Published : 19 Jan 2026, 09:39 AM
ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও খ্যাতিমান কোচদের একজন মিকি আর্থার। প্রায় ২৫ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে চারটি দেশের জাতীয় দল, অস্ট্রেলিয়ায় ঘরোয়া ক্রিকেট, ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে কোচিং করানোসহ বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা তার। বিপিএলেও এখন তিনি পরিচিত মুখ, এবার নিয়ে টানা দ্বিতীয় বিপিএলে রংপুর রাইডার্সের কোচ তিনি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দক্ষিণ আফ্রিকান এই কোচ শোনালেন তার কোচিং দর্শন, নানা অভিজ্ঞতা আর বর্ণাঢ্য কোচিং ক্যারিয়ারের নানা বাঁকের গল্প।
রংপুর রাইডার্সে দ্বিতীয় মৌসুম চলছে আপনার। কেমন বন্ধন গড়ে উঠেছে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে?
মিকি আর্থার: দারুণ, রংপুর রাইডার্সকে আমি ভালোবাসি। দারুণ ফ্র্যাঞ্চাইজি। এখানকার মানুষগুলোকে ভালোবাসি, মালিকপক্ষ অসাধারণ। নিজেকে এখন রংপুর রাইডার্স পরিবারেরই একজন মনে হয় আমার এবং পুরোপুরি উপভোগ করি।
২০১৫ সালে ঢাকা ডায়নামাইটসের কোচ ছিলেন আপনি। রংপুরের হয়ে দুই মৌসুম হচ্ছে। সেই ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে এই ফ্র্যাঞ্চাইজি ও তখনকার বিপিএলের সঙ্গে এখনকার পার্থক্য কতটা দেখেন?
আর্থার: আগের তুলনায় স্থানীয় প্রতিভা এখন অনেক বেশি। প্রচুর প্রতিভাবান ক্রিকেটার আছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ক্রমে আরও বেড়েছে।
এখন যে ব্যাপারটি হলো, আমি খুব ভালো একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিতে আছে। খুবই খুবই ভালো ফ্র্যাঞ্চাইজি। এমন একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির অংশ আমি, যারা সত্যিকারের একটি ব্র্যান্ড। আগের সময়টায় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোতে বোঝাই যেত না, হচ্ছেটা কী। কিন্তু রংপুর রাইডার্স একটি ব্র্যান্ড এবং ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে যাকেই জিজ্ঞেস করবেন, সবাই এটির অংশ হতে চায়, বারবার ফিরে আসতে চায়।
বিপিএল নিয়ে সমালোচনার জায়গা আছে প্রচুর। আচরণবিধির কারণে আপনার জন্য সবকিছু নিয়ে বলাটা কঠিন। তার পরও মৌলিক কিছু জায়গার কথা বললে, কোথায় উন্নতি দেখতে চাইবেন?
আর্থার: আমার মনে হয়, সবচেয়ে জরুরি মালিকানার ধারাবাহিকতা। খুবই গুরুত্বপূর্ণ এটি। রংপুর রাইডার্স এখানে বহু বছর ধরেই ধারাবাহিক, কিন্তু অন্য সব দলের মালিকানা দেখি বদলাচ্ছেই। এসব বদল হলে ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে ওঠা সম্ভব নয়।
দেখুন, বাইরের ক্রিকেটার-স্টাফরা যারা আসবেন, তারা ব্র্যান্ড দেখতে চান, সতর্ক থাকেন। কারণ কর্ণধারদের তো তারা চেনেন না, জানেন না কী হতে যাচ্ছে। ব্র্যান্ড দেখলে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
মালিকানার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারলে এই টুর্নামেন্টও দারুণ হবে।
স্থানীয় প্রতিভার কথা বলছিলেন। আপনার দলে এমন একজন আছে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য তো বটেই, বিশ্ব ক্রিকেটের জন্যও রোমাঞ্চকর। ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করেন তিনি। নাহিদ রানার উন্নতি কতটা দেখছেন?
আর্থার: দারুণ রোমাঞ্চ জাগানিয়া বোলার সে। এবারও কয়েকটি ম্যাচে তার বোলিং দেখা ছিল আনন্দদায়ী। তার পরিচর্যা করতে হবে, তাকে গড়ে তুলতে হবে ঠিকভাবে। নিশ্চিত করতে হবে যে তার স্কিল ভালো থেকে আরও ভালো হয়। সে এমন একজন, যে গোটা বিশ্বে রাজত্ব করতে পারে।
নাহিদ ও পেসারদের উত্থানকে কি বাংলাদেশ ক্রিকেটেরও একটি সামগ্রিক উন্নতি বলা যায়?
আর্থার: শতভাগ! ২০১৫ সালে যখন এসেছিলাম, প্রতিভাবান পেসার এত বেশি দেখিনি। সবাই জানতাম, দারুণ কিছু স্পিনার এখানে থাকবেই। এখন দেখুন, তাসকিন, তানজিম, শরিফুল… হাসান মাহমুদ আছে, আমাদের সঙ্গে দুর্দান্ত বোলিং। আরেকটা ছেলেকেও সত্যিই ভালো মনে হয়েছে, রিপন মন্ডল।
অনেক ছেলেই উঠে আসছে এবং শন টেইটের (বাংলাদেশ দলের বোলিং কোচ) কাজটা বোঝা যাচ্ছে। বাংলাদেশের এখন এত ভালো মানের পেসার আছে, আগে কখনও তা ছিল না। রোমাঞ্চকর ব্যাপার।
চারটি জাতীয় দলের কোচ ছিলেন আপনি। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও কোচিং করাচ্ছেন। পার্থক্য কতটা?
আর্থার: অনেকটুকুই ভিন্ন। একটি দেশকে কোচিং করানো মানে বছরজুড়ে প্রোগ্রাম… ক্রিকেটারদের উন্নতির দায়িত্ব আমার। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে মূল কাজ থাকে দলের ভেতর একটা আবহ গড়ে তোলা, দলকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করা যাতে মাঠে নেমে ভালো করতে পারে।
আমি সবসময় চেষ্টা করি তরুণদেরকে বেশি কোচিং করাতে, তারা যেন আমার মাধ্যমে উপকৃত হয় এবং আরও ভালো ক্রিকেটার হয়ে ওঠে। অনেক বড় দায়িত্ব এটা এবং আমি খুবই উপভোগ করি। সত্যিকারে কোচরা এটাই করে। তরুণদেরকে ঘষেমেজে গড়ে তোলে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে এই কাজটা সবসময় সম্ভব হয় না।
আপনি কোচিং করানো শুরু করেছেন ৩২-৩৩ বছর বয়সেই। ৩৭ বছর বয়সেই জাতীয় দলের কোচ হয়েছেন। কেমন ছিল সেই সময়টা?
আর্থার: ইন্টারেস্টিং ছিল। খুবই তরুণ বয়সে কোচ হয়েছি। বলতে পারেন, কোচিং করাতে করাতে কাজটা শিখেছি আমি।
কঠিন ছিল, খুব কঠিন। কঠিন শিক্ষা থেকেই আমি শিখেছি।
কোচিংয়ের মূল ব্যাপারটা হলো, ক্রিকেটারদের সামলানো। ক্রিকেটারদের ভূমিকা নিয়ে আপনাকে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে এবং সেটা তাদের কাছেও পরিষ্কার করে ফুটিয়ে তুলতে হবে। তাদের উন্নতি করাতে হবে।

ক্রিকেটারদের পাশাপাশি সাপোর্ট স্টাফদেরও সামলাতে হয়। চারপাশে আরও অনেক কিছু চলে। এই দায়িত্বে আসলে সবকিছুই করতে হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার দায়িত্বে থাকার সময়টাতেই আস্তে আস্তে সব শিখেছি। কোচ হিসেবে নিজের সেরা অবস্থায় ছিলাম সত্যি বলতে, ২০১৬ সালে পাকিস্তানের দায়িত্ব নেওয়ার সময়টায়। বছরের পর বছর যা শিখেছি, সবকিছু নিয়েই ততটা ভালো কোচ হয়ে উঠেছি তখন, যতটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল। ওই সময়টাতেই এই স্বস্তিটা নিজের ভেতরে পেয়েছি যে কোচিং ব্যাপারটি ধরতে পেরেছি, জানতে পেরেছি এবং নিজের কোচিংয়ের ধরন নিয়ে বিশ্বাসটা পেয়েছি।
যখন জাতীয় দলের দায়িত্ব নিলেন, জ্যাক ক্যালিস, হার্শেল গিবস, শন পোলকরা ততদিনে গ্রেট হয়েই গেছে প্রায়। বড় তারকা ছিল আরও কজন। তরুণ একজন কোচ হিসেবে তাদেরকে সামলানোর ব্যাপারটি কেমন ছিল?
আর্থার: একটা ব্যাপার আমার কাজটা একটু সহজ করেছে, ওদের সবার সঙ্গে আমি খেলেছি (ঘরোয়া ক্রিকেটে)। আমার প্রতি কিছুটা সম্মান ওদের ছিল ওই সময়টা থেকেই। ওদের সঙ্গে বা বিপক্ষে খেলেছি বলে সবার খেলা সম্পর্কেই ধারণা ছিল আমার।
কোচিংয়ের ব্যাপারটি অবশ্যই আলাদা। যখন আপনি কোনো দলের প্রধান কোচ হবেন, একটা পর্যায়ে সম্মান বা সমীহ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পাবেন। তবে সেই সম্মান দ্রুতই মিলিয়ে যায়। আসল সম্মানটুকু আদায় করে নিতে হয়, কাজ দিয়ে। ভরসা আদায় করে নিতে হয়, ক্রিকেটারদের বিশ্বাস অর্জন করে নিতে হয়।
আমি সবসময় সব দলেই চেষ্টা করেছি একটা পর্যায়ে সততা ও আস্থা বজায় রাখতে। সেটা কাজে দিয়েছে।
আমি সবসময় মনে করি, একটা দলের পারফরম্যান্সে প্রতিফলন পড়ে গোটা জাতির আবেগ ও ক্রিকেটারদের আবেগের। উপমহাদেশে যেটা হয়, ভালো কিছু মানেই একেবারে আকাশ ছুঁয়ে ফেলা, খারাপ কিছু মানেই মাটির নিচে চলে যাওয়া। মাঝামাঝি ব্যাপারটি কম। কিন্তু ব্যবধানটা কম থাকতে হয়।
পাকিস্তান বা বাংলাদেশে বিশেষ করে, ওই স্রোতেই সবাই শামিল হয় এবং সেটি ক্রিকেটেও চলে আসে। আমি চেষ্টা করি ভালো ও খারাপের ব্যবধান কমাতে। কারণ, পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা বেরিয়ে আসে এখান থেকেই। কোচিং করাতে করাতেই শিখেছি এসব।
সেই সময়টায়, আপনি ছিলেন তরুণ কোচ, গ্রায়েম স্মিথ ছিল তরুণ অধিনায়ক। কেমন ছিল রসায়ন? কিভাবে কাজ করেছেন আপনারা?
আর্থার: সে অসাধারণ ছিল। দুজনই তরুণ ছিলাম এবং লড়াই করতে করতে আমরা একটা ফর্মুলা বের করতে পেরেছিলাম, যা আমাদের কাজে লেগেছে। যখন এটা কার্যকর হতে শুরু করল, খুবই তৃপ্তিদায়ক ছিল তা।
আমরা বলতে পারেন একরকম একসঙ্গেই বেড়ে উঠেছি। রোমাঞ্চকর ছিল সময়টা।
আমাদের ভাগ্যও ভালো ছিল যে, দারুণ একটি দল পেয়েছিলাম। প্রতিভাবান ক্রিকেটারের অভাব ছিল না।
আমাদের শুরুটা কঠিন ছিল, অস্ট্রেলিয়া সফরে। পরে আস্তে আস্তে আমরা বুঝতে শুরু করলাম, কোন ব্র্যান্ডের ক্রিকেট আমরা খেলতে চাই। সেটা বুঝে ফেলার পর আমরা ওই ব্র্যান্ড অনুযায়ী দল গড়ার চেষ্টা করলাম। এবি ডি ভিলিয়ার্স, হাশিম আমলা, ডেল স্টেইন, মর্নে মর্কেল, ওদেরকে ঘিরে ছক সাজানো শুরু হলো। ক্যালিস, বাউচার, এনটিনিরা তো ছিলই।
তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় করার চেষ্টা করেছি আমরা এবং সেটিই সাফল্য এনে দিয়েছে। হ্যাঁ, আমি আর গ্রায়েম (স্মিথ) বেড়ে উঠেছি একসঙ্গেই।
এবি ডি ভিলিয়ার্স তো তখন একদমই নবীন ছিলেন। তার মতো তুমুল প্রতিভাবান তরুণকে কোচিং করানোর ব্যাপারটি কেমন ছিল? অনেক সময় তরুণ প্রতিভাদের কোচিং করাতে গেলে সহজাত কিছু জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে। আপনারা তার সঙ্গে কিভাবে কাজ করেছেন?
আর্থার: এবি (ডি ভিলিয়ার্স) যখন প্রথম এসেছিল, মনে আছে, শুরুতে সে ওপেনার ছিল। তবে আমরা খুব দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলাম, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া সফরের (২০০৬) পর, মিডল অর্ডারেই সে বেশি উপযুক্ত।
এবি ছিল সহজাত প্রতিভায় টইটম্বুর। আমাদের প্রয়োজন ছিল তাকে একটু ঘষেমেজে তৈরি করা। অনেকটা নাহিদ রানার মতোই। নাহিদেরও প্রতিভা দারুণ, তাকে যত্ন নিয়ে গড়তে হবে যেন নিজের সম্ভাব্য সেরা জায়গাটায় সে যেতে পারে।
তাওহিদ হৃদয়ও তুমুল প্রতিভাবান। তবে তাকেও আরও তৈরি করতে হবে। সে যেন পরিস্থিতি বুঝতে পারে, ম্যাচের কোন অবস্থায় দল তার কাছে কী চায়, এসব যাতে সে বুঝতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ক্ষেত্রে যতটা না কোচ, তার চেয়ে বেশি হতে হয় ম্যানেজার।
এবি, হাশিম আমলা, এই ছেলেদের নিয়েও এই কাজটিই করতে হয়েছিল আমাদের।
বাংলাদেশে এই কাজটি কতটা করতে পারছেন?
আর্থার: এখানে প্রতিভার অভাব নেই। তবে কোনো ক্রিকেটারের মধ্যে ওই যে বাড়তি ১০ শতাংশ, সেটা বের করে আনাই ভালো কোচের কাজ। আমার বিশ্বাস, আমি কাজটা ভালোভাবে পারি। যখন কোনো ক্রিকেটার মনে করে সে নিজের সীমায় পৌঁছে গেছে, আমি তার মধ্য থেকেও ওই ১০ শতাংশ বের করে আনি।
বাংলাদেশের তো তাহলে আপনার মতো একজন কোচই প্রয়োজন! প্রস্তাব পেলে কাজ করবেন?
আর্থার: দেখুন, এসব ব্যাপারে কখনোই ‘না’ বলি না আমি। তবে এটা নিয়ে কথা বলতেও চাই না। কারণ, তোমাদের দলের একজন কোচ আছে এবং আমি তাকে সম্মান করি।
আমি এখানকার সংস্কৃতি বুঝে গেছি, ক্রিকেটারদের চিনেছি। তবে এটা নিয়ে কথা বলতে চাই না, কারণ এখন দায়িত্বে যিনি আছেন, তাকে আমি প্রবলভাবে শ্রদ্ধা করি। এছাড়া এমনিতেও একজন দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সেটি নিয়ে কথা বলাটা শোভন নয়।
তাওহিদ হৃদয়ের কথা বলছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার শুরুটা ভালো হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রত্যাশিত উন্নতি করতে পারেনি বলে মনে হয়েছে…
আর্থার: সে দারুণ এক প্রতিভা। খুব ভালো ব্যাটসম্যান হয়ে ওঠার সব উপকরণই তার আছে।
হ্যাঁ, সে হয়তো প্রত্যাশিত উন্নতি করতে পারেনি। তবে তার প্রতিভা ও সামর্থ্য আছে। যখন কারও সম্পর্কে বলা হয় সে দারুণ প্রতিভাবান, তাকে ঘষেমেজে তৈরি করার সুযোগ থাকে। তার ভেতর সেই সবকিছুই আছে, যা নিয়ে ঘষেমেজে আমি তৈরি করতে পারি।
কোচদের সাফল্য নিয়ে আপনার দর্শন কি? দল ট্রফি জেতা বা সফল হওয়া মানেই কি কোচ সফল? নাকি আপনার ভাবনা ভিন্ন?
আর্থার: খুবই ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন এটি। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে তো কর্ণধাররা শুধু ফলাফল আর ফলাফল চায়। এখানে কেবল ফল দিয়েই সাফল্য মাপা হয়। কিন্তু আমার ভালো লাগে, কেউ যখন আমাকে ক্রিকেটার গড়ে তোলা দিয়ে বিচার করেন। এজন্যই যখন এবি ডি ভিলিয়ার্স, হাশিম আমলাদের কথা ভাবি, আমি তৃপ্তি পাই। বলছি না যে আমিই ওদের গড়ে তুলেছি। তবে ওদের উন্নতিতে আমার কিছুটা হলেও ভূমিকা ছিল।
বাবর আজম, ফাহিম আশরাফ, শাহিন শাহ আফ্রিদি, শাদাব খানদের যখন দেখি, ওদের ভালো করতে দেখলে ভালো লাগে। দলের সাফল্য আমাকে খুব একটা ভাবায় না।
আমি ক্রিকেটারদের ভালো থেকে আরও ভালো করে তুলতে চাই। কারণ, ক্রিকেটাররা ভালো হলেই দল ভালো হয়ে ওঠে। দলের সাফল্য দিয়ে তাই কোচকে বিচার করি না আমি, কোচদেরকে মাপতে চাই ক্রিকেটারদের উন্নতি দিয়ে।
ক্রিকেটারদের সঙ্গে কাজ করা বা কোচ হিসেবে ক্রিকেটারদের সামলানোর ক্ষেত্রে আপনার মৌলিক দর্শন কি?
আর্থার: একটা দলে তরুণ ক্রিকেটার থাকে, অভিজ্ঞ ক্রিকেটার থাকে, তারকা ক্রিকেটার থাকে। আমার কাছে, সবাই সমান। সবাই একই কাতারের। দলের সবচেয়ে তরুণ ও নবীন ছেলেটিরও সবচেয়ে বড় তারকার মতোই সম্মান, সততা, যোগাযোগ এবং সবকিছু প্রাপ্য। কোচ হিসেবে এটা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করি।
এটা করতে পারলে সবাই দলে সম্পৃক্ত অনুভব করে, আবহের সঙ্গে মিশে যায়। যোগাযোগটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কার কাছে আপনার প্রত্যাশা কী, দলের চাওয়ার সঙ্গে আপনার খেলার ধরনের সমন্বয়, এসব বুঝিয়ে দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণ ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই এরকম হয়, দলে নিজের ভূমিকাটা তারা স্পষ্ট বুঝে উঠতে পারেন না। তারা একটা ধরন বা ঘরানা থেকে উঠে এসে ফ্র্যাঞ্চাইজি বা জাতীয় দলে খেলে। তখন সেখানে তাদের ভূমিকা পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি। কোচ হিসেবে আমি তাদেরকে সেটা বোঝাতে না পারা মানে আমার কাজটা যথেষ্ট ভালোভাবে পারছি না।
বাবর আজমের কথা বলছিলেন একটু আগে। এই তো, বছর দুই-তিন আগেও তাকে স্টিভেন স্মিথ, ভিরাট কোহলি, জো রুট, কেন উইলিয়ামসনদের সঙ্গে একই বন্ধনিতে রাখা হতো। এক নিঃশ্বাসেই নামগুলো বলা হতো। অনেকে এমনকি রুটকে বাদ দিয়ে বাবরকে নিয়ে ‘বিগ ফোর’ বলতেন। সেই বাবর এখন পথ হারিয়ে এই তালিকা থেকে অনেক দূরে। আপনি তার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। তার পথ হারানোর মূল কারণ কি মনে হয়?
আর্থার: জানি না, বলা কঠিন। অনেক দিন ধরেই তো আর তার সঙ্গে কাজ করছি না… আমি কেবল কিছু ব্যাপার অনুমান করতে পারি।
পাকিস্তানে তার ওপর প্রত্যাশার চাপ প্রবল ছিল। এটা একটা কারণ হতে পারে। এছাড়া আমার মনে হয়, ব্যাটিং বাদ দিয়ে চারপাশের আরও অনেক কিছু ভাবতে শুরু করেছিল বাবর। অনেক কিছু মাথায় নিয়ে ফেলেছে, এটার মূল্য হয়তো তাকে দিতে হচ্ছে।
বাবর আজমের যে মূল ছাপ, সেটা এখনও আছে। তবে তাকে মুক্তভাবে খেলতে হবে, খোলা মনে মাঠে নামতে হবে।
আরেকটা ব্যাপার হলো, তার তো বয়সও হয়েছে। ৩০-৩১ বছর বয়সে অনেক সময় অনেক ব্যাটসম্যানের সেরা সময়টা আসে। আবার এমনও হয়, যারা আগেই অনেক কিছু পেয়ে গেছে, এমন ক্রিকেটারদের ভেতর আগের মতো ক্ষুধা আর তাড়না থাকে না। বিশ্বের সেরা হওয়ার যে জ্বালানি, সেটা ফুরিয়ে যায়।
যখন নাম, খ্যাতি হয়ে যায়, অর্থ হয়ে যায়, দৃশ্যত সবকিছুই পাওয়া হয়ে যায়, তখন ‘মিডিওক্রিটি’ হানা দেয়। অনেকেই তখন সেটিকে আলিঙ্গন করে নেয়।
কেউ যদি সেই মিডিউক্রিটির ফাঁদে পড়ে যায়, সে আর আগের মতো থাকে না। ধার হারিয়ে যায়, মানসিকতা মিলিয়ে যায়। একবার হারিয়ে যাওয়ার পর অনেক সময় অনেকে লড়াই করেও আর ফেরত পায় না। জানি না, বাবরের ব্যাপারটি এরকমই কি না।
জ্যাক ক্যালিসের মতো একজনকে কোচিং করানোর ব্যাপারটি কেমন ছিল? আপনি কোচের দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি গ্রেট হয়েই গেছেন। তাকে আপনি কি বলতেন?
আর্থার: কিছুই না। একদম কিছুই বলতাম না। জ্যাকের মতো একজনকে কী বলতে পারি!

আমার মনে পড়ে, জ্যাক ক্যালিসের ক্ষেত্রে আমার ব্যাপারটি ছিল, তাকে যত বেশি সম্ভব কাছ থেকে দেখা, কীভাবে সে প্রস্তুতি নেয়, সে কোনটি কীভাবে করে এবং কী কী বলে। আমি স্রেফ চেষ্টা করতাম, তার জন্য সেরা প্রস্তুতির আবহ তৈরি করতে।
জ্যাককে দেখে আমি নিজেও অনেক কিছু শিখেছি এবং পরবর্তীতে যে তরুণ ক্রিকেটারদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাদেরকে জ্যাকের কথা বলেছি, উদাহরণ তুলে ধরেছি যে কীভাবে নিজের খেলাকে নতুন উচ্চতায় নিতে হয় ও দলের ভার বয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।
সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার কে, স্যার গ্যারি সোবার্স নাকি জ্যাক ক্যালিস?
আর্থার: এখানে আমার মতামতে আসলে পক্ষপাত থাকবেই। জ্যাক ক্যালিস আমার চোখে সেরা অলরাউন্ডার, সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার।
দক্ষিণ আফ্রিকার পর আপনি অস্ট্রেলিয়ার কোচ হয়েছিলেন। সেখানে আপনার সময়টা কেটেছে ভালো-মন্দ মিলিয়ে। ওই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ছিল ‘হোমওয়ার্কগেট’ কেলেঙ্কারি। হোমওয়ার্ক না করায় শেন ওয়াটসন, জেমস প্যাটিনসন, উসমান খাওয়াজা ও মিচেল জনসনকে বাদ দিয়েছিলেন আপনি। সেসময় তুমুল তোলপাড় পড়েছিল এটা নিয়ে। এখন পেছন ফিরে তাকালে কি মনে হয়, অনেক কিছু অন্যভাবে করতেন?
আর্থার: হ্যাঁ, অবশ্যই অনেক কিছু ভিন্নভাবে করতাম। এই ব্যাপারগুলো কোচ হিসেবে আমাকে পরিণত করেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি এবং অনেক কিছু উপলব্ধি করেছি।
আমি একটা ব্যাপার বিশ্বাস করি, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি বরখাস্ত বা ছাঁটাই না হচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি কোচই না। কারণ, ছাঁটাই হলেই কেবল নিজের ভুল বা ঘাটতিগুলো বোঝা যায়। আত্মজিজ্ঞাসার সুযোগ মেলে। নিজের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করতে গিয়েই আমি সবচেয়ে বেশি শিখেছি।
এজন্যই বলেছি, যখন ২০১৬ সালে পাকিস্তানে গেলাম, তখন নিজের সেরা অবস্থায় ছিলাম আমি। নিজের উত্থান-পতনগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েছিলাম।
আপনি দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলকে কোচিং করিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে কাজ করেছেন। পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার জাতীয় দলে কাজ করেছেন, বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে কাজ করছেন। সেসব দেশের সঙ্গে উপমহাদেশে কোচিংয়ের পার্থক্য কতটা?
আর্থার: বিশাল পার্থক্য। মূল পার্থক্য সংস্কৃতিতে।
উপমহাদেশে কোচিং করাতে আমি ভালোবাসি। খুবই ভালো লাগে। কারণটা বলছি, এখানে ক্রিকেটাররা শিখতে উদগ্রীব থাকে। এই অঞ্চলে কোচিং করিয়ে যে ধরনের সম্মান মেলে, পশ্চিমা বিশ্বে তা মেলে না। এখানে এমন সব ক্রিকেটার পাওয়া যায়, শেখার সুযোগটুকু পেতে যারা মরিয়া।
এজন্যই উপমহাদেশে আমি অনেক সাফল্য পেয়েছি। এখানে অনেক ক্রিকেটার পাওয়া যায়, যাদেরকে কোচিং করানো সহজ, যারা শিখতে প্রস্তুত। পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপারটি সবসময় এরকম নয়।
কোচিং আমার প্যাশন, এজন্যই এখানে কোচিং করাতে উপভোগ করি। এখানে শেখানোর মজাটা পাওয়া যায়। দারুণ শ্রদ্ধা পাওয়া যায়। কোচ হিসেবে এই শ্রদ্ধা অনেক বড় ব্যাপার। এখানে কোচদেরকে একজন শিক্ষক বা গুরুর মতো সম্মান করা হয়।
আমি সবসময় ছেলেদেরকে বলি, একইসঙ্গে আমি তোমাদের ভাই, তোমাদের বাবা, তোমাদের প্রধান শিক্ষক। আমি ঠিক করব, কোন দিন কোন ভূমিকায় তোমার কাঁধে হাত রাখব। প্রতিটি ক্রিকেটারই বিভিন্ন পর্যায়ে আমাকে এই তিন ভূমিকার কোনো না কোনো পর্যায়ে পায়।
পাকিস্তানে আপনি যখন দ্বিতীয় দফায় ফিরলেন, গোটা ক্রিকেট বিশ্বেই নাড়া পড়ে যায়। সম্ভবত আপনিই প্রথম ‘হাইব্রিড’ বা ‘অনলাইন’ কোচ। এই দায়িত্ব নেওয়ার পেছনে আপনার ভাবনা কি ছিল?
আর্থার: ইন্টারেস্টিং ছিল ব্যাপারটি। ‘অনলাইন’ কোচ তকমাটি শুনে আমি হেসেছিলাম। নাহ, আমি অনলাইন কোচ ছিলাম না।
প্রেক্ষাপট বলি আপনাকে। নাজাম শেঠি (পাকিস্তানের বোর্ডের সেই সময়ের সভাপতি) ফোন করেছিলেন আমাকে। তার সঙ্গে কাজ করে আগে সাফল্য পেয়েছিলাম। বিশ্বকাপ ছিল কাছাকাছি এবং নাজাম বললেন, তিনি এমন একজনকে কোচিং স্টাফে চান, যিনি পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের চেনেন ভালোভাবে, ক্রিকেটাররা যাকে সম্মান করে এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দাবি বোঝে।
পাকিস্তানে তখন একটি কোচিং স্টাফ ছিল। আমার কাজ ছিল তাদেরকে যথাযথ পরামর্শ দেওয়া। কোচিংয়ের ধরন, সেরা অনুশীলন নিশ্চিত করা, এসব পরামর্শ। পরে বিশ্বকাপে দলের সঙ্গে ছিলাম। এই তো!
এমন নয় যে আমি ফাখার জামানকে ফোন করে বলছি যে তার মাথা নড়ে যাচ্ছে, মাথা সোজা রাখতে হবে কিংবা শাহিন আফ্রিদিকে অনলাইনে বলছি যে প্রথম বলেই ফুল ইয়র্কার করা যাবে না। নাহ, এরকম কিছু করছিলাম না। শুধু অন্য কোচদের সহায়তা করছিলাম ও দলের সেরা প্রস্তুতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছিলাম।
তখন কাউন্টি দলে (ডার্বিশায়ার) ভালো চুক্তি ছিল আমার। কাজটি খুব উপভোগও করছিলাম। সেটি ছেড়ে পাকিস্তানে যাওয়ার উপায় ছিল না। নাজাম শেঠি আমাকে চাইছিলেন। কিন্তু আমার ভাবনায় ছিল, পাকিস্তানের যে ধরন, তাকে যে কোনো সময় সরিয়ে দেবে, তখন আমার চাকরিও থাকবে না। আমি তাই বলেছিলাম যে, কেবল পরামর্শক হিসেবেই থাকতে পারি এবং তারা সেভাবে হলেও চেয়েছিল আমাকে।
আপনার চোখে, গত ১৫ বছরের সেরা ব্যাটসম্যান কে? ধরুন, সাচিন টেন্ডুলকারের অবসরের পর থেকে?
আর্থার: অলরাউন্ড ব্যাটসম্যান ভাবলে… ভিরাট কোহলিকেই সেরা বলব আমি।
ব্যাটসম্যানদের ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য ও ধারাবাহিক ইম্প্যাক্ট রাখার কথা যদি বলেন, কোহলিই সেরা। স্টিভেন স্মিথও অসাধারণ। এই সময়ের কথা বললে, এখন বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান আমার চোখে জো রুট। সে দারুণ এক টেকনিশিয়ান।

স্মিথ-রুটরা কাছাকাছিই থাকবে, তবে সেরা কোহলিই।
সেই কোহলি টেস্ট ক্রিকেট ছেড়ে দিলেন ৩৬ বছর বয়সে। যদিও সিদ্ধান্তের পেছনে তার নিজের কারণ আছে, তার পরও কি মনে হয়, একটু আগেভাগেই বিদায় বলেছেন?
আর্থার: হ্যাঁ, সম্ভবত…।
তবে এরকম অনেক ক্রিকেটারের ক্ষেত্রেই হয়, বিশেষ করে চ্যাম্পিয়নদের ক্ষেত্রে, যখন তাড়না কমে যায়, তখন সেই ধার থাকে না। ধার না থাকলে সেই ক্রিকেটার আর আগের মতো থাকে না।
ভিরাট কোহলি এমন একজন, যে সবসময় দাপট দেখিয়েছে এবং সেই ধার তার ছিল। যখন অনুভব করেছে, তাড়নাটা হারিয়ে ফেলেছে, সে আর থাকতে চায়নি।
তার জীবনের প্রাধান্য ও মনোযোগের ক্ষেত্র বদলে গেছে। দুটো বাচ্চা হয়েছে, পরিবার বড় হয়েছে।
সে নিশ্চিতভাবেই নিজের ভেতরে তাড়না হারিয়েছে। ওই জ্বালানি ছাড়া সে আগের মতো থাকবে না। এটা বুঝতে পেরেছে। অর্ডিনারি একজন হয়ে থাকতে চায়নি সে। হয় অসাধারণ, নয়তো কিছুই না, এটিই তার দর্শন।
আপনার কোচিং ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচ কোনটি? ৪৩৫ রান তাড়া ম্যাচটি?
আর্থার: তিনটি ম্যাচের কথা বলব আমি… নাহ, চারটি। তিনটিই দক্ষিণ আফ্রিকা দলের হয়ে।
৪৩৫ রান তাড়ার ম্যাচটি অবশ্যই দারুণ স্মৃতি। বর্ণবাদের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার পর ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ জয়ী প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকা দল হতে পারাটাও ছিল দারুণ (২০০৮)। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় জয় (২০০৮-০৯)।
এরপর পাকিস্তানের হয়ে ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়। দিনগুলি সত্যিই স্পেশাল ছিল।