Published : 08 Sep 2025, 01:48 PM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে জনারণ্য; ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। একের পর এক সংবাদ সম্মেলন, প্রার্থীদের প্রচারণায় সরব চত্বরটিতে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেল ডাকসু সংগ্রহশালাতে।
বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা দুর্লভ চিত্র ও নিদর্শনে সাজানো সংগ্রহশালাটিতে নেই দর্শনার্থীদের ভিড়। রোববার দুপুর থেকে অন্তত দু’বার সংগ্রহশালাটিতে প্রবেশ করে একই রকম চিত্র দেখা গেছে।
গত এক সপ্তাহে সংগ্রহশালাটিতে প্রবেশ করা হয়েছে পাঁচবার; তাতে একবার কেবল তিনজন দর্শনার্থীকে পাওয়া গেছে, যারা সংগ্রহশালাটিতে পরিদর্শন করেছেন।
তাদের একজন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাফসান আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর খুব আগ্রহ নিয়েই সংগ্রহশালায় গিয়েছিলাম। এখানে অনেক দুর্লভ আলোকচিত্র আছে।
“এজন্য আমি বন্ধুদের নিয়ে মাঝে মাঝে আসি। এখানে আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে গর্ব হয়।”
কিছুটা হতাশাও ঝরে রাফসানের কণ্ঠে। তিনি বলেন, “এখানে বেশিরভাগ নিদর্শনই এমনভাবে রাখা যে- এখানে দেখে ইতিহাসটা ঠিক বোঝা যায় না। সংগ্রহশালাতেও এমন কেউ থাকেন না– যিনি ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা রাখেন।”

বৃহস্পতিবার দুপুরে সংগ্রহশালাটিতে সোহেল নামের একজন কর্মী অলস সময় কাটাচ্ছিলেন। সংগ্রহশালায় লোকজন কেমন আসে, জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসে, তবে একটু কমই আসে।”
সংগ্রহশালায় কত নিদর্শন আছে, তা বলতে পারেননি তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডাকসু সংগ্রহশালায় এখন কোনো কিউরেটর নেই। এর আগে গোপাল চন্দ্র দাস নামে একজন ছিলেন, তাকে সবাই ডাকসুর গোপাল দা নামেই চেনেন। তিনি কয়েক বছর আগে অবসরে যাওয়ার পর কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
গোপালচন্দ্র দাসকে ফোন করা হলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি যখন ছিলাম– চেষ্টা করেছি সংগ্রহশালাটাকে একটু সাজিয়ে রাখতে। এখানকার প্রায় সব নিদর্শনই আমার গোছানো। এখন তো জনবলও নাই।
“এই সংগ্রহশালা তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অংশ। এটাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সংগ্রহশালাটি আরও সমৃদ্ধ করা উচিত।”
কেন অনাগ্রহ?
ইতিহাসের প্রতি অনাগ্রহের কারণেই ডাকসু সংগ্রহশালায় লোকজনের ভিড় কম বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক ড. শাহমান মৈশান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের ইতিহাস বিমুখতার একটা ব্যাপার তো আছেই। নয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, তাদের মধ্যে যদি অর্ধেকেরও নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস জানবার আগ্রহ জাগতো– তাহলে তো তারা ডাকসু সংগ্রহশালায় ভিড় করতো।
“এখন তো ডাকসু নির্বাচন নিয়ে সরগরম ক্যাম্পাস। ফলে অনেকের তো কৌতূহল জাগার কথা সংগ্রহশালাটি নিয়ে। কিন্তু তা ঘটছে না।”

কেন ঘটছে না? জবাবে শাহমান মৈশান বলেন, “ইতিহাস অনুসন্ধান বা জানার আগ্রহ আমাদের অনেক কমে গেছে। আমি নিজেও যখন ছাত্র ছিলাম, তখন এই সংগ্রহশালাকে এতটা নিষ্ক্রিয় দেখিনি।
“বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের অনেক লোকজনও আসতো। এখন সেটা কমে গেছে।”
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শাহমান মৈশান বলেন, “বার্মিংহামে পড়তে গিয়ে দেখেছি, সেখানে জাদুঘর ভিজিট করার জন্য শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। জাদুঘর যে শিক্ষার একটি মাধ্যম, তা আমাদের এখানে খুব একটা চর্চা হয় না বললেই চলে।
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রে এই ডাকসু ভবনটা আছে। এটাকে কেন্দ্র করে সবার যে বিচরণ, তা কিন্তু নেই। আগে কিছু পাঠচক্র হতো। এখন সেটাও খুব বেশি হয় না। এটা খুবই নিষ্ক্রিয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
“এই জাদুঘরকে দেখার মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব, সংগ্রামকে উপলব্ধি করার ব্যাপার ঘটে। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা একটা পরম্পরার বোধ পেতে পারে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় উদ্যোগেরও প্রয়োজন আছে।”

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ডাকসু নির্বাচিত হলে তারাও সংগ্রহশালাটিকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন শাহমান মৈশান।
তিনি বলেন, “সংগ্রহশালাটিকে ডিজিটাল করার প্রয়োজন আছে। এখানে একজন কিউরেটর লাগবে। দর্শনার্থীরা যেন এখানে এসে খুব সহজেই ইতিহাসে ভ্রমণ করতে পারেন, তার জন্য নিদর্শনগুলোকে সাজাতে হবে।
“এখন যেভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে, তা অনেক পুরনো পদ্ধতি। এটাকে আধুনিক করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষেই প্রত্যেক বিভাগের উদ্যোগে এই সংগ্রহশালাতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়া উচিত।”
কী আছে সংগ্রহশালায়?
ডাকসু ভবনের সামনের দেয়ালে যে ম্যুরাল চিত্রটি দেখা যায়, তা ‘চেতনায় একুশ’ নামে পরিচিত। এতে চারজন ভাষা শহীদের প্রতিকৃতি খোদাই করা আছে। সংগ্রহশালার ভেতরে প্রবেশ করে ডান দিকে তাকালে দেখা যাবে ঐতিহাসিক আম গাছটি; যে আমতলায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রতিবাদী ছাত্রসভা হয়েছিল।

এছাড়া আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংরক্ষিত ছবি, যারা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর রাজাকারদের সহায়তায় পাক হানাদারদের হাতে শহীদ হন।
দেয়ালে একটি ফ্রেমের মধ্যে রাখা আছে শহীদ রাজুর শার্ট। নিচে লেখা- ‘রাজু নেই জিজ্ঞাসা আছে?’। ছাত্রনেতা রাজু শহীদ হয়েছিলেন ১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকার সড়কের ওপর সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যটি তার নামেই করা।
একটি ছবিতে দেখা যায়, জগন্নাথ হলের মাঠে ১৯৭২ সালে মানুষের কঙ্কাল উদ্ধারের দৃশ্য। এই মানুষগুলো ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শেষ রাতে ও ২৬ মার্চ সকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে জীবন দিয়েছেন।

আরেকটি আলোকচিত্রে ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের অগ্রপথিক টোকাই বীর যোদ্ধার ছবি। আছে ৬৯-এ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ছাত্র-জনতার হাতে নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউরের ছবি।
একটি কাঠের ফলকে লেখা আছে– ডাকসুর বিভিন্ন সময়ের ভিপি-জিএস যারা ছিলেন, তাদের নাম। এলোমেলোভাবে কয়েকজন ভিপি-জিএস এর ছবিও টাঙানো আছে।
জুলাই স্মৃতিস্মারক
ডাকসু ভবনের দ্বিতীয় তলায় আরেকটি সংগ্রহশালা করা হয়েছে; যার নাম 'জুলাই স্মৃতি সংগ্রহশালা' নামে। গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের কয়েকটি স্মারক এখানে রাখা আছে।
সিঁড়ি দিয়ে দু’তলায় উঠতে উঠতে চোখে পড়বে কয়েকটি আলোকচিত্র; যা জুলাইয়ের আলোচিত ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেবে।

সংগ্রহশালাটির ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেল, গত বছরে ১৬ জুলাই রংপুরে নিহত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদের পরিহিত একটি ছেঁড়া প্যান্ট।
এছাড়া আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার বিভাগের ছাত্র ফারহান সাদিক রাফিদের ব্যবহৃত টি-শার্ট। তিনি গত বছরের ১৫ জুলাই ভিসি চত্বরে আহত হয়েছিলেন।
ধানমন্ডির রাপা প্লাজার সামনে ১৮ জুলাই নিহত হন ফারহানুল ইসলাম ভূইয়া; তার ব্যবহৃত ব্যাগও সংগ্রহশালাটিতে আছে৷ রয়েছে খাতা, কলম, ঘড়ি, নামাজের টুপি এবং নিহত হওয়ার মুহূর্তে হাতে ধরা জাতীয় পতাকা।

নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের ছাত্র তাহমিদ ভূঁইয়ার ব্যবহৃত শার্ট, পাঠ্যবই ও কলমও সংরক্ষিত আছে।
আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ছাত্র নাফিস শাফিকুল ইসলামের ভাঙা চশমা, হামজা ইবনে মাহবুবের ব্যবহৃত শার্ট। চট্টগ্রামের মুরাদপুরে নিহত শহীদ ওয়াসিম আকরামের টি-শার্ট ও আহত হওয়ার ছবিও আছে সংগ্রহশালাটিতে।
এছাড়া জুলাইয়ের শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ব্যবহৃত ব্যাগ, জসিম উদ্দিনের টি-শার্ট, অফিস আইডি কার্ড ও চিকিৎসারত অবস্থার ছবিও সংরক্ষিত আছে।

আন্দোলনের সময়ের বিভিন্ন আলোকচিত্র মনে করিয়ে দেবে এক বছর আগের সেই উত্তাল দিনগুলো কথা।
ডাকসু সংগ্রহশালা সপ্তাহের পাঁচদিন সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত। শুক্র-শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি ছুটির দিনও বন্ধ রাখা হয়।