“যে টাকা বাকি থাকে তা ব্যাংক ও মোবাইলের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিশোধ করেন খরিদ্দাররা। তাই খুব বেশি বকেয়া থাকে না। তারপরও খরিদ্দারদের সম্মান জানাতে আয়োজন করা হয় হালখাতা।”
Published : 14 Apr 2023, 01:47 PM
পুরনো বছরের দেনা-পাওনা মিটিয়ে বাংলা নতুন বছরে হিসাবের নতুন খাতা খোলার দিন এল নতুন বৈশাখে; যদিও এখন ক্রেতা-বিক্রেতার লেনদেন প্রক্রিয়ার ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, ঐতিহ্যের হালখাতায় এসেছে বৈচিত্র্য।
আগে হালখাতার কয়েকদিন আগে থেকেই ক্রেতাদের ছাপানো বর্ণিল কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ জানাতেন ব্যবসায়ীরা, ফুল আর রঙিন কাগজে পরিপাটি সাজে দোকান পেত অন্য চেহারা। দোকানে দোকানে ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হত; সাথে থাকত ধর্মীয় নানা আচার।
নতুন বছরের প্রথম দিনের সেই আড়ম্বর দিনে দিনে কমে এলেও ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসাবনিকাশ ঠিকই হালনাগাদ করে ফেলেন। এরপর সময় আর সুযোগ বুঝে হালখাতা অনুষ্ঠানের দিন ঠিক করেন। ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে আপ্যায়ন করেন মুড়কি, বাতাসা, মণ্ডা, মিঠাই, নাড়কেলের নাড়ু ও মিষ্টান্ন কিংবা ভাত-মাংস দিয়ে।
একদিনে হালখাতা আয়োজনের রেওয়াজের পরিবর্তন এসেছে দেশে পাইকারি কাপড়ের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে পরিচিত নরসিংদীর শেখের চড়ের বাবুরহাটে। বৈশাখের প্রথম দিন ছাড়াও ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ আগেই হালখাতা শুরু করে দেন। কেউ আবার বৈশাখের কোনো একদিনে সেই আয়োজন সেরে ফেলেন।
এখানকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন বছরের শুরুতে এখন খদ্দের যেদিনই আসেন, সেদিনই তার হালখাতা। এক সময় বাবুরহাটের ক্রেতা ছিল এর আশেপাশের এলাকার ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এখন দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা বাবুরহাট থেকে পণ্য নেওয়ার কারণে একদিনের হালখাতায় তাদের সবাইকে আনা যায় না।
ক্রেতাদেরও হালখাতার দিনে বাজারে যাওয়ার সময় হয়ে ওঠে না। ফলে নতুন বছরে তারা যেদিনই বাবুরহাটে যান, সেদিনই তাকে হালখাতার আপ্যায়ন করেন বাবুরহাটের ব্যবসায়ীরা।
ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে নরসিংদী সদরের শিলমান্দি ইউনিয়নের শেখেরচরে এই হাটের অবস্থান, পুরো নাম শেখেরচর বাবুরহাট।
গত শতকের ত্রিশের দশক থেকেই বস্ত্র শিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ এই এলাকায় রয়েছে বিএল প্রিন্ট শাড়ি, জনি প্রিন্ট শাড়ি, পাকিজা প্রিন্ট শাড়ি, এটিএম লুঙ্গি, আমানত শাহ লুঙ্গি ও স্মার্ট লুঙ্গি ছাড়াও অসংখ্য কাপড়ের কারখানা।
নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর কাপড়ের কারখানাগুলোর পণ্যের বেশিরভাগই বিক্রি হয়ে আসছে বাবুরহাটের মাধ্যমে। শাড়ি, থ্রি-পিস, লুঙ্গি, থানকাপড়, পপলিন কাপড়, ভয়েল কাপড়, জর্জেট, জাপানি সিল্ক, টাঙ্গাইলের শাড়ি, জামদানি, কাতানসহ মসলিন কাপড়ও বিক্রি হয় সেখানে।
ব্যবসায়ীদের হালখাতা আয়োজনের বৈচিত্র্যের কথা তুলে ধরে এই হাটের আফতাব এন্টারপ্রাইজের বিক্রয়কর্মী মাসুদুর রহমান নোমান বলেন, “এখন আর একদিনে পারা যায় না। শুকনা খাবার আনতে হয় প্রতিদিনই। যেদিন যে গ্রাহক আসেন সেদিনই তার জন্য হালখাতা।
“আগে হাটে একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা স্থানীয় লোকজনই আসত। এখন বাবুরহাটে সারা দেশ থেকে পাইকাররা আসেন। তাদের আসার দিন ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।”
হালখাতা
প্রতিবছর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন স্বর্ণ, মনোহারি ও কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসাবনিকাশ হালনাগাদ করে নতুন করে হিসাবের খাতা খোলেন, যাকে বলা হয় হালখাতা।
হালখাতা মানেই পুরনো দায় পরিশোধ করে নতুন খাতায় খরিদ্দারদের নাম তোলা। দোকানে নতুন কাপড় পড়ে খাতা নিয়ে বসে থাকেন দোকানিরা। নগদ টাকা বুঝে নিয়ে তারা হিসাব হালনাগাদ করেন।
হালখাতা উপলক্ষে আগে খরিদ্দারদের রঙিন কার্ডে দাওয়াত দিতেন ব্যবসায়ীরা, যেখানে হালখাতার দিন-তারিখ উল্লেখ করে তাদের নিমন্ত্রণ জানানো হত দোকানে। দাওয়াতপত্রের একপাশে লেখা থাকত বকেয়ার পরিমাণ।
বৈশাখের আগে থেকেই ব্যবসায়ীরা যেমন হালখাতার প্রস্তুতি নিতেন, তেমনি খরিদ্দাররাও বকেয়া পরিশোধ করে বিক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক ঝালাইয়ের মানসিক প্রস্তুতি রাখতেন।
এরপর নির্দিষ্ট দিনে দোকান সাজিয়ে লাল কাপড়ে বাঁধানো মোটা হিসাবের খাতা নিয়ে বসতেন ব্যবসায়ীরা। খদ্দের এলে পুরনো হিসাব চুকিয়ে তাদের আপ্যায়ন করতেন।
এছাড়া নতুন বছরের প্রথম দিনে গ্রাহক ও শুভানুধ্যায়ীদের নানা পদের মিষ্টি, ফল ও উপহারের সাজানো ডালা পাঠানোর চলও রয়েছে। পাওনা পরিশোধে উৎসাহিত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) হালখাতা আয়োজন করছে।
শুধু হালখাতার জন্য একদিনে সবাইকে দাওয়াত দিয়ে আনা কষ্টসাধ্য বলে মনে করেন বাবুরহাটের মডার্ন ফ্যাশনের ব্যবস্থাপক তাপস রায়।
বিডিনিউজ টোয়েনন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বৈশাখের আগে ফাল্গুন থেকেই শুরু হয় হালখাতা, দুই মাস ধরে চলে। সারা দেশের যে পাইকার বা খরিদ্দার যেদিন আসবেন, তার জন্য সেদিনই হালখাতা। হোটেলে বলা থাকে, ইচ্ছে মতো খেতে পারেন সেখানে।
“আর স্থানীয় খরিদ্দার যখন আসে তখনই আপ্যায়ন করি আমরা। কিন্তু আগের মত একদিনে একসঙ্গে সব খাবার এনে আয়োজন করা হয় না। আমরা তো জানতে পারি না কে কবে আসবেন, কয়জন আসবে। খাবার নষ্ট হবে, তাই হোটেল ঠিক করি।”
হালখাতার পুরনো রেওয়াজের পরিবর্তনের পেছনে লেনদেন প্রক্রিয়াও একটি কারণ বলে জানালেন তাপস রায়।
“এখন তো হাতে টাকার লেনদেন যেমন হয়, ব্যাংকের মাধ্যমেও হয়। যে টাকা বাকি থাকে তা ব্যাংক ও মোবাইলের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিশোধ করেন তারা। তাই খুব বেশি বকেয়া থাকে না। তারপরও খরিদ্দারদের সম্মান জানাতে আয়োজন করা হয় হালখাতা।”
হালখাতার দিনে দোকানে বকেয়া পরিশোধের যে পুরনো রীতি, সেখানে এখন জায়গা দখল করেছে মানিগ্রাম, ব্যাংক ব্যবস্থা ও এমএফএস এর মত অনলাইন পেমেন্ট পরিষেবাগুলো। এসব মাধ্যমে টাকা পরিবহনের ঝুঁকিও কম। তবে বকেয়া পরিশোধের বাইরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতেও হালখাতায় হাজির থাকেন খরিদ্দাররা।
অনেক ব্যবসায়ী একাধিবারও হালখাতা আয়োজন করেন। নতুন বছরের অপেক্ষায় না থেকে গত ফাল্গুনেই একবার হালখাতার আয়োজন করেছিলেন বলে জানান বাবুরহাটে শাহ্ আমানত লুঙ্গির ব্যবস্থাপক নূরে আলম।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা দুইবার হালখাতা করি। গত ফ্রেব্রুয়ারি মাসে খাসির মাংস, মাছ দিয়ে সাদাভাত ও মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হয়। এবার পয়লা বৈশাখে রোজা হওয়ায় যারা আসেনি, তাদের নিয়ে ঈদের পর আবার হালখাতা করা হবে।“
লেনদেন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসায় হালখাতায় বকেয়া আদায়ে এখন ভাটা পড়েছে বলে মনে করেন বাবুরহাটের আফতাব এন্টারপ্রাইজের বিক্রয়কর্মী মাসুদুর রহমান নোমান। তার দোকানে হরেক মানের ও দরের লুঙ্গি বিক্রি হয়।
“হালখাতায় সাড়া এখন কম পাই। সারা বছরই তো টাকা কালেকশন করি। যা বাকি থাকে তা আদায়ে তারপরও হালখাতা করি। ব্যাংক ও মোবাইলে টাকা নেওয়ার সুবিধা আছে এখন। তাই হালখাতায় তেমন আদায় হয় না।”
বৈশাখের পুরো মাস জুড়েই বাবুরহাটে হালখাতার আয়োজন থাকার কথা জানান সেখানকার শ্রী-লক্ষ্মী বস্ত্রালয়ের স্বত্বাধিকারী অসিত সাহা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বাজারের হোটেলে এখন সব ধরনের খাবার পাওয়া যায়। বৈশাখ মাসে মৌসুমি খাবার হিসেবে নাড়ু, মুড়কি আর মিষ্টান্ন তো সবসময়ই আছে। তাই যে খরিদ্দার যে হাটবার আসেন, তার জন্য সেদিনই হালখাতা করি।”
মেয়েদের বিভিন্ন ধরনে পোশাকের পাইকারি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান বাবুরহাটের ‘রাম কৃষ্ণ সাহা কালেকশন’-এ একইভাবে হালখাতার আয়োজন করা হয় বলে জানান স্বত্বাধিকারী আর কে সাহা।
পেশায় ৩৩ বছরের বেশি সময় ধরে বাবুরহাটে বিভিন্ন দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করে আসা আব্দুল মালেক এক দশক ধরে এলবি ক্লোথ স্টোর এ আছেন ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে। হালখতার বৈচিত্র্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “আগে মালিকরা দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসতেন। এখন সেভাবে আর হয় না। আমরাই খরিদ্দারদের সঙ্গে যোগাযোগ বেশি করায়, আমরাই দাওয়াত করে খাওয়াই।”
হালখাতা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হলেও পহেলা বৈশাখের দিনই মূলত ব্যবসায়ীরা দোকান সাজিয়ে থাকেন বলে জানান ‘মা-বাবার দোয়া টেক্সটাইল’ এর স্বত্বাধিকারী আমান উল্ল্যাহ আমান।
সুপার মমিন টেক্সটাইলের স্বত্বাধিকারী হাজী মমিন উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আয়োজন করি শুধু পয়লা বৈশাখেই। যারা আসেন, তাদের আপ্যায়ন করি। বৈশাখের হালখাতা করার সময় সবার কই। যারা পারে তারা আসেন। যারা আসেন না তাদের তো পরে করি, খরিদ্দারদের তো আর সারা বছরই আপ্যায়ন করি।“