Published : 07 Nov 2025, 11:51 PM
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশ হত্যা মামলার জট তিন বছরেও খোলেনি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বাবা নূরউদ্দিন রানা অভিযোগ করেছেন, বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ফারদিন ‘হত্যার’ যোগ রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে ফারদিনকে হত্যা করেছে ছাত্রলীগ। আর এ কাজে ফারদিনের বন্ধু আমাতুল্লাহ বুশরাকে ‘ব্যবহার’ করা হয়েছে।
তবে এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বুশরার বাবা মঞ্জুরুল আলম সবুজ বলছেন, ছাত্রলীগের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বুশরার। তাকে আসামি করা হয়েছে ‘হয়রানি করতে’।
২০২২ সালের ৪ নভেম্বর নিখোঁজ হওয়ার পর ৭ নভেম্বর বিকালে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ফারদিনের মরদেহ উদ্ধার করেছিল নৌ-পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাকে সর্বশেষ রামপুরা এলাকায় বুশরার সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। সে কারণে রামপুরা থানাতেই একটি জিডি করেছিলেন ফারদিনের বাবা কাজী নূরউদ্দিন রানা।
ছেলের লাশ পাওয়ার দুদিন পর ১০ নভেম্বর ভোরে তিনি রামপুরা থানাতেই একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, সেখানে বুশরাকেই একমাত্র আসামি করা হয়।
এ মামলায় গত ২৮ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ঠিক করা ছিল। তবে ওই দিন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের এএসপি মশিউর রহমান প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি। এজন্য ঢাকার মহানগর হাকিম জামসেদ আলম আগামী ৩০ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ঠিক করেছেন।
মামলার বাদী ফারদিনের বাবা নূরউদ্দিন রানা লিখিত বক্তব্যে বলেন, “২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েট ক্যাম্পাসে আবরার ফাহাদের বীভৎস করুণ মৃত্যুর পর শিক্ষাঙ্গনের ফ্যাসিস্ট ছাত্রলীগকে রুখে দিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে উঠে এসেছিল ফারদিন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার স্বৈরশাসন, খুন, গুম ও জিঘাংসার সাম্রাজ্যে, মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফারদিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিল, ‘কীভাবে এদেশে বেঁচে থাকা যায় -১০১?’
“ভারত বিরোধিতার কারণে শিবির ট্যাগ দিয়ে যে ছেলেটাকে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা, তাদের সামনে ‘আমিই আবরার’ হয়ে ফারদিন ফ্যাসিস্ট হাসিনার পিতা তথাকথিত জাতির জনকের স্মরণ সভা পণ্ড করে দেওয়ার সাহস দেখিয়েছিল।”

বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরারকে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনায় ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে বুয়েট। ওই শিক্ষায়তনে নিষিদ্ধ হয় ছাত্র রাজনীতি।
মৃত্যুর সময় ২৪ বছর বয়সী ফারদিন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং ক্লাবের যুগ্ম-সম্পাদকও ছিলেন ফারদিন।
আর তার বন্ধু আমাতুল্লাহ বুশরা পড়েন ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে রামপুরার বনশ্রী এলাকায় মেসে থাকতেন তিনি।
বছর পাঁচেক আগে এক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ফারদিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয় বলে ফারদিনের বাবা জানিয়েছিলেন।
ফারদিনের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে দুই মাস কারাগারে আটক থাকার পর ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি জামিন পান বুশরা। দুদিন পর ১০ জানুয়ারি তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
সে বছর ৬ ফেব্রুয়ারি বুশরার অব্যাহতি চেয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা-ডিবির পরিদর্শক ইয়াসিন শিকদার।
সে সময় তিনি বলেন, “স্পেনে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় যাওয়ার বিমান ভাড়া সংগ্রহ করতে না পারা, ছোট দুই ভাইকে টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ জোগানোয় সংগ্রাম করতে হওয়াসহ নানা কারণে হতাশা থেকে তিনি (ফারদিন) আত্মহত্যা করেন। সাক্ষী হিসাবে মোট ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে খুনের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
রামপুরা থানায় মামলার পর থানা পুলিশই প্রথমে মামলার তদন্ত শুরু করেছিল, পরে সেই ভার দেওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশকে। অন্যদিকে র্যাবও নামে ছায়া তদন্তে।
সেই রাতে ফারদিনের মোবাইল ফোনের অবস্থান শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে চনপাড়ায় চিহ্নিত হওয়ার পর মাদক সংক্রান্ত নানা গুঞ্জনও ছড়িয়েছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত লাশ উদ্ধারের ৪০ দিন পর ডিবি ও র্যাব উভয়ই একই উপসংহারে আসার কথা জানায়। উভয় বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, নিখোঁজ হওয়ার রাতেই ফারদিন ডেমরার সুলতানা কামাল সেতু থেকে শীতলক্ষ্যা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ‘আত্মহত্যা’ করেছিলেন।
তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে ২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নারাজির আবেদন করেন ফারদিনের বাবা। আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করে সিআইডিকে মামলা অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত।
ফারদিনের বাবা নূরউদ্দিন রানা বলছেন, “রাজনীতি-নিষিদ্ধ বুয়েট ক্যাম্পাসে দলীয় ব্যানারে প্রোগ্রাম করতে এলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে খুনি খুনি বলে ক্যাম্পাস থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে ফারদিন ও তার সহপাঠীরা।
“ফ্যাসিস্ট হাসিনার সাম্রাজ্যে তার পিতার স্মরণ সভা পণ্ড করে দেওয়ার পরদিন ২০২২ এর ১৪ অগাস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন করে ছাত্রলীগ সভাপতি ফারদিন ও তার সহপাঠীদের মৌলবাদী ও পাকিস্তানি প্রেতাত্মা বলে লেলিয়ে দিয়েছিল হাসিনার খুনি দোসর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সদস্যদের।”

ফারদিনের বাবা রানার দাবি, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থানের কারণেই ফারদিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে ‘ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তরা’। হত্যার ‘মাস্টারমাইন্ড’ বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা।
“ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে মরিয়া বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র নেতা এবং ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইইবি) সভাপতি প্রকৌশলী এম এ সবুর এবং প্রকৌশলী মনজুরুল হক মঞ্জুর নেতৃত্বে ফারদিনকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আবরার ফাহাদ ও ফারদিন নূর পরশ উভয়েই হত্যাকাণ্ডের শিকার।”
ফারদিনের বন্ধু বুশরা বর্তমানে জামিনে রয়েছে। তাকে ‘ব্যবহার’ করে ছাত্রলীগ ফারদিনকে হত্যা করেছে বলে যে অভিযোগ তুলেছেন রানা, তা মানতে নারাজ বুশরার বাবা মঞ্জুরুল আলম সবুজ।
তিনি বলেন, “বুশরা কোনোভাবে ঘটনার সাথে জড়িত না। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আমার নির্দোষ মেয়েটাকে অযথা কষ্ট দিচ্ছে।
“মেয়েটাকে হয়রানি করছে। মেয়েটা মানসিকভাবে ঝামেলায় আছে। অপরাধ না করেও আদালতে যেতে হচ্ছে।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ইচ্ছে করলেই তো আর ছাত্রলীগ তাকে (বুশরাক) ব্যবহার করতে পারে না; ব্যবহার করতে হলে তো একটা মাধ্যম তো লাগবে। ছাত্রলীগের সাথে বুশরার কোনো সম্পর্ক নেই।
“ফারদিনের বাবা তার ছেলেটাকে হারিয়েছে, এতে তার বেদনা আছে। আমার নির্দোষ মেয়েটাকে হয়রানি করছে। এর রেজাল্টও সে পাবে।"
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের এএসপি মশিউর রহমানের সঙ্গে বৃহস্পতিরাতে রাতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
এক নারী ফোন ধরে বলেন, “মশিউর রহমান একটু ঝামেলায় আছেন। এখন কোনো সাহায্য চাইলেও উনি উপকার করতে পারবেন না।”
সাংবাদিক পরিচয় দিলে রাত ১১টার দিকে আবার ফোন করতে বলেন। ১১টার দিকে কয়েকবার ফোন দেওয়া হয়। তবে কেউ ফোন রিসিভ করেননি।