ঢাবির হলে শিক্ষার্থী ‘নির্যাতন’, ছাত্র অধিকারের মশাল মিছিল

“আমরা নির্যাতনে জড়িত প্রত্যেক ছাত্রলীগ নেতার নিজ নিজ এলাকায় পোস্টারিং করব,” বলেন ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতা তারিকুল ইসলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 Jan 2023, 03:34 PM
Updated : 24 Jan 2023, 03:34 PM

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে শিবিরকর্মী সন্দেহে এক শিক্ষার্থীকে ‘রাতভর’ ছাত্রলীগের ‘নির্যাতনের’ প্রতিবাদে মশাল মিছিল করেছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি ভিসি চত্বর ঘুরে পুনরায় সেখানে এসে শেষ হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত ওই ‘শিবিরকর্মী’কে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।  

এদিকে মশাল মিছিলের আগে সমাবেশে ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, “গত রোববার রাতে বিজয় একাত্তর হলে এক শিক্ষার্থীকে রাতভর কয়েক দফায় আবরার স্টাইলে মারধর করা হয়। সকালে আবারও মারধর করে তাকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।

“ছাত্রলীগের গেস্টরুম-প্রোগ্রামে না যাওয়ায় তার উপর অমানষিক নির্যাতন করা হয়। আমরা ছাত্রলীগের এই বর্বর কর্মকাণ্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। যারা এই ঘটনায় জড়িত, অবিলম্বে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়াদ মিয়া সাগর দাবি করেছেন, রোববার রাত ১১টার দিকে বিজয় একাত্তর হলের পদ্মা ব্লকের-৪০০৮ নম্বর কক্ষে নিয়ে মারধর করেন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। পরের দিন সকালে তাকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।

“হল ছাত্রলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাজেদুর রহমানের রুমে ডেকে নিয়ে আমার ফোন চেক করা হয়। পরে বলে আমি নাকি শিবির করি। ‘আমি শিবির করি’ এই কথা স্বীকার করাতে তারা আমাকে বেদম টর্চার ও গালাগালি  শুরু করে। বুয়েটের আবরার ফাহাদের মতো আমাকে রাতভর বেধড়ক মারধর করা হয়। একটুও ঘুমাতে দেয়নি। তারা আমাকে প্রায় ২০০-২৫০ বার চড়-থাপ্পড় দেয়।  আমার হাত-পায়ের গিরাগুলোতে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়।”

জোর করে শিবির করার স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে দাবি করে শাহরিয়াদ বলেন, “আমাকে বলা হয়, ‘তুই স্বীকার না করলে তোর মাকে ভিডিও কলে ফোন দিয়ে তোকে মারা হবে, এতে তোর মা স্ট্রোক করলেও আমাদের কিছু যায় আসে না’। তারা আমার মাকে কয়েকবার ফোন দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে আমাকে জোর করে ‘শিবির করি’ বলে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়।”

তার অভিযোগ হল ছাত্রলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাজেদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহনেওয়াজ বাবু, গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন উপ-সম্পাদক শাকিবুল ইসলাম সুজন, সাহিত্য সম্পাদক ইউসুফ তুহিন, প্রশিক্ষণ সম্পাদক বায়েজিদ বোস্তামী ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক পিয়ার হাসান সাকিবের বিরুদ্ধে। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সৈকতের অনুসারী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সৈকত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওই শিক্ষার্থী শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে স্বীকার করেছে। পরে তাকে হল প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। আমি জেনেছি, তাকে মারধর করা হয়নি। যদি মারধর করা হয়, তাহলে এটা দুঃখজনক।”

তিনি বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ। এখানে কেউ শিবিরের রাজনীতি করলে শিক্ষার্থীরা মেনে নেবে না। হয়ত তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ওই দিন।”

বিজয় একাত্তর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুল বাছির বলে, “ছাত্রশিবিরের সাথে ওর সম্পৃক্ততা আছে বলে জেনেছি। কিন্তু তার সম্পৃক্ততা আমরা শারীরিকভাবে দেখি নাই, মোবাইলের মাধ্যমে দেখেছি, যেটা ও নিজেও স্বীকার করেছে। সে এখন অনুতপ্ত।

“আমার মনে হয়, মারধরের বিষয়টা না হলে ভালো হত। ভুক্তভোগী যদি মারধরের বিচার চেয়ে লিখিত অভিযোগ দেয়, আমরা ব্যবস্থা নেব।”

ছাত্র অধিকার পরিষদের মশাল মিছিল পূর্ব সমাবেশে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শিক্ষার্থী নির্যাতন আমাদের আবু গারিব কারাগারের কথা মনে করিয়ে দেয়। ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ ভিন্নমতকে দমন ও নিপীড়ন চালিয়ে যায়। এমনকি ভিন্ন দলের কাউকে হলে থাকতে দেয় না। এরকম নির্যাতনের কারণে হলে থাকা শিক্ষার্থীদের ফলাফল খুবই খারাপ হয়।

“হলগুলোতে যারা দায়িত্বে থাকেন, তারা বেতন-ভাতা সুবিধা নেন। অথচ তারা শুধু বিভিন্ন দিবসে হলগুলোতে যায়। শিক্ষার্থীদের সমস্যায় তাদের দেখা যায় না। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বান জানাই।”

সমাবেশে ছাত্র অধিকার পরিষদের সহ-সভাপতি তারিকুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় আমরা বরাবরই সোচ্চার। এই ধরনের নির্যাতন বন্ধে আমরা নির্যাতনে জড়িত প্রত্যেক ছাত্রলীগ নেতার নিজ নিজ এলাকায় পোস্টারিং করব। তাদের নাম-পরিচয় তুলে ধরা হবে, যাতে এলাকার মানুষ ছাত্রলীগ নেতাদের নির্যাতনের বিষয়ে জানতে পারে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক