ওমারজাইয়ের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স আর তিন ওভারের ঝড়ে চ্যাম্পিয়নদের হারাল রংপুর

ব্যাটে-বলে কার্যকর অবদান রাখলেন আজমাতউল্লাহ ওমারজাই, শেষ তিন ওভারে ৫২ রান তোলা রংপুর রাইডার্স হারিয়ে দিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সকে।

ক্রীড়া প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Jan 2024, 11:13 AM
Updated : 30 Jan 2024, 11:13 AM

বিশ-বিশ চল্লিশ ওভারের ম্যাচ রূপ নিল মূলত তিন-তিন ছয় ওভারের লড়াইয়ে। ১৭ ওভার শেষেও রংপুরের স্কোরবোর্ডের ছিল রুগ্ন চেহারা। কিন্তু শেষ তিন ওভারে তান্ডব চালিয়ে তারা তুলে ফেলল ৫২ রান। রান তাড়ায় শেষ তিন ওভারে কুমিল্লার প্রয়োজন পড়ল ঠিক ৫০ রানের। তারা পারল না সেই সমীকরণ মেলাতে। আজমাতউল্লাহ ওমারজাইয়ের অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের পথ ধরে দারুণ এক জয় আদায় করে নিল রংপুর। 

শক্তি-সামর্থ্যে বিপিএলের বড় দুই দলের লড়াই উত্তেজনা ছড়াল বেশ। সেখানে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সকে ৮ রানে হারাল রংপুর রাইডার্স। 

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার ২০ ওভারে রংপুর তোলে ১৬৫ রান। তাদের কোনো ব্যাটসম্যান ছুঁতে পারেননি ৪০ রানও। তবে কার্যকর অবদান রাখেন বেশ কজন। ১৭ ওভার শেষে দলের রান ছিল স্রেফ ১১৩। পরের তিন ওভারে তারা পাল্টে দেয় চিত্র।

রান তাড়ায় কুমিল্লা যেতে পারে ১৫৭ পর্যন্ত। ৪১ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে প্রথম ফিফটির স্বাদ পান মাহিদুল ইসলাম। তবে চারটি চার ও তিন ছক্কার পরও ৬৩ রান করতে ৫৫ বল খেলে ফেলেন তিনি। 

শেষ ওভারে জাকের আলির ৪ বলে ১৮ রানের ক্যামিওতে কিছুটা কমে পরাজয়ের ব্যবধান।

২০ বলে ৩৬ রানের অপরাজিত ইনিংসের পর বল হাতে দুই উইকেট নিয়ে ম্যাচের সেরা আজমাতউল্লাহ ওমারজাই। এবারের আসরে দ্বিতীয়বার ম্যাচ সেরার পুরস্কার জিতলেন আফগান এই অলরাউন্ডার।

টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা রংপুরের হয়ে শুরুতে ঝড়ের ইঙ্গিত দিলেও টিকতে পারেননি ব্র্যান্ডন কিং। আলিস আল ইসলামকে বাউন্ডারির পর ছক্কায় ওড়ান তিনি বাঁহাতি স্পিনার তানভির ইসলামকে। তবে তানভিরকে আরেকটি বড় শটের চেষ্টায় স্টাম্পড হয়ে যান তৃতীয় ওভারে। 

আরেকপাশে আলিসের বল হাত থেকে ও পিচ থেকে ঠিকমতো পড়তে পারছিলেন না বাবর। ৪ ওভার শেষে তার রান ছিল ১০ বলে ৫। 

পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে অবশেষে আলিসের ‘রহস্যভেদ’ করা যায়। হাফ ভলি পেলে ছক্কায় উড়িয়ে দেন তিনে নামা বাঁহাতি ফজলে মাহমুদ রাব্বি। তাতে হয়তো আত্মবিশ্বাস একটু নড়ে যায় আলিসের। ওই ওভারেই টানা দুই বলে চার ও ছক্বা মারেন বাবর।  

প্রথম ২ ওভারে ৮ রান দেওয়া আলিস এই ওভারেই দেন ১৯ রান। 

বাবর অবশ্য এরপরও ঠিক ছন্দে ফিরতে পারেননি। স্বদেশি আমের জামাল ও খুশদিল শাহর বোলিংয়ে টানা ৭ বলে তিনি পারেননি রান নিতে। ১০ ওভারে স্রেফ ১ উইকেট হারিয়েও রংপুর তুলতে পারে কেবল ৬৯ রান।

বাবর পারেননি পরেও পুষিয়ে দিতে। খুশদিলের আর্ম বলে বোল্ড হন তিনি ৩৬ বলে ৩৭ রান করে। 

আলিসের পর খুশদিলের বলেও ছক্কা মারেন ফজলে মাহমুদ। তার সম্ভাবনাময় ইনিংস থামে মুস্তাফিজকে উড়িয়ে মেরে। এবারের আসরে প্রথম খেলতে নেমে ৩০ রান করেন তিনি ২০ বলে। 

চারে নামা শামীম হোসেন ধুঁকছিলেন টাইমিং করতেই। ১৪ বলে তার রান ছিল ৭! পরে জামালকে একটি ছক্কা মারলেও আউট হয়ে যান ১৪ রানে। 

দেড়শ রানকে তখন মনে হচ্ছিল বহু দূরের ঠিকানা। কিন্তু পরের সময়টাতেই ঝড়ের বেগে সেই ঠিকানা ছাড়িয়ে আরও দূর এগিয়ে যায় রংপুর। যেটির মূল কারিগর আজমাতউল্লাহ ওমারজাই। 

মুস্তাফিজের টানা তিন বলে আফগান এই অলরাউন্ডার মারেন দুই ছক্কা ও এক চার। দ্বিতীয় ছক্কাটি অবশ্য ক্যাচ হতে পারত, কিন্তু লং অফে বল মুঠোয় জমাতে গিয়ে ছক্কা বানিয়ে দেন কানভির। পরের ওভারের রেমন রিফারকে টানা দুই বলে ছক্কা ও চার মারেন মোহাম্মদ নাবি। পরের বলেই স্লগ করার চেষ্টায় নাবি বোল্ড হয়ে যান। তবে কাজ শেষ করেন ওমারজাই ও নুরুল হাসান সোহান। 

শেষ ৩ ওভারে রংপুর তোলে ৫২ রান। মুস্তাফিজের ২ ওভার থেকেই আসে ৩৯ রান।

২০ বলে ৩৬ রানে অপরাজিত থাকেন ওমারজাই। শেষ ওভারে মুস্তাফিজকে ছক্কা ও চারে সোহান খেলেন ৬ বলে ১৫ রানের ক্যামিও। 

চোখের সমস্যার কারণে আগের ম্যাচে ব্যাটিং অর্ডারে ১১ নম্বরে থাকা সাকিব আল হাসানকে এ দিনও দেখা যায়নি ব্যাটিংয়ে। 

কুমিল্লার রান তাড়া শুরু হয় বড় ধাক্কা খেয়ে। ইনিংসের তৃতীয় বলেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে ওমারজাইকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে আউট হয়ে যান লিটন কুমার দাস। আগের তিন ম্যাচ মিলিয়ে ৩৫ রান করা কুমিল্লা অধিনায়কের প্রাপ্তি এবার ‘গোল্ডেন ডাক।’ 

পাওয়ার প্লের পরের সময়টাতেও প্রত্যাশিত ঝড় ওঠেনি। হাসান মুরাদ ও সাকিবকে দুটি ছক্কা মারতে পারেন তিনে নামা মাহিদুল। পাশাপাশি দুই প্রান্তেই রান হয়নি অনেকগুলো ডেলিভারিতে। ৬ ওভারে রান ওঠে কেবল ৩৬। রিজওয়ান খেলছেন তখন ১৩ বলে ১০ রানে। 

রিজওয়ান হাত খুলতে পারেননি পরেও। রানের জন্য হাঁসফাঁস করে নাবিকে রিভার্স সুইপ খেলে বিদায় নেন তিনি ২১ বলে ১৭ রান করে। 

মাহিদুল এগোচ্ছিলেন নিজের মতো করেই। পাওয়ার প্লের দুই ছক্কার পর আরেকটি ছক্কায় ওড়ান তিনি সাকিবকে। আলাগা বল পেয়ে চারও আদায় করেন কিছু। কিন্তু প্রান্ত বদলাতেও ব্যর্থ হন বেশ কিছু ডেলিভারিতে। পঞ্চাশে পা রাখতে ৪২ বল লেগে যায় তার।

ফিফটির পর ১২ রান করেন ১৩ বল খেলে। শেষ পর্যন্ত আউট হয়ে যান হাসান মাহমুদকে স্লগ করে।

কুমিল্লার ইনিংস কিছুটা গতি পায় মূলত তাওহিদ হৃদয়ের ব্যাটে। ক্রিজে যাওয়ার পরপরই শেখ মেহেদি হাসানের টানা দুই বলে বাউন্ডারির পর একটি ছক্কা মারেন তিনি।

তবে রান-বলের টানাপোনে বেড়েই চলছিল। শেষের ঝড়ের জন্য কুমিল্লা তাকিয়ে ছিল মূলত খুশদিল শাহর ব্যাটে। ওমারজাইয়ের এক ওভারে দুই ছক্কায় ম্যাচ জমিয়ে তোলার ইঙ্গিতও দেন তিনি। কিন্তু ওই ওভারেই তাকে বিদায় করে শোধ তোলেন ওমারজাই। কুমিল্লার আশাও অনেকটা শেষ হয়ে যায়।

আলাদা করে বলতে হবে হাসান মাহমুদের কথা। দুর্দান্ত বোলিংয়ে স্লগ ওভারে ২ ওভারে কেবল ১১ রান দেন এই পেসার।

শেষ ওভারে কুমিল্লার প্রয়োজন পড়ে ২৯ রানের। সাকিবের করা ওভারের প্রথম বলেই নাবির দুর্দান্ত থ্রোয়ে রান আউট হয়ে যান হৃদয় (২৮ বলে ৩৯)। পরের বলে ছক্কার চেষ্টায় সীমানায় ধরা পড়েন আমের জামাল।

শেষ ৪ বলে লাগত ২৭ রান। ওয়াইড-নো বল ছাড়া সমীকরণ তখন অসম্ভব। জাকের তবু কিছুটা বিনোদনোর খোরাক জোগান জাকের। সাকিবকে টানা দুটি ছক্কা মারেন তিনি। শেষ বলেও মারেন চার। কিন্তু ম্যাচ তো আগেই শেষ!

পাঁচ ম্যাচের রংপুরের তৃতীয় জয় এটি, চার ম্যাচে কুমিল্লার জয়-হার দুটি করে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর: 

রংপুর রাইডার্স : ২০ ওভারে ১৬৫/৫ (কিং ১৪, বাবর ৩৭, ফজলে মাহমুদ ৩০, শামীম ১৪, ওমারজাই ৩৬*, নাবি ১৩, সোহান ১৫*; তানভির ৩-০-১৯-১, আলিস ৩-০-২৭-০, মুস্তাফিজ ৪-০-৪৮-১, জামাল ৩-০-২১-০, খুশদিল ৪-০-২৫-১, রিফার ৩-০-২০-২) 

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স : ২০ ওভারে ১৫৭/৬ (রিজওয়ান ১৭, লিটন ০, মাহিদুল ৬৩, হৃদয় ৩৯, খুশদিল ১৩, রিফার ১*, জামাল ০, জাকের ১৮*; ওমারজাই ৪-০-৩১-২, মুরাদ ৩-০-২৫-০, সাকিব ৪-০-৪১-১, হাসান ৪-০-২৩-১, নাবি ৪-০-১৯-১)। 

ফল: রংপুর রাইডার্স ৮ রানে জয়ী।

ম্যান অব দা ম্যাচ: আজমাতউল্লাহ ওমারজাই।