Published : 16 Mar 2026, 11:12 PM
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্বের মেয়াদ শেষ হতেই আলোচনা শুরু হয়েছে নতুন কমিটি গঠন নিয়ে।
এই আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে দুটি বিষয়। একটি হলো, সংগঠনটি এবারও ছাত্রত্ব না থাকা কারো হাতে নেতৃত্বে তুলে দেবে কিনা।
আরেকটি বিষয় হলো, ইসলামী ছাত্রশিবির কিংবা ছাত্রলীগ থেকে সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ নিয়ে ছাত্রদলের ভাবনাটা কী?
ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটিতে সভাপতি পদে আছেন রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন নাছির উদ্দীন নাছির। এই কমিটির মেয়াদ ১ মার্চ শেষ হয়েছে।
২৫৭ সদস্যের এই কমিটির বেশির ভাগ নেতা স্নাতকে ভর্তি হন গড়ে প্রায় এক যুগ আগে। সেই হিসাবে তাদের নিয়মিত স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার কথা আরও পাঁচ-ছয় বছর আগেই।
ছাত্রদলের কমিটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষে। সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে।
জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবু আফসান ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষে, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল ২০০৭-০৮, সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান ২০০৯-১০, জাহাঙ্গীর আলম ২০০৭-০৮ এবং শরিফ প্রধান ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

এবার নতুন কমিটিতে কারা নেতৃত্বে আসতে পারেন, সেই প্রশ্নে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, “২০১৯ সালের সর্বশেষ কাউন্সিলে আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। এখন কেন্দ্রীয় কমিটি তিনি যেভাবে চাইবেন, সেভাবে হবে।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আপনারা জানেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান নির্বাচনের পর খুবই ব্যস্ত সময় পার করছেন।
“এর মধ্যে আমাদের আনঅফিসিয়ালি যোগাযোগ আছে। তবে ফরমালি আমরা এখনো বসতে পারিনি। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক যখন চাইবেন, তখনই (নতুন কমিটি) হবে। আমরা মেয়াদ শেষ হলেও নতুন কমিটি দেওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যাব।”
মেয়াদ পার হয়ে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কমিটিরও। ২০২৪ সালের ১ মার্চ গণেশ চন্দ্র রায় সাহসকে সভাপতি এবং নাহিদুজ্জামান শিপনকে সাধারণ সম্পাদক করে এই কমিটি হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের বর্তমান কমিটিতে ২০১০-১১ থেকে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের নেতারা আছেন। এর মধ্যে সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন। আর সাধারণ সম্পাদক নাহিদ্দুজামান শিপন ভর্তি হন ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে।
অন্যদের মধ্যে সহ-সভাপতি আমান উল্লাহ আমান ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ, সাংগঠনিক সম্পাদক নুর আলম ভূঁইয়া ইমন ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ, সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন।
সেদিক বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কমিটির অধিকাংশ সদস্যেরও ছাত্রত্ব নেই।
ছাত্রদলের নেতৃত্ব সমালোচনার মুখে পড়ে গেল সেপ্টেম্বরের ডাকুস নির্বাচনে ভরাডুবির পরে। সেই ভরাডুবির কথা মাথায় রেখে এবারের কমিটি ‘বিশেষ পর্যবেক্ষণের’ মাধ্যমে করা হবে বলে জানিয়েছেন একাধিক ছাত্রদল নেতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "৫ অগাস্টের পর এক ভিন্ন পরিবেশ। আমি মনে করি এখানে শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। তবে সংগঠনের প্রতি ত্যাগ, অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও ছাত্রত্ব— সবকিছু আমলে নিয়েই কমিটি করা হবে।"

এ বিষয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ জুলাই অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। সেসময় আমাদের সবাইকে রাজপথে থাকতে হয়েছে। অনেক নেতাকর্মীর লেখাপড়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন তো একটা পরিবর্তিত পরিস্থিতি। এখন তো রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম নেই।
“এখন যারা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে পারবে, যারা সংগঠনের জন্য কাজ করতে পারবে, এর আগে যারা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেছেন, সব দিক বিবেচনা করে কমিটি হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা ৫ অগাস্ট পরবর্তী যেসব কমিটি দিয়েছি,সেখানে সব জায়গায় ছাত্ররা নেতৃত্বে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কমিটিও সেভাবে হবে। আমাদের কাছে জুনিয়র-সিনিয়র বলতে কিছু নাই।
“আমাদের অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি কাদেরকে দিলে শিক্ষার্থীরা কমফোর্ট ফিল করবেন, কারা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে পারবেন, সে বিষয়টি বিবেচনা করবেন”।
অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে ভাবনা
জুলাই আন্দোলন পরবর্তী ছাত্ররাজনীতিতে ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘গুপ্তরাজনীতি’ ও ‘গুপ্ত সংগঠনের’ মতো শব্দগুলো আলোচনায় আসে।
৫ অগাস্টের পর ছাত্রশিবির কিংবা এনসিপির এমন একাধিক নেতার নাম সামনে আসে, যারা একসমময় ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন।
এই তালিকায় ছাত্রশিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদের নামও রয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা সারজিস আলমকে নিয়েও একই আলোচনা আছে।
ছাত্রলীগের মতো ছাত্রদলেও অনুপ্রবেশের শঙ্কা আছে কিনা, সেই প্রশ্নে সংগঠনটির নেতারা বলছেন, এ বিষয়ে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার তারা বেশি সতর্ক থাকবেন।
শুধু ছাত্রশিবির নয়, ছাত্রদলের অনুপ্রবেশের শঙ্কা আছে ছাত্রলীগ থেকেও।
গেল বছরের ৮ অগাস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে ৫৯৩ জনের আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়। এরমধ্যে প্রায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। সে কমিটির সুপারিশে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।
ছাত্রশিবির বা ছাত্রলীগ থেকে অনুপ্রবেশের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, "অতীত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে ছাত্রদল অনুপ্রবেশের রাজনীতির ব্যাপারে সামনে যথেষ্ট সচেতন থাকবে। এটি নিয়ে কোনো শঙ্কা দেখি না।”

ছাত্রশিবিরের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “৫ অগাস্টের আগে আমরা জানি, একটা বিশেষ সংগঠন ছাত্রলীগের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে রাজনীতি করেছে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেটি হতে দেওয়া হবে না।
“কমিটি দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বশীলরা সর্বোচ্চ যাচাই-বাছাই করেই সংগঠনের দায়িত্ব দিবেন। অনুপ্রবেশ করে টিকে থাকার সুযোগ নেই।”
নাছির বলেন, “ ছাত্রদলে অনুপ্রবেশকারী নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। আর ছাত্রদল এমন একটা সংগঠন, এখানে অনুপ্রবেশ করে জায়গা পাবে না। আমরা তো সবাইকে চিনি। ৫ অগাস্টের আগে এখানে হামলা-মামলার শিকার হওয়ারাই ছাত্রদল করে।
“আর যেসব অভিযোগ এসেছে, তারা হয়ত কোনো ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে ছবি তুলেছে এটাই। এরা কোনো হামলায় জড়িত ছিল না। তাও যারা অভিযুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
ছাত্রশিবিরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “তারা তো গুপ্ত রাজনীতি করে, তাই তাদেরকে চেনা যায় না। কিন্তু ছাত্রদলের কাঠামোটাই এমন, এখানে কোন শিবির-লীগ ঢুকলেও টিকে থাকতে পারবে না।”
দৌঁড়ঝাপ শুরু
ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন নতুন কমিটির পদপ্রত্যাশীরা। কেউ ব্যস্ত নানা অনুষ্ঠান আয়োজনে, কেউ ব্যস্ত সংসদ সদস্যদের পেছনে। কেউ কেউ অনুসারীদের নিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিলও করছেন।
নতুন কমিটির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক এপিএস বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার যে কমিটি হবে, তা শুধু সাংগঠনিক অবস্থা বিবেচনা করে হবে না। আগামীতে ডাকসু নির্বাচনের বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে। শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার মত নেতারাই প্রাধান্য পাবেন নতুন কমিটিতে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতৃত্ব বাছাইয়ের কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে নাসির বলেন, “আমাদের এখনো পরীক্ষণ চলছে। আমরা শিক্ষার্থীদের কনসার্নের বিষয়টি বিবেচনা করে দেখছি, কারা নেতৃত্বে এলে সংগঠনের ভালো হবে। তবে আমাদের এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”