Published : 27 Dec 2025, 08:30 AM
সংবাদ সম্মেলনের একদম শেষ দিকে প্রশ্ন ছুটে গেল, “কমিটির টিম, এটা শুনতে কেমন লাগে?” প্রশ্ন শুনে শেখ মেহেদি হাসান এক মুহূর্ত ভাবলেন। এরপর হয়তো মজাটুকু ধরতে পারলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “দেখুন, কমিটির দল এটা তো আমরা এলাকাগত (ব্যাপার) জানি… এখানে কমিটির দল কীভাবে বলব (হাসি)… খেলা সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে, কমিটির দল থাকলেও লাভ নেই আসলে…।” ব্যাপারটি যে মজা করেই বলা, সেটুকুও আলাদা করে জানানোর প্রয়োজন মনে করলেন চট্টগ্রাম রয়্যালসের অধিনায়ক, “জাস্ট ফান করে বলেছেন, ঠিক আছে…।”
পাড়া-মহল্লার টুর্নামেন্টে যেমন আয়োজকদের দল থাকে, সেই দলের প্রতি কমিটির পক্ষপাতিত্ব নিয়ে নানা কিছু হয়ে যায়, মজা করে বলা হলেও বিপিএলে এখন সেটুকু বলার ক্ষেত্র তৈরি হয়ে গেছে। বিসিবির টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে বিসিবিরই দল চট্টগ্রাম রয়্যালস।
এবারের বিপিএলে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত দল বলা যায় এটিকে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন এই দলকে ঘিরে এমন ঘটনা ঘটে যায়, ক্রিকেটবিশ্বে যা নজিরবিহীন। আর্থিক সঙ্কটের কথা জানিয়ে দলের মালিকানা ছেড়ে দেয় মালিকপক্ষ। টুর্নামেন্ট হিসেবে বিসিবির অপেশাদারিত্ব ও দীনতাই আরেকবার ফুটে ওঠে তাতে। বিসিবি তখন দলটির দায়িত্ব নেয়, তড়িঘড়ি করে কোচ নিয়োগ দেওয়াসহ টিম ম্যানেজমেন্ট ঠিক করে দেওয়া হয়।
মাঠের বাইরে টালমাটাল সেই দলটিই উদ্বোধনী দিনে মাঠে নেমে দারুণ পারফরম্যান্স উপহার দেয়। সিলেটে শুক্রবার ৬৫ রানে উড়িয়ে দেয় তারা নোয়াখালী এক্সপ্রেসকে।
বিসিবি দায়িত্ব নেওয়ার আগের কয়েকদিনে নানা অনিশ্চয়তায় এই দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল অস্থিরতা। ম্যাচ জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে তা অকপটেই বললেন অধিনায়ক শেখ মেহেদি।
“ব্যবস্থাপনা যদি ভালো না থাকে, ক্রিকেটাররা তো একটু… আমরা যেহেতু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার, এই পরিবেশনটা তো… মূলত এরকম পরিবেশ কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজিতে আমি পাইনি। আমার জন্য কঠিন ছিল।”
তবে পরিস্থিতি কঠিন হলেও পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবেই তারা মাঠে নেমে মেলে ধরেছেন নিজেদের।
“পরিস্থিতি যেমনই হোক, খেলার ভেতর ঢুকলে তো সবটুকু প্রচেষ্টা থাকবে খেলা নিয়ে। এরকমই ছিল আমাদের। চেষ্টা ছিল, মাঠে ঢুকলে যেন আমরা সবাই যথাযথ তাড়না দেখাতে পারি।”
“যতই ঝড়-তুফান যাক না কেন, খেলা তো মাঠের ভেতরে। আপনি যখন ২২ গজে ঢুকবেন, মানসিকতা তখন খেলার জন্যই থাকবে।”
এই পরিস্থিতির ভেতরও বরং ইতিবাচকতা খুঁজে নিয়েছেন শেখ মেহেদি। ঝগ-তুফান সব টুর্নামেন্ট শুরুর আগে হওয়ায় স্বস্তি পাচ্ছেন চট্টগ্রাম অধিনায়ক।
“এটা একটু কঠিন ছিল, তবে যেটা বললাম, দিনশেষে ক্রিকেট খেলা। আমরা তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিয়েছি, এটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ক্রিকেটার হিসেবে স্বস্তির একটা ব্যাপার থাকে। এটা খেলার ভেতরে (টুর্নামেন্ট চলার সময়) হতে পারত। খেলা শুরুর আগেই সমাধান হওয়ায় ক্রিকেটারদের জন্য ভালো হয়েছে।”

“খেলার মাঝপথে এমন একটি দুর্ঘটনা হতে পারত। খেলা শুরুর আগেই শেষ হয়ে গেছে এটা। সবাই এখন ফ্রেশ আছে। কারও ওপর চাপ নেই, মানসিকভাবে ফ্রি আছে।”
মাঠের বাইরের পরিস্থিতির জন্যই শুধু নয়, চট্টগ্রামের এই জয়টা বিশেষ কিছু আরেকটি কারণেও। বিদেশি ক্রিকেটার চারজন পর্যন্ত খেলানোর নিয়ম থাকলেও প্রথম দিনে তাদের একাদশে ছিল মাত্র দুজন। আর কোনো বিদেশিই যে তাদের নেই আপাতত!
সেই দুই বিদেশিও প্রায় অচেনা। তাদের একজন পাকিস্তানের মির্জা তাহির বেগ নিজ দেশে ক্রিকেটেও তেমন কিছু করতে পারেননি। দেশের বাইরে খেলছেন তিনি প্রথমবার। আরেকজন মাসুদ গুরবাজ। তার মূল পরিচয়, আফগানিস্তানের তারকা রাহমানউল্লাহ গুরবাজের ভাই। তিনিও ভাইয়ের মতো কিপার-ব্যাটার, তবে নিজের পরিচয় গড়ার মতো কিছু এখনও করতে পারেননি। ১৭ টি-টোয়েন্টি খেলে তার ব্যাটিং গড় ৯.৭২, স্ট্রাইক রেট ৮৯.১৬।
সেই মির্জা বেগ ৮০ রানের ইনিংস খেলে প্রথম ম্যাচেই ম্যান অব দা ম্যাচ। গুরবাজ ব্যাটিংয়ে নামতে পারেনি। কিপিংয়ে ক্যাচ নিয়েছেন দুটি।
শেখ মেহেদির আশা, সামনে আরও বিদেশি আনতে পারলে দলটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।
“আশা করি, পরের ম্যাচ থেকে আমরা চারজন বিদেশি নিয়ে খেলতে পারব। তাহলে দলের ব্যালান্স আরও ভালো হবে। তবে এটা তো আমাদের হাতে নেই। বর্তমানে যারা অফিসিয়াল আছেন, তারা হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।”
শেখ মেহেদির নিজের জন্য এই দল ও এবারের আসর একটু ভিন্ন। বড় কোনো পর্যায়ে অধিনায়কত্ব করছেন তিনি প্রথমবার। সেই রোমাঞ্চ তাকে স্পর্শ করছে।
“অধিনায়কত্ব আমার জন্য একদমই নতুন। ভালো পর্যায়ের ক্রিকেটে কখনোই সম্ভবত অধিনায়কত্ব করিনি। এটা আমার প্রথম ছিল। একটু রোমাঞ্চিতও ছিলাম। সব মিলিয়ে ভালো লাগছে।”
ব্যাট হাতে ১৩ বলে ২৬ রানের ইনিংস খেলার পর বোলিংয়ে চার ওভারে ১৭ রান দিয়ে দুটি উইকেট নিয়ে নেতৃত্বের অভিষেক রাঙিয়েছেন তিনি। নেতৃত্ব নিয়ে ম্যাচের পর পুরস্কার বিতরণী আয়োজনে ৩১ বছর বয়সী অলরাউন্ডার বললেন, পূর্বসূরীদের কাছ থেকে শিখেছেন তিনি।
“আমি এখনও শিখছি (অধিনায়কত্ব)। আমার নেতৃত্বে এটিই প্রথম বিপিএল ম্যাচ। অনেক আন্তর্জাতিক ম্যাচ আমি খেলেছি। সিনিয়র ক্রিকেটার রিয়াদ ভাই (মাহমুদউল্লাহ), সাকিব ভাই, তামিম ভাই, মুশি ভাইদের সঙ্গে খেলেছি এবং তাদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছি।”