Published : 03 Oct 2025, 11:20 AM
৪০ বছরের বেশি সময় ধরে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন অ্যালান উইলকিন্স। জীবনে তো কম দেখেননি। সেই তিনি মারুফা আক্তারের ডেলিভারি দেখে চমকে গিয়ে বললেন, “হাউ অ্যাবাউট দ্যাট….!’ সেটি কেবলই শুরু। পরের ডেলিভারিতেই মারুফা ঝলক দেখান আবার। দুর্দান্ত দুটি ইনসুইঙ্গারে দুই পাকিস্তানি ব্যাটারকে বোল্ড ক্রিকেট বিশ্বে তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন বাংলাদেশের এই পেসার। নজর কেড়েছেন তিনি লঙ্কান কিংবদন্তি লাসিথ মালিঙ্গারও।
এবারের উইমেন’স ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচে বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ওভারে আগুনে ডেলিভারি দুটি বের হয় মারুফার হাত থেকে।
মারুফার সহজাত ডেলিভারি ইনসুইঙ্গার (ডানহাতি ব্যাটারের জন্য)। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই সুইং ও মুভমেন্ট আদায় করে নিতে থাকেন তিনি। শুরুতে স্ট্রাইকে ছিলেন ওপেনার মুনিবা আলি। বাঁহাতি ব্যাটারের জন্য ডেলিভারিগুলো ছিল আউটসুইঙ্গার। টানা তিনটি বেরিয়ে যাওয়া বল অস্বস্তিতে ফেলে মুনিবাকে। চতুর্থ বলে ব্যাটের কানায় লেগে একটি রান পান তিনি।
এবার স্ট্রাইকে আসের ডানহাতি ওমাইমা সোহেল। মারুফা সুযোগ পেয়ে যান নিজের সহজাত শক্তির জায়গা কাজে লাগানোর। প্রথম ডেলিভারিটিই বাতাসে সুইং করে অফ স্টাম্পের বেশ বাইরে পিচ করে আরও ভেতরে ঢুকে মুনিবার ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে ছোবল দেয় লেগ-মিডল স্টাম্পের ওপরে।
সবকিছু একদম নিখুঁত, যে কোনো পেসারের জন্য স্বপ্নের এক ডেলিভারি।
নতুন ব্যাটার ক্রিজে নামে সিদ্রা আমিন। পাকিস্তানের সেরা ব্যাটার তিনি। সবশেষ ছয় ইনিংসে যার সেঞ্চুরি দুটি, ফিফটি তিনটি। অসাধারণ ফর্মে থাকা সেই ব্যাটার কুপোকাত মারুফার প্রথম বলেই!
এবারও অনেকটা একইরকম ডেলিভারি। যথারীতি বাতাসে সুইং করে বল পিচ করে আরও ভেতরে ঢুকে যায় অনেকটা। সিদ্রা অবশ্য কিছুটা ব্যাটে লাগাতে পারেন বল। ব্যাটের কানায় লেগে বল আঘাত করে স্টাম্পে।
প্রথম ওভারেই টানা দুটি উইকেটে সুর বেঁধে দেন মারুফা। পরে বাকিরাও সঙ্গী হয়ে দুর্দান্ত বোলিং পারফরম্যান্সে পাকিস্তানকে গুটিয়ে দেয় ১২৯ রানে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ শুরু করে ৭ উইকেটের দারুণ জয়ে।
ডেলিভারি দুটির ভিডিও আইসিসির সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হয়ে যায় দ্রুতই। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত আইসিসির ফেইসবুক পাতায় একটি ভিডিও দেখা হয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ বারের বেশি। আরেকটি ভিডিও দেখা হয়েছে ৭০ লাখের বেশি বার। ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ পাতায় পোস্ট করা দুটি ভিডিও দেখা হয়েছে ২১ লাখ বারের বেশি।
এছাড়াও বিশ্লেষণ বা আরও নানাভাবে ডেলিভারি দুটির ভিডিও বারবার পোস্ট করা হয়েছে আইসিসির ফেইসবুক পাতায়। ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউব তো আছেই। সেখানেও লাখ লাখ বার দেখা হয়েছে ভিডিও। নারী ক্রিকেটের কোনো কিছু এতটা ছড়িয়ে পড়ার নজির বিরল।
তেমনই একটি ভিডিও ফেইসবুকে শেয়ার দিয়েছেন মালিঙ্গা। সাবেক লঙ্কান পেসার সুইং করাতে পারতেন দুই দিকেই। তার ইনসুইঙ্গিইং ইয়র্কার ছিল ভয়ঙ্কর। এছাড়াও নানারকম স্কিলে তিনি ছিলেন সমৃ্দ্ধ। মারুফার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে তিনি লিখেছেন, “নিখাদ স্কিল। অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। এখনও পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সেরা ডেলিভারি।”
মারুফার জন্য অবশ্য এমন ডেলিভারি নতুন কিছু নয়। গত প্রায় তিন বছরে নানা সময়েই তিনি এসব দেখিয়েছেন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে তিনি প্রথম আলোচনায় উঠে এসেছিলেন ২০২১ সালের শুরুতে। মারুফা তখন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটার। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতায় ক্রিকেটের পথে ছোটার স্বপ্ন দেখাই তার জন্য ছিল কঠিন। নিজেদের গরু-মহিষ নেই বলে চাষের জমিতে নিজেই জোয়াল টেনে সহায়তা করতেন হতদরিদ্র বাবাকে। তার সেসসব ছবি সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের ক্রিকেট কর্তাদেরও বাড়তি নজর পড়ে। তার প্রতিভার আলোও ছড়িয়ে পড়ে দ্রুতই। বয়সভিত্তিক দল হয়ে জাতীয় দলে চলে আসেন পরের বছরই।
শুরুর কিছুদিন পরই দলে নিয়মিত হয়ে ওঠেন। এখন তো তিনি দেশের পেস বোলিংয়ের একমাত্র ভরসা।
তার মুল শক্তির জায়গা নতুন বলে ইনসুইঙ্গার। তার রান আ, রিস্ট পজিশন সবই সহজাত ও ইনসুইঙ্গারের জন্য দারুণ উপযোগী। সঙ্গে পরিশ্রম যোগ করে ক্রমেই শাণিত হয়ে উঠেছেন। তাকে ছাড়া বাংলাদেশ দল এখন ভাবাই যায় না।
নতুন বলে সুইং প্রায় সবসময়ই আদায় করেন তিনি। তবে সবদিন তো আর ভালো জায়গায় পিচ করা, এত বেশি মুভমেন্ট, বাতাসের সহায়তা, সবকিছু এমন শতভাগ ঠিকঠাক হয় না। কিন্তু এ দিন সবকিছুই ছিল নিখুঁত, ম্যাচ শেষে বিশ্লেষণে বললেন নারী ক্রিকেটের কিংবদন্তি সাবেক ভারতীয় অধিনায়ক মিতালি রাজ।
“প্রথমত, সে অনেক সুইং আদায় করে নিয়েছে। এরপর সে একদম সঠিক লেংথে বল করেছে। সুইং পাওয়া তো ভালো। তবে সঠিক লাইন ও লেংথে বল না রাখতে পারলে তো পুরস্কারটা মিলবে না। সে পুরস্কারটি পেয়েছে উপযুক্তভাবেই। পরপর দুটি বড় উইকেট, হ্যাটট্রিকের মুখে ছিল সে।”
“মারুফার প্রথম (ওয়ানডে) বিশ্বকাপ এটি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অবশ্য সে খেলেছে এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তার বোলিং দেখে খুবই মুগ্ধ হয়েছিলাম। বিশেষ করে তার গতি, যেভাবে সে এসে বল ডেলিভারি করে। আজকে সে যা করেছে, ফাস্ট বোলার হিসেবে এমন শুরুই দলকে দিতে চাইবেন আপনি। একাদশের একমাত্র ফাস্ট বোলার হয়ে শুরুতেই বড় দুটি উইকেট… বাংলাদেশের জন্য কী দারুণ মুহূর্ত ছিল!”
বাংলাদেশের পরের ম্যাচ গুয়াহাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আগামী মঙ্গলবার।