শান্তর ব্যাটিং দ্যুতিতে বাংলাদেশের আশার ঝিলিক

সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে ২০৫ রানে এগিয়ে বাংলাদেশ, রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরি করে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেছেন শান্ত।

আরিফুল ইসলাম রনিআরিফুল ইসলাম রনিসিলেট থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Nov 2023, 11:39 AM
Updated : 30 Nov 2023, 11:39 AM

পাহাড়ের কোল ঘেষে দাঁড়ানো স্টেডিয়ামে সন্ধ্যা নেমে আসে অনেকটা ঝুপ করেই। শেষ বিকেলে ফ্লাড লাইট জ্বালিয়েও কাটে না চারপাশের আঁধার ভাবটুকু। কিন্তু সেঞ্চুরির পর যে হাসি ফুটে উঠল নাজমুল হোসেন শান্তর মুখে, তাতেই যেন আলোকিত হয়ে উঠল গোটা আঙিনা। ইতিহাস গড়া সেঞ্চুরি বলে কথা!

ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হিসেবে এই সিরিজটি শান্তর জন্য একরকম পরীক্ষা। পাকাপাকিভাবে অধিনায়কের দায়িত্ব পেতে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ। মাত্র তিন দিন পরই তাকে ‘লেটার মার্কস’ দিয়ে দেওয়া যায়! দ্বিতীয় দিনে মাঠের অধিনায়কত্বে দক্ষতার ছাপ রেখেছিলেন। এবার ব্যাট হাতে যা করে ফেললেন, বাংলাদেশের আর কোনো অধিনায়কই তো তা পারেননি আগে।

বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট নেতৃত্বের অভিষেকে সেঞ্চুরির প্রথম কীর্তি গড়লেন শান্ত। অধিনায়কের এই অনন্য ইনিংসে ড্রেসিং রুমেও এখন রোশনাই। দিনের শুরুতে যে আক্ষেপটুকু ছিল লিড না পাওয়ায়, সেসবও একরকম মুছে গেছে শান্তর ইনিংসের দ্যুতিতে।

সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের রান ৩ উইকটে ২১২। প্রথম ইনিংসে নিউ জিল্যান্ডের ৭ রানের লিড বাদ দিয়ে শান্তরা এখন এগিয়ে ২০৫ রানে।

এই লিড আরও হৃষ্টপুষ্ট করতে এখনও টিকে আছেন অধিনায়ক। ১০৪ রানে চতুর্থ দিন শুরু করবেন তিনি। ৪৩ রান নিয়ে তার সঙ্গী অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম।

দিনের শেষটা বাংলাদেশের জন্য যতটা আনন্দময়, শুরুটা ছিল ততটাই হতাশার। তাদের লিড নেওয়ার আশা পিষ্ট করে নিউ জিল্যান্ডের রান বাড়িয়ে নেন কাইল জেমিসন ও টিম সাউদি। ধারহীন বোলিং ও রক্ষণাত্মক মাঠ সাজানোকে কাজে লাগিয়ে দুই কিউই পেসার অনায়াসেই দলকে এনে দেন লিড। প্রথম ঘণ্টায় ১৭ ওভারে ৫০ রান যোগ করেন দুজন।

এই জুটির অস্বস্তি থেকে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায় মুমিনুল হকের হাত ধরে। পানি পানের বিরতির পর প্রথম বলেই তিনি ফিরিয়ে দেন ২৩ রান করা জেমিসনকে। ওই ওভারেই বোল্ড হয়ে যান ৩৫ রান করা সাউদি।

আগের দিন গ্লেন ফিলিপসকে আউট করে নিউ জিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় জুটি ভেঙেছিলেন মুমিনুলই। ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে ৪ রানে ৩ উইকেট নিয়ে শেষ করেন তিনি।

এরপর বাংলাদেশের দুই ওপেনারের মূল কাজ ছিল লাঞ্চের আগে কোনো উইকেট না হারানো। জাকির হাসান ও মাহমুদুল হাসান তা করতে পারেন ভালোভাবেই। জাকির তো কয়েকটি ভালো শটও খেলেন, জয় আঁকড়ে রাখেন এক প্রান্ত।

তবে লাঞ্চের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিদায় নেন দুজন। এজাজ প্যাটেলের টার্ন করা বলের লেংথ পড়তে গড়বড় করে ১৭ রানে ফেরেন জাকির। গত ডিসেম্বরে টেস্ট অভিষেকে ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে পরের দুই টেস্টে ফিফটির স্বাদ পেয়েছিলেন তিনি। এই প্রথম ব্যর্থ হলেন দুই ইনিংসেই।

পরের ওভারেই কিছুটা দুভার্গ্য আর কিছুটা নিজের অসচেতনতা মিলিয়ে কাটা পড়েন জয়। শান্তর স্ট্রেট ড্রাইভ বোলার সাউদির হাত স্পর্শ করে লেগে যায় নন স্ট্রাইক প্রান্তের স্টাম্পে। ওই প্রান্তে জয় তখন ক্রিজের বাইরে। ৪৬ বল খেলে ৮ রান করেন তিনি।

জোড়া ধাক্কার কোনো প্রভাব অবশ্য শান্ত ও মুমিনুলের ব্যাটিংয়ে পড়তে দেখা যায়নি। বরং দ্রুত রান তোলার তাড়না দেখা যায় দুজনের ব্যাটেই। সাউদির শর্ট বলে দারুণ পুল শটে চার মারেন শান্ত। উইকেটে যাওয়ার পরপরই রিভার্স সুইপ খেলে নিজের মনোভাব বুঝিয়ে দেন মুমিনুল। বাউন্ডারি আসতে থাকে নিয়মিত। এজাজের এক ওভারে দুজনে মিলে তিনবার বল পাঠান বাউন্ডারিতে।

প্রথম ইনিংসে দুজনকেই আউট করা গ্লেন ফিলিপসকে আক্রমণে আনেন কিউই অধিনায়ক। তার অফ স্পিনে এক ওভারে দারুণ দুটি শটে চার মারেন শান্ত। জুটির পঞ্চাশ আসে ৬২ বলে।

এরপর কিউইরা কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে আঁটসাঁট বোলিং করতে থাকে। শান্ত ও মুমিনুলও ঝুঁকি না নিয়ে নিজেদের গুটিয়ে নেন কিছুটা। চা বিরতির আগে ও পরে মিলিয়ে টানা ২০ ওভারে আসেনি কোনো বাউন্ডারি।

এই সময়টাতেই অযথা একটি দ্রুত সিঙ্গেলের চেষ্টায় উইকেট হারান ৪০ রান করা মুমিনুল। মিড অনে বল ঠেলেই রান নিতে ছুটতে থাকেন তিনি। কিন্তু তার দিকে না দেখে শান্ত তাকিয়ে ছিলেন ফিল্ডারের দিকে। ক্রিজের অর্ধেক পেরিয়ে আসা মুমিনুল আর ক্রিজে ফিরতে পারেননি, তাকে ফিরতে হয় ড্রেসিং রুমে।

শান্তর মনোযোগে অবশ্য চিড় ধরেনি। একসময় তার রান ছিল ৪৫ বলে ৩৭। ফিফটি পর্যন্ত যেতে পরের ১৩ রান করেন তিনি আরও ৫০ বল খেলে। ফিফটির পরও এগিয়ে যান একইরকম নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিংয়ে।

মুশফিক প্রথম ১০ বলে রানের দেখা পাননি। পরে এজাজের বলে কাট করে ও সুইপ শটে দুটি বাউন্ডারি মেরে তিনিও ছন্দ পেয়ে যান।

দুজনের যুগলবন্দি চলতে থাকে। শান্তর শতরান আসে ১৯২ বলে।

৪৬ ইনিংসে ৫ সেঞ্চুরি করলেন তিনি। বাংলাদেশের হয়ে তার চেয়ে কম ইনিংস খেলে ৫ শতরান করতে পারেননি আর কেউ।

সাবলিল ব্যাটিংয়ে মুশফিক দিনশেষে অপরাজিত ৭১ বলে ৪৩ রান করে। নিউ জিল্যান্ডের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে দিন শেষে অবিচ্ছিন্ন জুটির রান ৯৬। ম্যাচে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের সেরা জুটি।

তবে দুজনের কারও কাজ শেষ নয় এখনই। দ্বিতীয় দিনের খেলা দেখে যেমনটি ধারণা করা হচ্ছিল, তৃতীয় দিনে ততটা স্পিন সহায়ক হয়নি উইকেট। বরং এ দিন যেন আগের চেয়েও একটু বেশি ব্যাটিং সহায়ক হয়ে ওঠে। সামনের সময়টার সম্ভাব্য আচরণও অনুমান করা মুশকিল। লিড তাই যতটা সম্ভব বড় করা জরুরি। শান্ত ও মুশফিকের ইনিংসও তাই আরও বড় হওয়া জরুরি। 

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৩১০

নিউ জিল্যান্ড ১ম ইনিংস: ১০১.৫ ওভারে ৩১০ (আগের দিন ২৬৬/৮) (জেমিসন ২৩, সাউদি ৩৫, এজাজ ০*; শরিফুল ১৩-২-৫৪-১, মিরাজ ২২-৩-৬৪-১, তাইজুল ৩৯-৯-১০৯-৪, নাঈম ২৪-৩-৭৩-১, মুমিনুল ৩.৫-১-৪-৩)

বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ৬৮ ওভারে ২১২/৩ (জয় ৮, জাকির ১৭, শান্ত ১০৪*, মুমিনুল ৪০, মুশফিক ৪৩*; সাউদি ১২-৩-২২-০, জেমিসন ৯-৩-১৯-০, এজাজ ২৩-১-৯৪-১, ফিলিপস ১২-৩৬-০-, সোধি ১২-১-৪১-০)