মুশতাকের বিশেষ কর্মশালায় স্পিনারদের বায়োমেকানিক্যাল মূল্যায়ন
বায়োমেকানিক্যাল মূল্যায়নের মাধ্যমে স্পিনারদের টেকনিক্যাল প্রোফাইলিং করার দিকে ছিল মূল মনোযোগ, এই ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত দেখতে চান বাংলাদেশ দলের স্পিন বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদ।
কখনও রঙ্গনা হেরাথ, আবার কখনও শাহেদ মেহমুদ। স্পিন বোলিং কোচদের তত্ত্বাবধানে নানা সময়েই স্পিন ক্যাম্পের আয়োজন করেছে বিসিবি। বাংলাদেশ দলের স্পিন কোচ হয়ে আসার পর মুশতাক আহমেদও নানা সময়ে এরকম ক্যাম্প পরিচালনা করেছেন। তবে এবারের ক্যাম্প হলো একটু আলাদা। জাতীয় দলের আশেপাশে থাকা ও উঠতি স্পিনারদের নিয়ে এখানে কাজ করা হলো স্পিন বোলিংয়ের প্রথাগত শিক্ষার সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে।
বিসিবি অবশ্য এটিকে ক্যাম্প নয়, বলছে ‘কর্মশালা।’ বায়োমেকানিক্যাল মূল্যায়নের মাধ্যমে স্পিনারদের টেকনিক্যাল প্রোফাইলিং করার দিকে ছিল মূল মনোযোগ। বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট ও হাই পারফরম্যান্স প্রোগ্রামের আওতায় থাকা ২০ স্পিনারকে রাখা এই কর্মশালায়।
আমিনুল ইসলাম বিপ্লব, রকিবল হাসানের মতো পরিচিত নাম যেমন সেখানে ছিল, তেমনি ছিলেন স্বাধীন ইসলাম, আশরাফুল হাসান রোহানের মতো উঠতিরা। ছিলেন আবু হাশিমের মতো ঘরোয়া ক্রিকেটের সাম্প্রতিক সময়ের পারফরমাররাও, প্রথাগত এই ধরনের প্রশিক্ষণ যারা আগে বেশি পাননি।
শুধু মুশতাকই নন, দেশের সফলতম টেস্ট বোলার তাইজুল ইসলাম ও টি-টোয়েন্টি দলের নিয়মিত মুখ শেখ মেহেদি হাসানও বোলিং গ্রিপ, অ্যাকশনসহ স্পিন বোলিংয়ের নানা দিক নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন স্পিনারদের সঙ্গে।
তিন দিনের এই কর্মশালায় শুধু স্পিনাররাই নন, ছিলেন স্থানীয় স্পিন বোলিং কোচরাও, যারা শিখেছেন ও শিখিয়েছেন, এবং সমৃদ্ধ হয়েছেন মুশতাকের সংস্পর্শে।
এই ক্যাম্পে তিনদিকে ক্যামেরা বসিয়ে স্পিনারদের প্রতিটি পদক্ষেপ রেকর্ড করে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খালি চোখে তাদের বোলিং অ্যাকশনের খুঁটিনাটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ত্রুটি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
কর্মশালা শেষে বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মুশতাক শোনালেন, কীভাবে কাজ করা হয়েছে এই কর্মশালায়।
“প্রথমত আমার মনে হয়, এটা বিসিবি ও হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের দারুণ সিদ্ধান্ত। এর পেছনের কারণটা বলি, আমরা এখানে তিনটি ক্যামেরা দিয়ে সবকিছু রেকর্ড করেছি, সামনে থেকে, পেছন থেকে ও পাশ থেকে। এর ফলে স্পিনারদের অ্যাকশন নিয়ে কাজ করতে পারছি।
কারও যদি ‘রিপিটেবল’ অ্যাকশন (ধারাবাহিক, মসৃণ ও হুবুহু একই অ্যাকশন) থাকে, তাহলে সে চাপের মুখে ভালো ওভার করতে পারবে। এটি একটি মৌলিক বিষয় যা আমরা এখানে শিখছি। পাশাপাশি স্থানীয় কোচদের সঙ্গে মিলে আমরা কাজ করেছি কীভাবে স্পিন বিভাগকে বুঝতে হয় এবং কন্ডিশন কীভাবে বুঝতে হয়।”
পাকিস্তানের এই লেগ স্পিন গ্রেটের আশা, কর্মশালায় বাতলে দেওয়া কাজগুলো ঠিকঠাক করতে পারলে এই স্পিনারদের অ্যাকশন নিয়ে সামনের অনেক দিন আর কাজ করতে হবে না।
“তিন দিনে যে সব স্পিনাররা এসেছে, তাদের বোলিংয়ের অ্যাকশন, টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিক্যাল দিকগুলো দেখেছি। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অ্যাকশন ঠিক করে নিতে পারে, আশা করি লম্বা সময়ের জন্য তাদেরকে অ্যাকশন নিয়ে ভাবতে হবে না।
মাঝেমধ্যে উইকেট এতোটা টার্নিং হয়, তখন অ্যাকশনের উপর নির্ভর করতে হয় না। কিন্তু যখন নিষ্প্রাণ পিচে খেলবে, তখন বায়োমেকানিক্স, ভালো ভারসাম্য ও ভালো অ্যাকশনের প্রয়োজন হয়।”
মুশতাকের মতে, এই ধরনের কর্মশালা থেকে উপকৃত হবেন দেশের সব ধরনের স্পিনাররাই।
“এই ক্যাম্পের মূল উদ্দেশ্য হলো, আমরা তিনটি অ্যাঙ্গল থেকে ভিডিও রেকর্ড করি এবং তারপর ওই স্পিনারের সঙ্গে বসে ভিডিওতে তাকে দেখাই যে, ‘এটা তোমার অ্যাকশন, এটা তোমার সামনের হাত, এটা তোমার পা, এটা তোমার ভারসাম্য, ক্রিজের এই অ্যাঙ্গলটা তোমাকে শিখতে হবে। তাই যদি তারা অল্প বয়সে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার আগেই এটা শিখতে পারে, এমনকি প্রথম শ্রেণির স্পিনাররা, টেস্ট স্পিনাররাও যদি তাদের নিজেদের প্রক্রিয়াটা বুঝতে পারে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এটা বড় প্রাপ্তি হবে। কারণ তখন তারা প্রচুর উইকেট পেতে শুরু করবে।
যে কোন দেশ যখন প্রচুর ভালো ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে শুরু করে, তাদের সীমিত ওভারের ক্রিকেটে মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট নেওয়ার জন্য ভালো মানের স্পিনার দরকার হয়। পাশাপাশি আপনারা তাইজুল, মিরাজদের দেখছেন। আপনারা জানেন, সাদা বলের ক্রিকেটে রিশাদ… এবং শেখ মেহেদি, নাসুম, তানভির…মূল কথা প্রত্যেকেই ভালো বোলিং করতে শুরু করেছে। সেই কারণেই আমরা এখন প্রচুর সিরিজ জিতছি। তাই অ্যাকশন, বায়োমেকানিক্স, ভারসাম্য এবং টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রায় দেড় হাজার উইকেট শিকারি এই লেগ স্পিনারের মতে, এই ধরনের কর্মশালা নিয়মিত বিরতিতে আয়োজন করা উচিত বিসিবির।
“বাংলাদেশের ক্রিকেট কাঠামোয় থাকা স্পিনাররা সবসময়ই দারুণ। এ কারণে আমার মনে হয় এই ধরনের ক্যাম্প নিয়মিত হওয়া উচিত। প্রতিদিনের (কাজের) পাশাপাশি প্রতি তিন মাস পর পর (এরকম ক্যাম্প) করা উচিত। তাতে তারা অনেক লাভবান হবে।
শুধু স্পিনাররাই নয়, স্থানীয়ভাবে স্পিন বোলিং কোচদেরও উন্নতি হবে। তাতে তারা বুঝতে পারবে, কীভাবে মৌলিক বিষয়, অ্যালাইনমেন্ট, টেকনিক্যাল এবং ট্যাকটিক্যাল দিক নিয়ে কাজ করতে হয়। আমাদের সঙ্গে স্থানীয় কোচ আছেন চার-পাঁচজন। তাই তারাও স্পিনের কলাকৌশল শিখছেন, কীভাবে আমরা ভালো স্পিনার তৈরি করতে পারি।”
