২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

বিশ্বকাপ ভাবনায় নেই, তবে ‘নজরে আছেন’ আলিস

রহস্য ও বৈচিত্র্যের বার্তা নিয়ে জাতীয় দলে ডাক পেলেও চোটের থাবায় আপাতত দূরে আলিস আল ইসলাম, তবে তাকে হারিয়ে যেতে দিতে চায় না টিম ম্যানেজমেন্ট।

শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদ শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Apr 2024, 10:47 AM

Updated : 26 Apr 2024, 01:06 PM

১৭ ক্রিকেটারকে নিয়ে শুক্রবার থেকে চট্টগ্রামে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ দলের ক্যাম্প। সেখানে নেই আলিস আল ইসলাম। যেটির মানে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও তার থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এবারের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও তাকে দেখা যায়নি। গত দুই মাসের বেশি সময় কোনো ধরনের ক্রিকেটই তিনি খেলেননি। আলিস তাহলে কোথায়?

অথচ সব ঠিক থাকলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্বপ্ন সারথিদের একজন হতে পারতেন তিনি। ব্যাটসম্যানদের তুমুল দাপটের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একজন রহস্য স্পিনার দারুণ কাঙ্ক্ষিত। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখানেই আশার আলো আলিস। এবারের বিপিএলে বৈচিত্র ও রহস্যের জাল বিছিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। নির্বাচকরাও তাকে বিশ্বকাপের ভাবনায় রাখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু চোটের কারণে মিইয়ে গেছে তার সম্ভাবনা।

একরকম চমক নিয়েই দেশের ক্রিকেটে আবির্ভাব আলিসের। রহস্যময় বোলিং ছাড়াও তার উঠে আসার গল্পটাও চমকপ্রদ। তার সেই পথচলায় দফায় দফায় আঘাত হেনেছে চোটের থাবা। গত মাসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি দলে ডাক পেলেও আঙুলের চোটে পিছিয়ে গেছে তার আন্তর্জাতিক অভিষেকের সম্ভাবনা। তাই নতুন করে ফেরার লড়াইয়ে ২৭ বছর বয়সী স্পিনার।

ঘরোয়া ক্রিকেটে সার্বিকভাবে অবশ্য এখন পর্যন্ত চমক জাগানো বা দুর্দান্ত কিছু করেননি আলিস। লিস্ট 'এ' ক্রিকেটে ৭ ম্যাচে তার উইকেট ৮টি। জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিলেন যে সংস্করণে, সেই বিশ ওভারের ক্রিকেটে ২৬ ম্যাচে তিনি নিয়েছেন ২০ উইকেট। ওভারপ্রতি রান খরচের হার ৬.৮৮। 

তবে সবশেষ বিপিএলে কিছু ম্যাচে সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন এই রহস্য স্পিনার। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হয়ে সব মিলিয়ে ৮ ম্যাচে নিয়েছেন ৯ উইকেট। সিলেট স্ট্রাইকার্সের বিপক্ষে স্রেফ ১৭ রানে ৪ উইকেট তার ক্যারিয়ারেরই সেরা বোলিং। ওই ম্যাচে নিজের ভাণ্ডারে থাকা বৈচিত্রের পসরা মেলে ধরেছিলেন আলিস। 

সেদিন স্পিন, টার্ন, সুইংয়ের মিশেলে নাজমুল হোসেন শান্ত, ইয়াসির আলি চৌধুরিদের ঘোর লাগিয়ে দেন তিনি। ওই পারফরম্যান্সেই মূলত জাতীয় নির্বাচকদের নজর কাড়ে তিনি। পরের ম্যাচে রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে নতুন বলে তার সামনে একটা সময় সুবিধা করতে পারছিলেন না বাবর আজমের মতো বিশ্বমানের ব্যাটসম্যানও।

এবারের বিপিএলে দুই দিকেই বল ঘোরানোর পাশাপাশি টপ স্পিন ও ফ্লোটারেও পারদর্শিতা দেখান তিনি। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সঙ্গে মানিয়ে স্পিনার হয়েও সিম ও সুইংয়ের প্রদর্শনী মেলে ধরেন প্রায় নিয়মিত। 

বিপিএলের পারফরম্যান্স দিয়েই শ্রীলঙ্কা সিরিজের দলে ঢুকে যান আলিস। তখনকার প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন বলেছিলেন, ব্যতিক্রমী বোলার হিসেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভাবনায় সুযোগ পেয়েছেন আলিস। জাতীয় দলের সঙ্গে রেখে এই রহস্য স্পিনারকে পরখ করতে চায় টিম ম্যানেজমেন্ট। 

কিন্তু সেটি আর হয়নি। বিপিএল চলাকালে কুমিল্লার অনুশীলনে আঙুলে চোট পান আলিস। যা তাকে ছিটকে দেয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ থেকে। প্রাথমিকভাবে দুই থেকে তিন সপ্তাহের কথা বলা হলেও, এক মাসের বেশি সময় লেগে যায় তার সুস্থ হতে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বিপিএলের ম্যাচ খেলার পর আর তাকে দেখা যায়নি কোনো ম্যাচে।

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে গত শনিবার অবশ্য জাতীয় ক্রিকেটারদের শারীরিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নে অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে দৌড়েছেন আলিস। যাতে বোঝা যায়, জাতীয় দলের ভাবনায় ভালোভাবেই আছেন তিনি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেনও বললেন এই কথা। 

“আলিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বোলার, রহস্যময় বোলার। অবশ্যই আমরা তাকে দেখব। তবে এখন একটু অন্যরকম ভাবনা। আমাদের যদি অফ স্পিনার লাগে, তাহলে বিকল্পের দিকে যাব। আমাদের হাতে অনেক সময় আছে। আপাতত বিশ্বকাপের জন্য আমাদের প্রথম ১৫ জনের ভাবনায় নেই আলিস। মূলত মেহেদী হাসান মিরাজ আমাদের সম্ভাব্য বিকল্প। যেহেতু সামনে একটা বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট।”

“তারপর আলিস যদি পুরোপুরি সুস্থ হয়... আমাদের 'এ' দল, এইচপি, বাংলা টাইগার্সের ক্যাম্প আছে। সেখানে ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঢুকে যাবে। বলা যায়, ওর সুস্থ হতে হতে কিছুটা দেরি হয়ে গেল আর কী! তবে ঠিক আছে। একই পজিশনে আমাদের আরও বিকল্প আছে। অনভিজ্ঞ কাউকে দলে নেওয়া অত সহজ নয়। হয়তো ব্যতিক্রম থাকে। ব্যতিক্রম যে হয় না, তা নয়। এছাড়া এখন পর্যন্ত আলিস কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজও খেলেনি।”

চট্টগ্রামে তিন দিনের ক্যাম্পে থাকা ক্রিকেটারদের প্রাধান্য দিয়েই সাজানো হবে সামনের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল। যেখানে স্পিন বিভাগে আছেন অফ স্পিনার শেখ মেহেদি হাসান, বাঁহাতি স্পিনার তানভির ইসলাম ও লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন। এছাড়া দলের সঙ্গে যোগ দেবেন অভিজ্ঞ বাঁহাতি স্পিন অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। 

বিপিএলে পাওয়া আঙুলের চোট কাটিয়ে বেশ কিছু দিন ধরেই নেটে বোলিং করছেন আলিস। প্রিমিয়ার লিগে এবার লেজেন্ডস অব রূপগঞ্জে নাম লেখালেও তার দল জায়গা পায়নি সুপার লিগে।  গতবারের দল প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাবের সঙ্গে এখন অনুশীলন করছেন তিনি। ম্যাচ খেলার জন্য এখন বিসিবির মেডিকেল বিভাগের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছেন এই রহস্য স্পিনার।

ফিজিওর কাছ থেকে ছাড়পত্র এরই মধ্যে পেয়েছেন আলিস। তাকে আরও একবার পর্যবেক্ষণ শনিবার অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবছে মেডিকেল বিভাগ। এরপর প্রিমিয়ার লিগে বাকি থাকবে আর তিনটি ম্যাচ। রূপগঞ্জ যেহেতু সুপার লিগে নেই, গতবারের দল প্রাইম ব্যাংকের হয়ে ম্যাচ খেলার আশা করছেন আলিস। 

“কিছু দিন ধরে বোলিং শুরু করেছি। আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছি। শনিবার আরেকবার দেখে বিসিবির মেডিকেল টিম ম্যাচ খেলার অনুমতি দেবে আশা করছি। আমি এবার রূপগঞ্জে ছিলাম। কিন্তু মাঠে ফেরার অনুমতিই পাইনি। তাই আসলে মধ্যবর্তী দলবদলের সুযোগ ছিল না।” 

“মূলত প্রাইম ব্যাংকে সালাউদ্দিন স্যার (কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন) থাকায়, তার সঙ্গে কাজ করছি। স্যারের সঙ্গে আগেও কাজ করেছি। তাকে কিছু জিনিস দেখিয়ে দেওয়ার জন্য বলেছি। লিগে এবার আর খেলা হবে কি না জানি না। তবু প্রাইম ব্যাংকের হয়ে দু-একটি ম্যাচও যদি খেলতে পারি, সেই আশাই করছি।”

চোটের সঙ্গে আলিসের লড়াই অবশ্য বেশ পুরোনো। এর আগে হাঁটুর চোটে দীর্ঘ দিন তাকে থাকতে হয়েছে মাঠের বাইরে।

২০১৯ সালের বিপিএলে নেটে বোলিং করতে দেখে আলিসকে সোজা মূল দলে নেন ঢাকা ডায়নামাইটসের প্রধান কোচ খালেদ মাহমুদ। রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে অভিষেকেই হ্যাটট্রিক করে হইচই ফেলে দেন আলিস। তবে ওই আসরে অবৈধ বোলিং অ্যাকশনে ধরা পড়ে যান তিনি। অ্যাকশনের পরীক্ষা দেওয়ার আগেই চোটে পড়ে প্রায় ৮ মাসের জন্য ছিটকে যান তিনি।

পরে অ্যাকশন শুধরে তিনি ফেরেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। খুলনা টাইগার্সের হয়ে খেলেন ২০২০ সালের বিপিএল। এক ম্যাচে মোটামুটি ভালো করলেও আরেক ম্যাচে ছিলেন খরুচে। তবে নতুন অ্যাকশনে আর আগের বছরের ধার দেখা যায়নি তার বোলিংয়ে। ফলে জায়গা হারান একাদশে। এর সঙ্গে টুকটাক চোটও লেগেই ছিল।

একই বছর ওল্ড ডিওএইচএসের হয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে লিস্ট ‘এ’ অভিষেক হয় তার। সেবার একমাত্র ম্যাচে ৩৬ রানে নেন ২ উইকেট। পরের বছর টি-টোয়েন্টি সংস্করণের প্রিমিয়ার লিগে ১২ ম্যাচ খেলে ৪ উইকেটের বেশি নিতে পারেননি আলিস।

বোলিংয়ের ধার হারিয়ে এভাবেই ধুঁকতে ধুঁকতে এগোচ্ছিল তার ক্যারিয়ার। শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের জার্সিতে একটি ম্যাচে সুযোগ পেয়ে ফের খরুচে বোলিং করে বাদ পড়ে যান। এই ধাক্কায় মূল ধারা থেকেও অনেকটা সরে যান তিনি। সঙ্গে যোগ হয় হাঁটুর চোট।

লম্বা সময় বাইরে কাটিয়ে গত বছরের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে প্রাইম ব্যাংকের হয়ে মাঠে ফেরেন তিনি। ৫ ম্যাচে নেন ৬ উইকেট। ওভারপ্রতি খরচ করেন স্রেফ ৪.১০ রান। দুর্দান্ত কিছু না হলেও আশার সঞ্চার হয় তার। ঘরোয়া ক্রিকেটের সফল কোচদের একজন মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের সঙ্গে তার কর্মক্ষেত্র সাকিব-মাসকো একাডেমিতে কাজ করতে থাকেন আলিস। অ্যাকশন অনেকটাই বদলে বাড়ান স্কিল, বোলিংয়ে যোগ হয় নতুন রহস্য।

তবু সবশেষ বিপিএলের প্লেয়ার্স ড্রাফটে দল পাননি আলিস। তবে বোলিং নিয়ে কাজ থামাননি। সালাউদ্দিনের দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের নেটে বোলিং করতে থাকেন তিনি নিয়মিতই। সুনিল নারাইন শুরুর দিকে দলের সঙ্গে যোগ দিতে না পারায় বোলিংয়ে দারুণ উন্নতি করা আলিসকে লিটন কুমার দাস, ইমরুল কায়েসদের পরামর্শে দলে নিয়ে নেন কুমিল্লার প্রধান কোচ।

এরপর বিপিএলে রহস্যময় বোলিংয়ে চমকপ্রদ পারফরম্যান্স। কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার আগেই চোটের পুরোনো থাবা। তাই এখন আর চোট নিয়ে কোনো কথাই বলতে চান না আলিস। বরং বাস্তবতা মেনে নিয়ে আরও একবার ফেরার লড়াইয়ে মন দেওয়ার প্রত্যয়ই শোনালেন তিনি। 

“আমি আসলে পেছনের বিষয়টা (চোট) নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না। এসব আমাদের হাতে নেই। আমার হাতে এখন সামনের জিনিস আছে। মেডিকেল বিভাগের অনুমতিটা আমি আবার মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করব। কীভাবে নিজেকে তৈরি করা যায়, সামনে আরও কী কী করে আবার দলে ফেরার ব্যবস্থা করা যায়, সেটি নিয়েই ভাবছি।”

আরও একবার জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার দাবি জানাতে সামনের দিনগুলোতে আলিসের সম্ভাব্য করণীয় বাতলে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ।

“আলিসের সামনে এখনও অনেক সময় আছে। এর আগে সে প্রথমবার দলে ডাক পেয়েছে। আবার হয়তো ভালো করলে ডাক পাবে। ২২ গজে আগামী দিনগুলোতে ঘরোয়া ক্রিকেটে রহস্য বোলিংয়ের প্রভাব কতটা রাখতে পারে, তা দেখে আমাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অবশ্যই সে আমাদের নজরে থাকবে।”

“অবশ্যই সে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার দাবিদার। সামনে আমাদের 'এ' দলের খেলা আছে। এছাড়া এইচপি, বাংলা টাইগার্স প্রোগ্রাম শুরু হয়ে যাবে। সেসব জায়গায় তাকে আরও কাছ থেকে পরখ করতে পারব আমরা। আমাদের কোচ যারা আছেন, তাকে আরও ধারাল করার চেষ্টা করবেন। সবসময়ই আমাদের ভাবনায় থাকবে।” 

আরেকটি ব্যাপার অবশ্য খোলাসা করেছেন প্রধান নির্বাচক। তার স্পষ্ট বার্তা, স্রেফ রহস্য স্পিনার বা ব্যতিক্রমী ঘরানার হলেই জাতীয় দলে সুযোগ দেওয়া হবে না কাউকে।

“রহস্য বোলার যদি কেউ হয়, এটা তার জন্য বাড়তি পাওয়া। তবে মূল বিষয় হলো, তাকে ব্যাটসম্যানদের বোকা বানাতে হবে, রান রেট কমিয়ে দিতে হবে, উইকেট নিতে হবে। সব মিলিয়ে আসলে দলে প্রভাবটা রাখতে হবে। শুধু রহস্য বোলার হওয়াই কারও বাছাইয়ের যোগ্যতা হবে না। এটি হয়তো মানদণ্ডের একটি হতে পারে। তাকে মূল বিষয়গুলো আগে কাভার করতে হবে। বোলিং, ফিল্ডিংয়ে যথাযথ পর্যায়ে থাকতে হবে। সঙ্গে যদি ব্যাটিংও পারে, তাহলে সেটিও বাড়তি পাওয়া।”