ক্রিকেট মাঠের লড়াকু চরিত্র। ছাড় দিতে চান না যিনি এক বিন্দুও। বরাবরই দল অন্তপ্রাণ। বল হাতে উইকেট শিকারি। অনেক জয়ের নায়ক। মাঠের বাইরে আবার দারুণ প্রাণখোলা, সেখানে তিনি প্রতিপক্ষেরও প্রিয়। মাঠের ভেতরে-বাইরে এমনই এক বর্ণময় চরিত্র হরভজন সিং। অর্জনে সমৃদ্ধ এক ক্যারিয়ার নিয়ে ক্রিকেটকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানোর পর ভারতীয় অফ স্পিনারের জীবন-চরিত্র-ক্যারিয়ারের নানা দিক উঠে এলো তার বিভিন্ন সময়ের সতীর্থদের কথায়।
Published : 25 Dec 2021, 11:55 AM
শচিন টেন্ডুলকার যেমন ছিলেন প্রায় পরিপূর্ণ এক ব্যাটসম্যান, হরভজনের প্রতি তার ভালোবাসার শব্দমালাও তেমনি গোছানো। টুইটারে ভারতীয় কিংবদন্তি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলেন ক্রিকেটার ও মানুষ হরভজনকে।
“কী অসাধারণ ও পরিপূর্ণ ক্যারিয়ার, ভাজ্জি! প্রথম তোমার সঙ্গে আমার দেখা ১৯৯৫ সালে, ভারতের নেটে। সেই থেকে বছরের পর বছর আমরা অংশ হয়েছি দারুণ সব স্মৃতির।”
“দুর্দান্ত এক টিমম্যান তুমি, যে খেলেছে হৃদয় উজাড় করে। যে কোনো দলেই তোমাকে পাওয়া মানে মাঠের ভেতরে-বাইরে আনন্দময় সময়। হাসিময় সেই মুহূর্তগুলো কখনোই ভুলতে পারি না। সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে ভারতের জন্য সর্বোচ্চটাই দিয়েছো তুমি, আমরা তোমাকে নিয়ে দারুণ গর্বিত। ক্যারিয়ারের ‘দুসরা’ অধ্যায় তোমার জন্য হোক আনন্দময় ও সাফল্যমণ্ডিত।”
টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম অধ্যায়ে ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে ৮ টেস্টে খেলে তার প্রাপ্তি ছিল ২১ উইকেট। ধারহীন বোলিংয়ে জায়গা হারান তখন। এরপর ২০০১ সালে দেশের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে স্পিন কিংবদন্তি অনিল কুম্বলের চোটের কারণে আবার সুযোগ পান হরভজন। সেই সিরিজেই তিন টেস্টে ৩২ উইকেট নিয়ে তিনি গড়েন ইতিহাস। নায়ক হন দলের স্মরণীয় এক সিরিজ জয়ের।
ওই সিরিজেই কলকাতা টেস্টে ফলো-অনের পর অবিস্মরণীয় জয় পায় ভারত। দুই ইনিংস মিলিয়ে হরভজন নেন ১৩ উইকেট। ভারতের প্রথম বোলার হিসেবে করেন টেস্ট হ্যাটট্রিকও।
সেই টেস্টে দলের দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮০ রানের ইনিংস খেলে ঘুরে দাঁড়ানোর নায়কদের একজন ছিলেন রাহুল দ্রাবিড়ও। ভারতের ব্যাটিং কিংবদন্তি এখন জাতীয় দলের প্রধান কোচ, দলের সঙ্গে আছেন দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে। সেখান থেকে তিনি বিদায়ী অভিবাদন জানালেন হরভজনকে, ফিরে গেলেন ২০০১ সিরিজেও।
“হরভজন সিংয়ের ক্যারিয়ারে অনেক ওঠা-নামা ছিল। তবে সে সবসময় লড়াই করেছে। দুর্দান্ত লড়াকু ও দারুণ টিমম্যান, যাকে সঙ্গে নিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে নামার তাগিদ জাগত। ভারতের গ্রেট পারফরমারদের একজন তো বটেই।”
“অনিল কুম্বলের সঙ্গে দারুণ এক জুটির অংশ, ওই সময়টায় ভারতের দুর্দান্ত জয়ের অংশ, তার সঙ্গে খেলতে পারা দারুণ সন্তুষ্টির ও সম্মানের। ভাজ্জির ক্যারিয়ারের হাইলাইট অবশ্যই সেই ৩২ উইকেট (২০০১ সিরিজে) এবং বাদ পড়ার পর ফিরে আসা। কুম্বলের অনুপস্থিতিতে বোলিং আক্রমণকে সে যেভাবে এগিয়ে নিয়েছে, তা ছিল অসাধারণ।”
সেই কলকাতা টেস্টে ২৮১ রানের ইতিহাস গড়া ইনিংসের নায়ক, ভারতের ব্যাটিং গ্রেট ও ভারতীয় জাতীয় একাডেমির এখনকার প্রধান ভিভিএস লক্ষ্নণও স্তুতিতে ভাসালেন সাবেক সতীর্থকে।
মূলত অফ স্পিনার হলেও ব্যাট হাতে ২টি টেস্ট সেঞ্চুরি ও ৯টি ফিফটি আছে হরভজনের, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আছে কার্যকর কিছু ইনিংস। লক্ষ্নণ মনে করিয়ে দিলেন হরভজনের ব্যাটিং প্রতিভার কথা।
“স্মরণীয় এক ক্যারিয়ারের জন্য আমার দারুণ সতীর্থ হরভজন সিংকে হৃদয়ের ভেতর থেকে অভিনন্দন। অফ স্পিনের অসাধারণ প্রদর্শক, সহজাত এক ব্যাটসম্যান এবং সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী, যিনি গড়ে দিয়েছেন ভারতের দারুণ সব জয়। ভবিষ্যতের জন্য শুভ কামনা ভাজ্জি, শুভ হোক।”
কুম্বলের অনুপস্থিতিতে হরভজনের ক্যারিয়ারের পুনরুজ্জীবন, পরে তার সঙ্গে মিলেই গড়েন ভয়ঙ্কর এক স্পিন জুটি। কুম্বলে তুলে ধরলেন সেই স্মৃতি।
“দুর্দান্ত ক্যারিয়ারের জন্য অভিনন্দন, ভাজ্জি। তোমার সঙ্গে বল করতে পারা ছিল অসাধারণ অভিজ্ঞতা। মাঠে চমৎকার সব স্মৃতির জন্ম হয়েছে তোমার সঙ্গে। দ্বিতীয় ইনিংস দারুণ হোক, পার্টনার! তোমার ও পরিবারের জন্য শুভ কামনা।”
১০৩ টেস্টে ৪১৭ উইকেট হরভজনের, ভারতের টেস্ট ইতিহাসের চতুর্থ সফলতম বোলার। ওয়ানডেতে উইকেট ২৩৪ ম্যাচে ২৬৫টি, এখানে তিনি দেশের ইতিহাসের পঞ্চম সেরা। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে উইকেট ২৫টি। স্বীকৃত ক্রিকেটে উইকেট তার ১ হাজার ৪০৮টি।
সাবেক ভারতীয় ব্যাটসম্যান গৌতম গম্ভির মেলে ধরলেন হরভজনের এই অর্জনে ভরা ক্যারিয়ারের ছবি।
“যারা বলে, ক্রিকেট ব্যাটসম্যানদের খেলা হয়ে যাচ্ছে, তাদের উচিত তোমার ক্যারিয়ারে তাকানো। তুমি সত্যিকারের এক মহাতারকা।”