লিটনের নান্দনিক ঝড়ে সিলেটের জয়রথ থামাল কুমিল্লা

টানা পাঁচ জয়ের পর হারের তিক্ত স্বাদ পেল সিলেট, হ্যাটট্রিক হারের পর টানা দ্বিতীয় জয় পেল কুমিল্লা।

শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদচট্টগ্রাম থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 17 Jan 2023, 04:55 PM
Updated : 17 Jan 2023, 04:55 PM

আগের দিনই লড়াইটিকে ‘বড় ম্যাচের’ তকমা দিয়েছিলেন ইমরুল কায়েস। শীর্ষে থাকা সিলেট স্ট্রাইকার্সের বিপক্ষে ম্যাচ বলে কথা! দুই দলের প্রথম দেখায় হারার পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স অধিনায়কের আশা ছিল, এবার ভালো কিছু হবে। ইমরুলের সেই চাওয়া পূরণ হলো বোলারদের সম্মিলিত পারফরম্যান্স ও লিটন দাসের চোধধাঁধানো স্ট্রোকের ছটায়। অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটকে থাকা সিলেট খেল হোঁচট।

বিপিএলে টানা পাঁচ জয়ে উড়তে থাকা সিলেট স্ট্রাইকার্সকে ৫ উইকেটে হারাল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার ১৩৪ রানের লক্ষ্য ৬ বল আগে স্পর্শ করে তারা।  

রান তাড়ায় কুমিল্লার অর্ধেকের বেশি রানই আসে লিটনের ব্যাট থেকে। আসরে নিজের প্রথম ফিফটিতে ৪২ বলে ৭০ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছেন তিনি। মুগ্ধতা জাগানিয়া সব শটের পসরা মেলে ধরা ইনিংসে ৭ চারের সঙ্গে ছক্কা ছিল ৪টি।

টানা দ্বিতীয় ম্যাচ সেরার পুরস্কারও জিতে নেন স্টাইলিশ এই ব্যাটসম্যান। আগের দিন চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের বিপক্ষে জয়ে ২২ বলে ৪০ রানের ইনিংস খেলে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন তিনি।

বিপিএলে এবার প্রথম তিন ম্যাচে তার ব্যাট সেভাবে কথা বলেনি। কুমিল্লাও ছিল জয়বিহীন। টানা দুই ম্যাচে তার ব্যাট হেসে উঠল। হ্যাটট্রিক হারের পর কুমিল্লাও পেল টানা দুই জয়।

লিটন যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন, কুমিল্লার জয় মনে হচ্ছিল অনায়াস। কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ে তাকে ফেরানোর পর খুশদিল শাহকেও ফিরিয়ে ম্যাচ জমিয়ে তোলার ইঙ্গিত দেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। রান আউট হয়ে যান জাকের আলিও। তবে উত্তেজনা ছড়ালেও শেষ পর্যন্ত বিপাকে পড়তে হয়নি কুমিল্লাকে।

কুমিল্লার দাপটের শুরু ম্যাচের শুরু থেকেই। টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে সিলেট। স্কোরবোর্ডে ৫৩ রান যোগ হতেই ৭ উইকেট হারিয়ে অল্পে গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়ে যায় তারা।

দ্বিতীয় ওভারে হাসান আলির বলে ছক্কা মেরে পরের বলেই স্কুপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন মোহাম্মদ হারিস। প্রমোশন পেয়ে তিন নম্বরে উঠলেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি আকবর আলি। স্রেফ ১ রান করে আবু হায়দার রনির বলে পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি।

জোড়া চার মারার পর হাসান আলির দ্বিতীয় শিকার হন জাকির হাসান। মাঠের আম্পায়ার কট বিহাইন্ডের আবেদনে নট আউট দিলে রিভিউ নেয় কুমিল্লা। রিপ্লে দেখে টিভি আম্পায়ার আউটের সিদ্ধান্ত জানালে মাঠ ছাড়ার সময় বেশ নাখোশ দেখা যায় জাকিরকে।

নাজমুল হোসেন শান্ত (১৯ বলে ১৩), মুশফিকুর রহিমরা (১৫ বলে ১৬) কিছুক্ষণ টিকে থাকলেও পারেননি ইনিংস বড় করতে।

৫ উইকেট পড়ার পরই নেমে গিয়েছিলেন মাশরাফি। কিন্তু ৫ বল খেলে রানের খাতাও খুলতে পারেননি সিলেট অধিনায়ক। তানভির ইসলামের বলে বোল্ড হয়ে ফিরে যান প্যাভিলিয়নে।

চরম বিপর্যয়ে অষ্টম উইকেটে ৮০ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে দলকে লড়াই করার মতো পুঁজি এনে দেন ইমাদ ওয়াসিম ও থিসারা পেরেরা। ২টি করে চার-ছয়ে ৩১ বলে ৪৩ রান করেন থিসারা। ইমাদের ব্যাট থেকে আসে ৩ চার ও ১ ছয়ে ৩৩ বলে ৪০ রান।

রান তাড়ায় নেমে আগের দিন যেখানে থেমেছিলেন, সেখান থেকেই যেন শুরু করেন লিটন। মাশরাফির প্রথম বলেই মারেন বাউন্ডারি। মোহাম্মদ আমিরের দ্বিতীয় ওভারেও নিয়ন্ত্রিত ফ্লিক শটে বলকে সীমানা পার করেন তিনি।

তৃতীয় ওভারে ইমাদ আক্রমণে এলে পঞ্চম বলে নিজের প্রথম ছক্কাটি মারেন লিটন। পরের বলে চার মেরে পৌঁছে যান ১২ বলে ২৪ রানে। চতুর্থ ওভারে মাশরাফিকে দৃষ্টিনন্দন কভার ড্রাইভে মারেন জোড়া চার। শুরুর স্নায়ুর চাপ মুহূর্তেই উধাও!

রান রেটের চাপ না থাকায় অপরপ্রান্তে মোহাম্মদ রিজওয়ান খেলতে থাকেন রয়েসয়ে। পাওয়ার প্লের শেষ ওভারটি লিটনকে মেইডেন করেন ইমাদ। এক ওভার পর আকবর আলির দারুণ ফিল্ডিংয়ে রানআউট হন রিজওয়ান। ভাঙে ৫৭ রানের উদ্বোধনী জুটি।

রিজওয়ান ফিরলেও কমেনি লিটনের ব্যাটের ধার। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নবম ওভারে রুবেল হোসেনের লেংথ বলে দুর্দান্ত পুল শটে ডিপ স্কয়ার লেগ দিয়ে বিশাল ছক্কা মারেন অধিনায়ক ইমরুল। অল্পের জন্য মাঠের বড় পর্দায় লাগেনি ওই শট।

তবে ইমরুল বেশি দূর যেতে পারেননি। মোহাম্মদ শরিফউল্লাহর বলে ফিরতি ক্যাচ দেন স্রেফ ১৮ রান করে।

শরিফউল্লাহর পরের ওভারে ম্যাচ প্রায় নিজেদের পকেটে পুরে নেন লিটন। প্রথম বলে ছক্কা মেরে পূরণ করেন বিপিএল ক্যারিয়ারের সপ্তম ও সবমিলিয়ে টি-টোয়েন্টি সংস্করণের ২০তম ফিফটি। ওই ওভারে আরও দুই ছক্কা ও এক চারে নেন ২৪ রান।

লিটনের সেই উত্তাল যাত্রা থামান মাশরাফি। তার স্লোয়ার ডেলিভারি মিড অফের ওপর দিয়ে খেলতে গিয়ে থিসারার হাতে ক্যাচ দেন লিটন। তখন জয়ের জন্য ৩৩ বলে স্রেফ ২৩ রান প্রয়োজন কুমিল্লার। 

সেই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে কিছুটা তালগোল পাকায় তারা। মাশরাফিকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে দেন খুশদিল। পরের বলে জাকিরের দুর্দান্ত থ্রোয়ে রান আউট জাকের। ম্যাচে তখন নাটকীয়তার ইঙ্গিত।

তবে তা হতে দেননি জনসন চার্লস ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। ১৯তম ওভারে আমিরের বলে ছক্কায় চার্লস অনেকটাই ফয়সালা করে দেন ম্যাচের। 

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

সিলেট স্ট্রাইকার্স: ২০ ওভারে ১৩৩/৭ (হারিস ৭, শান্ত ১৩, আকবর ১, জাকির ৯, মুশফিক ১৬, শরিফউল্লাহ ১, মাশরাফি ০, ইমাদ ৪০*, থিসারা ৪৩*; আবু হায়দার ৪-০-২৩-১, হাসান ৪-০-৩০-২, তানভির ৪-০-২১-১, মুকিদুল ৪-০-২৮-২, মোসাদ্দেক ৪-০-৩০-০)

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স: ১৯ ওভারে ১৩৪/৫ (লিটন ৭০, রিজওয়ান ১৫, ইমরুল ১৮, চার্লস ১৮*, খুশদিল ৩, জাকের ০, মোসাদ্দেক ৫*; মাশরাফি ৪-০-১৯-২, আমির ৪-০-৩১-০, ইমাদ ৪-১-১৭-০, রুবেল ৩-০-২৪-০, শরিফউল্লাহ ৩-০-৩১-১, শান্ত ১-০-৭-০)

ফল: কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ৫ উইকেটে জয়ী

ম্যান অব দা ম্যাচ: লিটন দাস

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক