০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

খাওয়াজার বিস্ফোরক দাবি উড়িয়ে লিমান, ‘হয়তো বই বিক্রির প্রক্রিয়ার অংশ’

২০১৮ সালে কেপ টাউন টেস্টের সেই আলোচিত-সমালোচিত বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারির ঘটনায় গোটা দলই জড়িত ছিল, উসমান খাওয়াজার এমন দাবির পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ওই সময়ের অস্ট্রেলিয়া কোচ ড্যারেন লিমান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Nov 2026, 10:19 PM

Updated : 07 Nov 2026, 10:19 PM

২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপ টাউন টেস্টে বল টেম্পারিং করার কথা অস্ট্রেলিয়া দলের সবাই জানত বলে উসমান খাওয়াজা যে দাবি করেছেন, তা উড়িয়ে দিয়েছেন ড্যারেন লিমান। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক কোচ বলেছেন, দ্বিতীয় টেস্ট চলাকালীন বল টেম্পারিং নিয়ে যে আলোচনার দাবি খাওয়াজা করেছেন, সে বিষয়ে তার কিছু জানা ছিল না।

শনিবার ‘এবিসি গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড’-এর সঙ্গে আলাপে লিমান নিশ্চিত করেন যে, নিউল্যান্ডসে টেস্টের তৃতীয় দিনে বল টেম্পারিংয়ের ছবি প্রকাশ্যে আসার ঠিক আগে ক্যামেরন ব্যানক্রফট যার সঙ্গে কথা বলছিলেন, সেই কোচ তিনি ছিলেন না। এছাড়া ড্রেসিং রুমে খাওয়াজা দলের সবাইকে সম্মিলিতভাবে সবকিছু মোকাবিলা করার আহ্বান জানিয়ে কোনো বক্তব্য দিয়েছিলেন কি না, তাও তার মনে নেই।

উল্লেখ্য, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) দ্রুত তদন্তের পর কেবল ব্যানক্রফট, স্টিভেন স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নারকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছিল।

খাওয়াজা এই বিস্ফোরক দাবিগুলো তুলে ধরেছেন তার আত্মজীবনীতে। ‘সব্‌র’ নামের বইটি বাজারে আসবে আগামী মঙ্গলবার। শনিবার ‘নাইন নিউজপেপার্স’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ব্যাটসম্যান বলেন, বল টেম্পারিংয়ের ব্যাপারটি গোটা দল মিলেই করা হয়েছিল, “আমরা সবাই জড়িত ছিলাম।” এখন কেন বিষয়টি প্রকাশ্যে আনছেন, তার ব্যাখ্যাও দেন তিনি।

ওই সময় অস্ট্রেলিয়ার কোচ ছিলেন লিমান। জোহানেসবার্গে চতুর্থ ও শেষ টেস্টের আগেই তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। বরাবরই লিমান দাবি করে আসছেন যে, সিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষে বল টেম্পারিং করার পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না।

বর্তমানে এবিসিতে কর্মরত লিমান বলেন, ২০১৮ সালের ওই সিরিজের আগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বল টেম্পারিং ছিল ‘বড় অংশ।’

“আমার মনে হয় না যে, সবাই বিষয়টি জানত। তবে আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, বল-টেম্পারিং চলছে, কারণ ১৫০ বছর ধরেই এটি হয়ে আসছে…।”

“এটি সম্পূর্ণ খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত বিষয় এবং আমার মনে হয়, তারা নিজেরাই তাদের মতামত এবং তাদের জানা তথ্যগুলো তুলে ধরবে। আমি তাদের হয়ে কথা বলতে পারি না। আমি কেবল নিজের জানা বিষয়টুকুই বলতে পারি; আমি জানি যে, একসময় বল টেম্পারিং ক্রিকেট খেলার বড় অংশ ছিল। এখন আর তা নেই। তবে তার মানে এই নয় যে, বিষয়টি সঠিক ছিল-এটি ছিল একটি বাস্তবতা এবং এর জন্য আমাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। আমাদের বড় খেসারত দিতে হয়েছে এবং সেই সময়ে যা কিছু ঘটেছে, তার পরিণতি আমাদের মেনে নিতে হয়েছে এবং তা নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।”

‘নাইন নিউজপেপার্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাওয়াজার বইয়ে এমন দাবি করা হয়েছে যে, গেবেখায় (তৎকালীন পোর্ট এলিজাবেথ) দ্বিতীয় টেস্টেও সিরিষ কাগজ ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং তা ব্যবহারও করা হয়েছিল, যদিও এমনটা আগে কখনও শোনা যায়নি।

লিমান জানান যে, রিভার্স সুইংয়ের প্রভাব সম্পর্কে সবারই মোটামুটি ধারণা ছিল, তবে সুনির্দিষ্ট কোনো আলোচনার কথা তার জানা ছিল না।

এমন কোনো আলোচনার কথা তিনি জানতেন কি না-এমন প্রশ্নে লিমান বলেন, “না, না। তবে ক্রিকেট খেলায় তো নানা বিষয় নিয়ে সবসময়ই নানা আলোচনা চলতে থাকে। এটি স্মিথ ও খাওয়াজার আলোচনার বিষয় হতে পারে। তবে ক্রিকেট খেলা নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন রিভার্স সুইংয়ের বিষয়টি তো জানাই থাকে। তাই রিভার্স সুইংয়ের মোকাবিলা কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে নিশ্চিতভাবেই আলোচনা হয়েছিল। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকা খুব ভালোভাবেই তা করছিল এবং বল সুইং করাচ্ছিল।”

কেপ টাউন টেস্টে তৃতীয় দিনের সন্ধ্যায় ড্রেসিং রুমে খাওয়াজা কোনো বক্তব্য রেখেছিলেন কি না, তা লিমানের মনে নেই। এটি যে হয়ে থাকতে পারে, সেটাও তিনি অস্বীকার করেননি; কারণ সেই সময়ে নিউল্যান্ডসের ড্রেসিং রুমটি দুটি আলাদা অংশে বিভক্ত ছিল।

“তখন দুটি ড্রেসিং রুম ছিল এবং সব জায়গাতেই নানা আলোচনা চলছিল। সত্যি বলতে, আমিও তখন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় ব্যস্ত ছিলাম। ফলে সেখানে অনেক বিষয়ই ছিল। তাই আমার মনে নেই, তবে এমনটা (আলোচনা) হয়েও থাকতে পারে। আমি নিশ্চিত নই। তাই হ্যাঁ বা না-কোনোটিই বলছি না আমি। তার (খাওয়াজা) হয়তো বিষয়টি মনে আছে, তার দৃষ্টিকোণ থেকে হয়তো বিষয়টি এমনই। আসলে, এই পুরো বিষয়টি নিয়ে সব জায়গাতেই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে।”

বলে সিরিষ কাগজ ঘষার দৃশ্য টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ার ঠিক আগে ব্যানক্রফট এবং নাম প্রকাশ না করা এক কোচের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও লিমানের কিছু জানা নেই।

“হয়তো সেই আলোচনা সম্পর্কে আমার জানা উচিত ছিল। তবে এমন আলোচনা যেকোনো সময়েই হতে পারে। আদৌ কি তা হয়েছিল? আমি জানি না।”

লিমান নিশ্চিত করেছেন যে, খাওয়াজা দাবিগুলো প্রকাশ্যে আনার আগে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স এবং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী টড গ্রিনবার্গকে অবহিত করেছেন বলে জানান খাওয়াজা। যদিও তিনি কী লিখেছেন, সে বিষয়ে খুব সীমিত তথ্যই দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

লিমান বলেন, ওই সময়ের ঘটনাগুলো নিয়ে ফিরে দেখাটা ছিল বেশ কঠিন। জানান, সেই ঘটনার পর টানা চার মাস তিনি বাড়ির বাইরেই বের হননি।

“আমার জন্য এটি মানসিকভাবে স্পর্শকাতর একটি বিষয়। আমি জানি, দলের অন্যরাও নিশ্চয়ই একই রকম অনুভব করছে। সে (খাওয়াজা) কি সেই সময়েই এসব কথা বলতে পারত? আমার মনে হয়, বইটিতে থাকা বিষয়গুলোর মধ্যে এটি একটি। আসলে, বই তো বিক্রির জন্যই লেখা হয়, বিষয়টা সবাই জানে। সে এখন অবসর নিয়েছে। সম্ভবত সে প্যাট কামিন্স এবং দলের অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলেছে। তবে সত্যি বলতে, তার সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি; সে আমাকে কোনো বার্তা পাঠায়নি বা ফোনও করেনি। পরিস্থিতিটা এমনই, এতে কোনো নাটকীয়তা নেই।

“হয়তো বই বিক্রির প্রক্রিয়ারই একটি অংশ এটি। এর জন্য সে কত অর্থ পাচ্ছে, তা জানি না, তবে সম্ভবত বেশ মোটা অঙ্কের অর্থই পাচ্ছে। এজন্য কি এটা করা যায়? জানি না। হয়তো আমিও একটা বই লিখে ফেলব। খেলার স্বার্থে বা মানুষের ভালোর জন্য অনেক সময় অনেক কথা না বলাই ভালো। তবে যা ঘটার, ঘটেছে। যখনই এটা সামনে আসবে, মেনে নিতে হবে, তাই না? আমার বিশ্বাস, অন্য কোথাও আবারও এমনটা ঘটবে।”

ক্রিকেটের স্বার্থে অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত বলে মনে করেন লিমান।

“আবারও বলছি, যা ঘটেছে এবং যা কিছু জানা গেছে, তার জন্য আমরা কেবল ক্ষমা চাইতে পারি, আর ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের উচিত সবকিছু পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। কারণ, ক্রিকেটের চেয়ে কোনো ব্যক্তি বড় নয়।”

খাওয়াজার সাক্ষাৎকারের পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া বিবৃতি প্রকাশ করে জানায় যে, তারা পুরো ঘটনাটির সত্য প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়ে সন্তুষ্ট। তবে ২০১৮ সালের সেই টেস্ট ম্যাচে অংশ নেওয়া অন্য কোনো খেলোয়াড়ের পক্ষ থেকে এখনও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।