Published : 15 Feb 2023, 12:02 AM
রাজধানী ঢাকাসহ শহরাঞ্চলে পাইপে সরবরাহ করা গ্যাসের সংকট এখন রাঁধুনীদের কাছে নিত্য এক যন্ত্রণা; বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা এলপি গ্যাসের দামও চড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে রান্নার কাজে নির্ভরতা বাড়ছে বৈদ্যুতিক চুলার।
নিভু নিভু গ্যাস কিংবা রাত-দিনের বড় অংশজুড়ে পাইপলাইনে গ্যাস না থাকার বিষয়টি দিনের পর দিন বাড়তে থাকায় স্থায়ী সমাধান হিসেবে অনেক পরিবারই এখন বেছে নিচ্ছেন বিদ্যুৎচালিত ইনডাকশন বা ইনফ্রারেড চুলা।
শৌখিনতার পর্ব পেরিয়ে একটু একটু করে নগরীর রাঁধুনিরা রান্নার কাজে এমন বৈদ্যুতিক চুলার উপর নির্ভর করতে শুরু করেছেন। এর সঙ্গে খরচ সাশ্রয়ের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত বলে ঢাকার রান্নাঘরগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিক্রিও বেড়েছে এমন চুলার বলে জানাচ্ছেন দোকানিরা।
চলমান গ্যাস সংকট আর এলপিজির উচ্চ দামের কারণে আসন্ন রোজার প্রস্তুতি হিসেবে ইনডাকশন বা ইনফারেডের মত বিশেষ বৈদ্যুতিক চুলা কেনার হিড়িক পড়েছে বলে জানান তারা।
এছাড়া কোনো এলাকায় বেশ কয়েকদিনের জন্য গ্যাস সরবরাহে যখন ঘাটতি দেখা যায় তখন মানুষজন বৈদ্যুতিক এ চুলার খোঁজে আসছেন দোকানে।
দেশের বাজারে ওয়ালটন, ভিশন, কিয়ামসহ আরও কয়েকটি দেশি ব্র্যান্ডের তৈরি বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। পাশাপাশি এলজি, নোভেনা, রিকো, মিয়াকো, নিয়ামা, প্রেসটিজসহ বিভিন্ন বিদেশি ব্র্যান্ডের চুলা পাওয়া যাচ্ছে।
২২০০ ওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন এসব চুলা কিনতে পাওয়া যাচ্ছে ৩০০০ থেকে ৪০০০ টাকার মধ্যে। সুযোগ সুবিধাভেদে দাম আরেকটু বেশি।
ঢাকার পল্লবীর আইরিন সুলতানা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, বছর কয়েক আগে মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য রাস্তা খোড়াখুঁড়ির সময় তার এলাকায় দিনের বড় অংশজুড়ে গ্যাস থাকত না। তখন তিনি বৈদ্যুতিক চুলা কিনে আনেন। সেই থেকে মাঝে মধ্যে এলাকায় কোনো গ্যাসের সংকট হলেও তাকে ভুগতে হয় না।

“পোর্টেবল এসব চুলা বাসার যেকোনো জায়গায় স্থাপন করে রান্না করা যায়। কাজ শেষে আবার প্যাকেটে ভরে রেখে দেওয়া যায়। আমার চুলাটি ইনফ্রারেড প্রযুক্তির হওয়ায় যেকোনো পাতিলে রান্না করা যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা গেছে, লাইনে গ্যাস নেই। এলাকার বাসিন্দারা সবাই হোটেলে গিয়ে ভিড় করে, হোটেলের খাবার শর্ট ফেলে দিয়েছে। কিন্তু আমার এ ধরনের কোনো চিন্তাই করতে হয়নি,” বলেন তিনি।
এক সময় বৈদ্যুতিক হিটারের চুলায় রান্নার প্রচলন ছিল। বিদ্যুৎ অপচয়ের কারণে বিদ্যুৎ বিভাগ তা নিরুসাহিত করে। হিটারের চুলায় রান্নার বেলায় কয়েলের তাপ কিংবা বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে অনেক দুর্ঘটনার খবরও পাওয়া যেত। তবে আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি ইনডাকশনের এসব চুলায় এমন কোনো ব্যাপার নেই বলে জানান ব্যবহারকারীরা।
আশেপাশে খুব বেশি তাপও ছড়ায় না। গ্যাসের চুলার মতই তাপমাত্রা বাড়ানো বা কমানো যায় বলে জানান সাদিয়া সুলতানা নামের আরেক ব্যবহারকারী।
ঢাকার শান্তিনগরে বসবাসকারী সাদিয়া এক সময় শ্যামলী কাজী অফিসের গলিতে থাকতেন। ওই ভবনে লাইনের গ্যাস না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলায় রান্নাবান্না করতেন। এখন শান্তি নগরের বাসায় লাইনের গ্যাস আছে। তবে মাঝে মধ্যেই গ্যাস সংকট দেখা দিলে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহারের কথা জানান তিনি।
হঠাৎ এলপিজির সংকট, ‘রাতারাতি’ বাড়ছে দাম
গ্যাস সংকটে নাকাল নারায়ণগঞ্জ, বাড়ি-কারখানায় ভোগান্তি চরমে
এলপিজিতে ‘হরিলুট’: সরকারি দর যতটুকু বাড়ল, খুচরায় তারও বেশি
মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে মনিপুরে একটি ইলেক্ট্রনিক্স ও গৃহস্থালি পণ্যের দোকানি মেসবাহ উদ্দিন টিটু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গত এক বছর ধরে বৈদ্যুতিক (ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড চুলা) চুলার দিকে ক্রেতার আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক ক্রেতা এসে এগুলো খোঁজেন। আবার রোজার মাসেও এ চুলার চাহিদা অনেক বেড়ে যায়।

“আগে কেবল ইনডাকশন চুলা বিক্রি হলেও এখন ইনফ্রারেড চুলা নামে বিশেষ ধরনের চুলার কদর বেড়েছে। কারণ ইনডাকশন চুলায় কেবল নির্ধারিত পাতিলেই রান্না করা যায়। আর ইনফ্রারেড চুলায় মোটামুটি সব ধরনের ধাতবের তৈরি পাত্রে রান্না করা যায়। এমন চুলার দাম ও বিদ্যুৎ খরচ একটু বেশি হলেও মানুষ এ দিকেই আগ্রহী,” বলেন তিনি।
উত্তর পীরেরবাগে একটি দোকানে বৈদ্যুতিক চুলাসহ আরও কিছু ইলেকট্রনিক্স পণ্য সরবরাহ করছিলেন ভিশন ব্র্যান্ডের কর্মী আল আমিন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি জানান, মিরপুর জোনে তার অধীনে থাকা ইলেকট্রনিক্স দোকানগুলোতে তিনি মাসে কয়েকশ চুলা দিয়ে থাকেন। সম্প্রতি এ চুলার চাহিদা বেড়েছে। সামনে গরমের মৌসুমে চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে তার ধারণা।
“আমি যেই বাসায় থাকি সেখানে গ্যাস সংযোগ নেই। আমরা সিলিন্ডারে গ্যাসের বদলে পুরাপুরি বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করছি। আমাদের দুই সদস্যের পরিবারে এই চুলায় বিদ্যুৎ বিল বাবদ সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা খরচ হচ্ছে বলে আমার ধারণা,” বলেন আল আমিন।

ওয়ালটন হোম এপ্লায়েন্সের চিফ বিজনেস অফিসার আল ইমরান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সাধারণত ওয়ালটনের ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড কুকারগুলোতে রান্নায় গ্যাস স্টোভের তুলনায় ৩৫-৪০ শতাংশ কম খরচে রান্না করা যায়। এক ইউনিট বিদ্যুতে এক ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট রান্না করা যায়।
ফেব্রুয়ারিতে এলপিজির দাম বাড়ল ২১%
এলপিজি কিনতে মাসে ‘২৭০০ কোটি টাকা’ বাড়তি দিচ্ছে ভোক্তারা
প্রতি চারজনের পরিবারের জন্য প্রতিদিন তিন ঘণ্টা রান্না করা হলে মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে খরচ সীমাবদ্ধ থাকে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে বছরে ১২০ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক চুলার বাজার তৈরি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্যে ওয়ালটনের অংশীদারিত্ব ২০ শতাংশের কাছাকাছি।
চুলা উৎপাদনকারী কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, দেশি ব্র্যান্ডগুলো বিদেশ থেকে বেশ কিছু যন্ত্রাংশ আমদানি করে তা সংযোজনের মাধ্যমে এসব চুলা তৈরি করে। উৎপাদন খরচের ৫০ শতাংশ যন্ত্রাংশ আমদানি বাবদ এবং ৫০ শতাংশ দেশি মূল্য সংযোজন হয়ে থাকে।
২০২৩ সালে বৈদ্যুতিক চুলার বাজারে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধর আশা করছেন ওয়ালটন কর্মকর্তা আল ইমরান।