Published : 15 Dec 2025, 09:19 PM
সংবাদ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা তখনও শুরু হয়নি। মঞ্চে বসে টুকটাক কথার ফাঁকে শোয়েব আখতার বললেন, “আমি চাই, তাসকিন আমার গতির রেকর্ড ভেঙে দিক।” ব্যাপারটি আদতে সম্ভব নয়, সেটি ফুটে উঠল সবার হাসিতেই। শোয়েবও সেটি জানেন বলেই হয়তো নিজের কথায় হাসছিলেন নিজেও। একইরকম প্রায় অসম্ভব আরেকটি কথাও বললেন পাকিস্তানের সাবেক গতি তারকা। তার চাওয়া, কোনোভাবে বিশ্বকাপ জিতে যাক বাংলাদেশ।
শোয়েবের সংবাদ সম্মেলনের উপলক্ষ অবশ্য তাসকিন বা বাংলাদেশ জাতীয় দল নয়। ক্রিকেট ইতিহাসের দ্রুততম ডেলিভারি করার নায়ক ঢাকায় এসেছেন বিপিএল দল ঢাকা ক্যাপিটালসের ‘মেন্টর’ হিসেবে চুক্তি সই করতে। ঢাকায় পা রেখেছেন রোববার প্রথম প্রহরে। সোমবার ঢাকার একটি হোটেলে তিনি মুখোমুখি হলেন সংবাদমাধ্যমের।
দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে আসা নিয়ে নিজের রোমাঞ্চের কথা কদিন আগে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন তিনি। এবার ফেরার পর ৫০ বছর বয়সী সাবেক গতি তারকা স্মৃতির ডানায় ফিরে গেলেন এদেশে তার প্রথম সফরে, “তখন জানতাম না যে, পাকিস্তানে আমি যত জনপ্রিয়, এখানেও তত জনপ্রিয়… সেই ভালোবাসা এখনও আমার সঙ্গী।”
শোয়েব বললেন, সেই ভালোবাসা বুকে পুষে রেখেছেন বলেই এখানে আসার সুযোগ তিনি হাতছাড়া করতে চাননি।
“বাংলাদেশে পা রাখার যে কোনো সুযোগ পেলেই তা লুফে নেব সবসময়। এখানে যে ভালোবাসা আমি পাই… ক্যারিয়ারজুড়েই অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। এখানে আসার কোনো সুযোগই তাই হাতছাড়া করতে চাইব না।”
সাবেক ক্রিকেটারদের অনেকেই বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নানা ভূমিকায় কাজ করে থাকেন। ধারাভাষ্য বা বিশেষজ্ঞ মতামত দেওয়া ছাড়া শোয়েবকে কোচিং বা এই সংক্রান্ত কিছুতে সম্পৃক্ত হতে দেখা যায় না তেমন একটা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি অনুরাগ থেকেই এবার বিপিএলে কাজ করছেন, শোনালেন তিনি।
“বিপিএল আমি দেখেছি নানা সময়ে কিছুটা। শুনেছি যে বিপিএল খুব ভালো করছে। মাসখানেক পরে যদি দলের সঙ্গে যোগ দিতে পারি, দারুণ হবে। এত বছর ধরে যা শিখেছি, তা ভাগাভাগি করতে ভালো লাগবে, বিশেষ করে ফাস্ট বোলিংয়ের ক্ষেত্রে। ক্রিকেটারদের উজ্জীবিত করা, ম্যাচ জেতানোর কিছু কৌশল শেখানো।”
“আমার কাজ হবে, দলের ভেতর ম্যাচ জেতানোর বিশ্বাস গড়ে তোলা এবং ঢাকা ক্যাপিটালসের মাধ্যমে মূলত আমি চাই বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আবার সংযোগ গড়ে তুলতে, বিশ্বের সুন্দরতম জাতির সঙ্গে আবার সম্পর্ক স্থাপন করতে চাই।”
বাংলাদেশের পেস ইউনিট নিয়ে নানা সময়ই প্রশংসা করেছেন শোয়েব। এ দিনও তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানাদের স্তুতি শোনা গেল তার কণ্ঠে। পেসারদের প্রসঙ্গে বলতে গিয়েই তিনি বললেন, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে আলো ছড়াতে দেখতে চান তিনি।
“আমি সত্যিই আশা করব, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অনেক দূর যেন যেতে পারে। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে বড় শক্তি হয়ে উঠতে হবে। আশা করি, তাদেরকে দারুণ শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং অনেক দূর যাবে। কারণ, এই দলটি অনেক রোমাঞ্চকর এবং আমি চাই, বাংলাদেশ কোনোভাবে সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাক এবং বিশ্বকাপ জিতুক।”
“আমার মনে হয়, সামনের বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে জাদু দেখাতে হবে। টি-টোয়েন্টি সংস্করণে এটি সেরা দলগুলির একটি। তাদেরকে বিশ্বাস রাখতে হবে যে তারা অনেক দূর যেতে পারে ও ট্রফি জিততে পারে। কোনোভাবে বিশ্বাসটা পেতে হবে।”
শোয়েব যখন কথা বলছেন, সেখানে গতির প্রসঙ্গ আসবেই। শোয়েব আর গতি তো সমার্থক। সর্বকালের সবচেয়ে গতিময় বোলারদের একজন তিনি। সেরাদের সেরা ব্যাটসম্যানের মনেও তিনি ভয়ের সঞ্চার করেছেন কখনও না কখনও, গতি আর বাউন্সে নাড়িয়ে দিয়েছেন সবাইকে। খুব ভালো টেকনিকের বা গোছানো ব্যাটসম্যানও তার বলে আঘাত পেয়েছে অনেকবার। মাঠে তিনি নিজেকে উপস্থাপন করতেন বুনো ও খ্যাপাটে রূপে।
তবে শোয়েবের দাবি, ব্যাটসম্যানদের গায়ে বল লাগানো তিনি উপভোগ করতেন না।
“সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন, আমার প্রিয় সাচিন টেন্ডুলকার আঘাত পেয়েছিল আমার ডেলিভারিতে। মাথায় লেগেছিল, গুয়াহাটিতে তার পাঁজর ভেঙেছিলাম আমি। আমার খুব খারাপ লেগেছিল, কারণ আমার দেখা চমৎকার মানুষদের একজন সে।”
“ব্যাটসম্যানদের আঘাত করতে আমার কখনও মজা লাগেনি, সত্যি বলছি। মাঠে অনেক আগ্রাসী থাকতাম, আমার বলে অনেক ব্যাটসম্যান আঘাত পেয়েছে, কিন্তু তাদেরকে আঘাত করার চেয়ে উইকেট নেওয়া বেশি আনন্দের। ব্রায়ান লারা যখন আঘাত পেয়েছিল আমার বলে, খুব খারাপ লেগেছিল। পরদিন সকালে তাকে বুকে জড়িয়েছিলাম, কপালে চুমু দিয়েছিলাম, বলেছিলাম ‘সরি।’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের ৪৪৪টি উইকেটের মধ্যে প্রিয় তিনটি শিকারের কথাও জানালেন তিনি।
“প্রথমটি, সাচিনকে প্রথম বলে আউট করা… কলকাতায়। দ্বিতীয় প্রিয় লারাকে আঘাত করা, তৃতীয় গ্যারি কার্স্টেনের বুকে লাগানো….!”
একটু আগেই বলছিলেন, ব্যাটসম্যানদেরকে আঘাত করা পছন্দ করেন না। এরপরই বলছেন, প্রিয় তিন শিকারের মধ্যে দুটিই গায়ে আঘাত করা ডেলিভারি!
কৌতূহলী চোখগুলো দেখে দ্রুতই নিজেকে খোলাসা করে দিলেন শোয়েব, “না না, স্রেফ মজা করছিলাম…। প্রিয় তিন ডেলিভারি- সাচিনকে করা সেই বোল্ড, ২০০২ সালে কলম্বোতে ইয়র্কারে অ্যাডাম গিলক্রিস্টের উইকেট এবং ক্যারিয়ারে তৃতীয় বা চতুর্থ টেস্টেই গতিময় ডেলিভারিতে জ্যাক ক্যালিসকে আউট করা।”
তার চোখে সবসময়ের সেরা তিন ক্রিকেটারের নামও শোনালেন তিনি, “আমার মতে সর্বকালের সেরা হলেন তিন- শেন ওয়ার্ন, ওয়াসিম আকরাম ও সাচিন টেন্ডুলকার।”
বাংলাদেশের বর্তমান বোলিং কোচ শন টেইটের মেয়াদ শেষে শোয়েবকে প্রস্তাব দেওয়া হলে বোলিং কোচ হবেন কি না, এই প্রশ্নের জবাবও দিয়ে রাখলেন তিনি।
“ফাস্ট বোলিংয়ের জন্য শট টেইট সেরা কোচদের একজন। সত্যি বলছি, তার যাওয়ার পর আমাকে প্রয়োজন নেই আপনাদের। তার সঙ্গে কাজ করে গেলে… সে দারুণ ছেলে, সৎ মানুষ… লাভবান হবেনই। আমি ফিরতে চাই জনগণের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে।”