক। নতুন দিনে দেখ নতুন ধরন। শুরু থেকেই রান তুলতে তৎপর ছিলেন হৃদয় ও মুশফিকুর রহিম। দিনের প্রথম সাত ওভারে রান আসে ওভারপ্রতি সাড়ে চার করে।

এরপর এক প্রান্তে প্রস্ফুটিত হতে থাকেন হৃদয়, আরেকপ্রান্তে সুবাস ক্রমেই যেতে থাকে মিলিয়ে।

আলগা শটে উইকেট বিলিয়ে দেন মুশফিক (৩৪)। ক্রিজে গিয়েই ঝটপট দুটি চার মেরে একই পথ ধরেন লিটন দাস।

হৃদয় আর মেহেদী হাসান মিরাজের জুটিকে দারুণ সম্ভাবনাময় মনে হচ্ছিল। সমানতালেই খেলছিলেন দুজন। সেটির সমাপ্তি জাস্টিন গ্রেভসের বুদ্ধিমত্তায়। রস্টন চেইসের বলে প্যাডল সুইপ করতে একটু আগেই পজিশনে চলে যান মিরাজ। সেটিই অনুমান করে লেগ সাইডে সরে দিয়ে দারুণ ক্যাচ নেন গ্রেভস।

এরপর হাসান মাহমুদও টেকেননি বেশিক্ষণ। বাংলাদেশ তখন বড় লিড গোনার অপেক্ষায়। কে জানত, মহাকাব্যিক এক লড়াইয়ের সূচনা হবে এরপরই!

উইকেট আগলে রাখার ক্ষমতা তাইজুলের বরাবরই আছে। এই ম্যাচের আগে পাঁচ দফায় একশ মিনিটের বেশি ক্রিজে কাটিয়েছেন। ষষ্ঠটির জন্য বেছে নিলেন তিনি এই দিনকে।

৮১ রানে থাকা হৃদয় হাসানের বিদায়ের পর রস্টন চেইসকে ছক্কা ও চার মেরে বুঝিয়ে দিলেন, এখন চালিয়ে খেলেই দ্রুত কিছু রান তুলে সেঞ্চুরির চেষ্টা করবেন। সেই সেঞ্চুরি চলে এলো দ্রুতই। আগের দিন অপরাজিত ছিলেন ৮০ বলে ২৯ রানে। সেখান থেকে ফিফটি করেন ১০৯ বলে। ফিফটি থেকে শতরানে পৌঁছন ৬২ বলেই।

এরপর তাইজুল যখন নির্ভরতায় খেলতে শুরু করলেন, ভরসা পেয়ে হৃদয়ও মন দিলেন ইনিংস আরও বড় করায়। রান বাড়তে থাকল, পাল্লা দিয়ে বাড়ল বাংলাদেশের আশা।

প্রায় ২৮ ওভার টিকে থাকা এই জুটি ভাঙে ওয়ারিক্যানের বলে তাইজুল স্টাম্পড হলে। দীর্ঘক্ষণ রিপ্লে দেখে যে আউটটি দিলেন তৃতীয় আম্পায়ার, সেটি আউট না দিলেও খুব বেশি প্রশ্ন উঠত না। এতটাই জটিল সিদ্ধান্ত ছিল।

১১৭ রানের জুটিতে তাইজুল করেন ২২, হৃদয় ৯২।

তাইজুলের বিদায়ের সময় হৃদয়ের রান ছিল ১৭৩। চা বিরতির ঠিক আগের দুই বলে চার ও ছক্কা মেরে ১৯০ স্পর্শ করেন তিনি। বিরতির পর তাসকিন আগলে রাখেন প্রান্ত। হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরি হয়ে যায় দ্রুতই।

৩০৪ বলে দুইশ রানে পা রাখেন তিনি। শতরান থেকে দ্বিশতকে যেতে বল খেলেন কেবল ১৩৩টি।

সেখানেই না থেমে চার-ছক্কার জোয়ারে রানের বন্যা বইয়ে দিতে থাকেন। শেষ বিকেলে গড়বড় করে ফেলেন তাসকিন। জেডেন সিলসের বলে ব্যাটের কানায় লেগে একটি চার পেয়ে যাওয়ার পর ওই ওভারেই শর্ট বল পেয়ে হাঁকানোর চেষ্টা করেন। বল যায় সীমানার ফিল্ডারের কাছে।

কে জানে, তাসকিন আরেকটু ধৈর্য দেখালো হয়তো ওয়াসিম আকরাম ও ইয়াশাসভি জয়সওয়ালের ১২ ছক্কার রেকর্ড তিনি ছুঁতে ও ছাড়াতে পারতেন, হয়তো দেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে আড়াইশ ছুঁতে পারতেন!

অবশ্য, যা করেছেন তিনি, তাতে আক্ষেপ থাকার কথা নয়।

আক্ষেপ একটু থাকল শেষবেলায় বাংলাদেশ বোলিংয়ে নামার পর। তাসকিনের প্রথম ওভারেই দুইবার জোরাল আবেদন হলো। দুবারই আম্পায়ার আউট না দেওয়ার পর রিভিউ হারাল বাংলাদেশ। ক্যারিবিয়ানরা দিন শেষ করল কোনো উইকেট না হারিয়ে ৭ রানে।

বাংলাদেশ এখনও এগিয়ে ২৩ রানে।

দিনের প্রথম ঘণ্টার পর যদি বলা হলো দিন শেষের চিত্র হবে এমন, পাগলের প্রলাপ বলেই হয়তো উড়িয়ে দেওয়া হতো।

দিনটাই এমন, পাগলামো ভাবনাও এ দিন পেয়ে গেছে বাস্তবের জমিন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: ৩৫৬

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৪০ ওভারে ৮৮/৩