রহস্যের জাল বিছিয়ে অপেক্ষায় সিলেটের উইকেট

সিলেটের উইকেটের সম্ভাব্য আচরণ নিয়ে কিছুই খোলাসা করছে না বাংলাদেশ দল।

শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদশাহাদাৎ আহমেদ সাহাদসিলেট থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 27 Nov 2023, 10:31 AM
Updated : 27 Nov 2023, 10:31 AM

মাঠে ঢুকে সবার আগে উইকেটের কাছে গেলেন তাইজুল ইসলাম। একনজর চোখ বুলিয়ে তিনি চলে গেলেন বোলিং অনুশীলনে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। হাঁটু গেড়ে বসে তিনি খুঁটিয়ে দেখলেন উইকেট। তার সঙ্গে যোগ দিলেন চান্দিকা হাথুরুসিংহে। এরপর ক্রিজের কাছে দাঁড়িয়ে দুজন আলোচনা করলেন প্রায় ২৫ মিনিট।

আলোচনা পর্বের শেষ নয় সেখানেই। শান্ত অনুশীলনে চলে যাওয়ার পর দুই নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন ও হাবিবুল বাশারকে নিয়ে হাথুরুসিংহের আলোচনা চলতে থাকল ঘণ্টা পেরিয়ে।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সোমবার বাংলাদেশ দলের অনুশীলনের বড় বিজ্ঞাপন উইকেটের কাছে টিম ম্যানেজমেন্টের দীর্ঘ এই আলোচনা। প্রধান কোচ রোববার বলেছেন, তার দলের কাছে অচেনা এই উইকেট। সেই ২২ গজের রহস্যভেদ করতেই হয়তো ম্যাচের আগের দিন লম্বা সময় উইকেটের সামনেই কেটেছে ম্যানেজমেন্টের।

তবে উইকেট সম্পর্কে যা ধারণা মিলেছে, সেসব নিজেদের ভেতরেই রাখছে দল। ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক শান্ত সংবাদ সম্মেলনে উইকেটের সম্ভাব্য আচরণ নিয়ে কিছুই বলতে চাইলেন না।  

ম্যাচের দুদিন আগেও সবুজ ঘাসের উপস্থিতি ছিল উইকেটে। তবে ম্যাচের আগের দিন প্রায় পুরোটাই ছেটে ফেলা হয় ঘাস। সকালের দিকে কয়েক ঘণ্টা খোলা রাখলেও দুপুর গড়ানোর আগেই উইকেট ঢেকে ফেলা হয় চট দিয়ে। রোববারও দেখা যায় অভিন্ন চিত্র। রোদের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢেকে দেওয়া হয় উইকেট। 

দূর থেকে ঠিক বোঝার উপায় নেই কেমন হতে পারে এই উইকেট। তবে কাছ থেকে দেখা শান্ত, হাথুরুসিংহে বা নির্বাচকদের নিশ্চয়ই বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়! তবে শান্ত খোলাসা করতে চান না তাদের ধারণা।

“আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, কী ধরনের উইকেট হতে পারে, এটা বলা ঠিক হবে না। আপনারা হয়তো কালকে দেখলে স্পষ্ট একটা ধারণা পাবেন। আমরা যতটুকু পেরেছি, ধারণা নিয়েছি। ওই অনুযায়ী আমরা পরিকল্পনা করেছি। আমাদের যে শক্তির জায়গা, ওই অনুযায়ী আমরা মাঠে আসব। আমার মনে হয়, যখন ম্যাচটা শুরু হবে, আরও পরিষ্কার বার্তা পাব।”

সিলেটের এই মাঠে এখন পর্যন্ত খেলা হয়েছে মোটে একটি টেস্ট। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওই ম্যাচে ভয়াবহ ব্যাটিং ব্যর্থতায় বড় ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। দুই ইনিংস মিলিয়ে ১১ উইকেট নিয়েছিলেন তাইজুল ইসলাম। জিম্বাবুয়ের ২০ উইকেটের ১৯টিই গিয়েছিল বাংলাদেশের স্পিনারদের ঝুলিতে। 

পাঁচ বছর আগের ওই ম্যাচ থেকে উইকেট সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার সুযোগ খুব একটা নেই। উইকেটের সাম্প্রতিক আচরণ বুঝতে তাই সদ্য সমাপ্ত জাতীয় ক্রিকেট লিগের সাহায্য নিয়েছে বাংলাদেশ দল। অবশ্য ওই টুর্নামেন্টে এই মাঠে খেলা হয়েছে স্রেফ দুই ম্যাচ। 

চট্টগ্রাম-বরিশাল ও চট্টগ্রাম-খুলনার ওই দুই ম্যাচে ৮ ইনিংসে একবারও তিনশ পেরোয়নি দলীয় স্কোর। তিনবার দুইশর আগেই থেমেছে দলগুলো। ওই দুটি ম্যাচই খেলেছেন নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের স্কোয়াডে থাকা নাঈম হাসান। দুইবার ৫ উইকেটসহ তার মোট শিকার ১৩ উইকেট। 

এছাড়া অক্টোবরের মাঝামাঝিতে খুলনার বিপক্ষে ম্যাচটিতে ছিলেন প্রথমবার টেস্ট দলে ডাক পাওয়া হাসান মুরাদও। ওই ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে স্রেফ ২১ রানে ৬ উইকেট নেন তরুণ বাঁহাতি স্পিনার। 

ব্যাটিংয়ে বরিশালের বিপক্ষে ম্যাচের দুই ইনিংসেই ৮০ ছোঁয়া ইনিংস খেলেন মুমিনুল হক। দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি হয় স্রেফ একটি। খুলনা বিভাগের এনামুল হক খেলেন ১১০ রানের ইনিংস।

দুই ম্যাচের একটিতেও তেমন ঘাসের দেখা মেলেনি উইকেটে। স্পিনারদের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। ঘরোয়া ক্রিকেটের এসব ম্যাচ থেকে যতটা সম্ভব ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন শান্তরা। 

“এখানে তো টেস্ট ম্যাচ খুব কম হয়েছে। যতটুকু প্রথম শ্রেণির ম্যাচ হয়েছে, সেখান থেকে একটা ধারণা... উইকেট নিয়ে খুব লম্বা আলোচনা হয়েছে, তা নয়। উইকেটটা কী রকম, আমরা বোঝার চেষ্টা করেছি।” 

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হবে ম্যাচ। বাংলাদেশ অধিনায়কের ধারণা, শীতের সকালে শুরুর দিকেই পাওয়া যাবে উইকেট সম্পর্কে পরিষ্কার বার্তা।  

“ঘরের মাঠের সুবিধা, এই কথা বলতে চাই না। আমার মনে হয়, প্রত্যেক দলই যখন ঘরের মাঠে খেলে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিছু না কিছু সুবিধা তাদের থাকে। আমরাও সেটা নেওয়ার চেষ্টা করব। ম্যাচ শুরু হলে আরও স্পষ্ট বোঝা যাবে। প্রথম সেশনেই হয়তো বোঝা যাবে, উইকেট কেমন আচরণ করছে। তবে উইকেট সম্পর্কে আমাদের কিছুটা হলেও ধারণা হয়েছে।”

উইকেট সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই খুব বেশি ধারণা নেই নিউ জিল্যান্ডেরও। গত কয়েক দিনের মতো সোমবারও স্টেডিয়ামের দুই নম্বর মাঠে অনুশীলন করে তারা। মূল মাঠের ড্রেসিং রুম থেকে দুই নম্বর মাঠে আসা-যাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পেলেই কাছ থেকে উইকেট দেখার চেষ্টা করেন কিউই ক্রিকেটাররা।

চট দিয়ে ঢেকে রাখায় পুরো উইকেট একবারে দেখার সুযোগ হয়নি সফরকারীদের। এর মাঝেও অনুশীলন শেষ করে টিম বাস ধরার আগে এক পাশের চট সরিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে উইকেট পরখ করতে দেখা যায় টম ল্যাথাম, উইল ইয়াংদের।

সংবাদ সম্মেলন শেষ করে ড্রেসিং রুমে ফেরার সময় অধিনায়ক টিম সাউদিও কাছে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন উইকেটের গতি-প্রকৃতি। এর আগে সংবাদ সম্মেলনে ভালো উইকেটের প্রত্যাশার কথা জানান তিনি।

“আমরা উইকেট দেখেছি। এখানে খুব বেশি টেস্ট খেলা হয়নি। তাই নির্ভর করার মতো বেশি তথ্য-পরিসংখ্যান নেই। আমরা ভালো উইকেটের আশা করছি। অবশ্যই এই ম্যাচে স্পিনের একটা বড় ভূমিকা থাকবে। বছরের শুরুতে আমরা পাকিস্তানে খেলেছি। ছেলেদের উপমহাদেশে খেলার বেশ অভিজ্ঞতা আছে।”

শীতের সকালে কন্ডিশনের কারণে পেসারদের সহায়তা কিছুটা থাকলেও বিস্ময়কর হবে না। পরের দিকে যদি স্পিন ধরে, শেষ ইনিংসে ব্যাট করাও হয়ে উঠতে পারে চ্যালেঞ্জিং। সব মিলিয়ে উইকেট নিয়ে রহস্যঘেরা ম্যাচটিতে টসের বড় প্রভাব থাকতে পারে বলে মনে করেন শান্ত। 

“আমার কাছে তো সেটাই মনে হয়, টসটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে প্রত্যেক ক্রিকেটার ওটার জন্য প্রস্তুত যে, আগে ব্যাটিং করি বা বোলিং করি... আমাদের যে যার ভূমিকা, সেটা কীভাবে পালন করছি। টস যদি পক্ষে আসে, খুবই ভালো। যদি না আসে... এটা তো আসলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করার সুযোগ নেই।”