Published : 24 Aug 2022, 03:22 PM
জ্বালানি তেল বিক্রির ৭ শতাংশ কমিশনসহ পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরে তা পূরণের জন্য সরকারকে সাত দিন সময় দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
এর মধ্যে দাবি পূরণ না হলে আগামী ৩১ অগাস্ট ভোর থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ঢাকাসহ সারাদেশে পেট্রল পাম্প বন্ধ রেখে ‘প্রতীকী কর্মবিরতির’ ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে এই ঘোষণা দেন সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যের ওপর শতকরা হারে কমিশন নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিপিসি ও পেট্রোল পাম্প সমিতির বৈঠকে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি।
“আগামী সাত দিনের মধ্যে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলে ৩১ অগাস্ট বুধবার ভোর থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত দেশের সব পেট্রল পাম্প ও ট্যাংক লরি মালিকরা প্রতীকী ধর্মঘটের অংশ হিসাবে কর্মবিরতি পালন করবে।”
লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনানোর পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে নাজমুল হক বলেন, “পার্সেন্টেজ আকারে কমিশন কমবে, পার্সেন্টেজ আকারে বাড়বে…। আমরা এমন এক সংগঠন, আমরা ইচ্ছা করলে অনেক কিছু করতে পারি দেশে। দেশে অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে পারি। আমরা কি সেই পরিচয় দিছি? দেই নাই।
“কিছু হইলেই ধর্মঘটের আহ্বান করা, আমরা এইটা চাই নাই। আমরা এই সরকারের আমলে এখন পর্যন্ত কোনো ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণা করি নাই। অন্য কেউ ঘোষণা করলেও আমরা চাই নাই। কিন্তু এই না চাওয়াটাই আমাদের জন্য এখন বিপদ হয়ে গেছ।।”
তিনি বলন, ২০১৩ সালে তেল বিক্রির ওপর পাম্প মালিকদের কমিশন অকটেন ও পেট্রোলে ৪.৭৫ শতাংশ এবং ডিজেল ৩.২২ শতাংশ ছিল। ২০১৬ সালে তা বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করার জন্য আবেদন করে ব্যর্থ হওয়ায় তারা কর্মসূচি দিয়েছিলেন।
“সেই পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং অ্যাসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দের মাঝে এক বৈঠকে ১ মাসের মধ্যে দাবি পূরণের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। কিন্তু সেই দাবি এত বছরেও পূরণ করা হয়নি, বরং গত ৫ অগাস্ট জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে কমিশনের হার কমিয়ে দিয়ে অকটেন ও পেট্রলে ৩.৭৮ শতাংশ এবং ডিজেলে ২.৫৬ শতাংশ করা হয়।”
নাজমুল হক বলেন, বিপিসি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ছাড়া ভেক্তা অধিকার অধিদপ্তর, বিএসটিআই বা অন্য কোনো সংস্থা পেট্রোল পাম্পে কোনো মোবাইল কোর্ট বা অভিযান চালাতে পারবে না বলে ২০১১ সালে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেটাও বাস্তবায়ন করা হয়নি।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এসব অভিযানে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করে’ অভিযোগ করে তিনি বলেন, “উনারা হঠাৎ হঠাৎ একেক জায়গায় গিয়া, যদি তেল মাপে ঠিকও পাওয়া যায়, তারপরও এইটা নাই, ওইটা নাই কইরা জরিমানা করবে। কিন্তু জরিমানার যে স্লিপটা, ওইটার মাঝে তারা একটা ধারা দেয়।
“ওই ধারা খুঁইজা দেখি, তেলে কারচুপি করার জন্য ২ লাখ টাকা ফাইন করা হইছে। ভাই, এইটা তো ঠিক না। এইজন্যই সিদ্ধান্ত হইছিল যে যখনই ভোক্তা যাবে, মোবাইল কোর্ট যাবে, বিএসটিআই যাবে; তখন-ই তেল কোম্পানি বা বিপিসি প্রতিনিধি সাথে থাকবে, যাতে পাম্প মালিকের ওপর অত্যাচার করতে না পারে।”
তার দাবি, পেট্রোল পাম্পের কাগজপত্র দেখার দায়িত্ব তেল কোম্পানি, বিপিসি, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরণ অধিদপ্তরের। আর ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের দায়িত্ব ভোক্তাকে ঠকানো হচ্ছে কি না- তা দেখা্।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সেজন্য নিয়মিত অভিযান করে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আজকে করলেন, দুই মাস করলেন ন। এভাবে করল তো চুরি বন্ধ হবে না। কিন্তু একজন ভোক্তা গিয়া আপনারে অভিযোগ দিয়া দিল, মিডিয়ায় আইসা গেল, মিডিয়ার ভয়ে অভিযান করতেছেন। এটা তো ঠিক না।”
তবে পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি স্বীকার করেন, ‘কমিশন কম হওয়ার কারণে’ কোনো কোনো পাম্পে কারচুপির ঘটনা ঘটতে পারে; কারণ, তার ভাষায় সব খাতেই ‘খারাপ মানুষ আছে’।
সবশেষে তিনি পাঁচ দফা দাবি এবং ৩১ অগাস্টের কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেন, দাবি পূরণ করা না হলে তারা ‘লাগাতার’ কর্মসূচিতে যাবেন এবং পেট্রোল পাম্প মালিকরা ব্যবসা ‘বন্ধ করে দিতে’ বাধ্য হবেন।
“আমাদের ধর্মঘটে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নাই, কোনো প্রয়োজন নাই। আমরা ব্যবসা করব না। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একটা প্রতীকী ধর্মঘট আমরা দিছি, যে আমরা আর পারছি না, আমাদের ব্যবস্থা করেন, এটা আবেদন… কারণ প্রথমেই সরকারের পিঠটা দেয়ালে ঠেকায়ে দিলাম, ওইটা ঠিক না। এইটাও যদি উনারা না করেন, আমাদের লাগাতারে যাওয়া ছাড়া কোনো গতি নাই।”
৫ দাবি
১. জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিপিসি এবং অ্যাসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দের মধ্যে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তেল বিক্রির কমিশন তেলের দামের ওপর শতকরা হারে নির্ধারণ করা।
২. তেলের মাপে কারচুপি রোধে নিয়মিত মনিটরিং/অভিযান পরিচালনা করা এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে ২০১১ সালের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিপিসি বা বিপণন কোম্পানির প্রতিনিধি ছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই এর অভিযান এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা না করা। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কারচুপি রোধে নিয়মিত মনিটরিংয়ের জন্য অবিলম্বে তেল কোম্পানি, বিএসটিআই এবং অ্যাসোসিয়েশন প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত মনিটরিং সেলের কার্যক্রম শুরু করা।
৩. বিপিসি, বিপণন কোম্পানি এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য কোনো দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান পাম্পের কাগজপত্র পরীক্ষা করার নামে পাম্প মালিকদের হয়রানি করা যাবে না। পাম্প পরিদর্শনকালে সঠিক ও বেঠিক উভয় তথ্য লিপিবদ্ধ এবং প্রচার করতে হবে এবং এর কপি মালিককে সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৪. সওজের ইজারা মাশুল যৌক্তিক হারে নির্ধারণ করতে হবে। বিপিসি, বিপণন কোম্পানি এবং বিএসটিআই এবং অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাম্পের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাংক ক্যালিবারেশন সার্টিফিকেট নবায়নের নিয়ম বাতিল করতে হবে।
৫. জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের সিদ্ধান্ত অনুসারে রাস্তায় ট্যাংক লরির কাগজপত্র পরীক্ষার নামে চালককে পুলিশি হয়রানি করা যাবে না। ট্যাংক লরির কাগজপত্র ডিপো গেইটে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং ২০১৬ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকল ডিপোতে পার্কিং স্ট্যান্ড নির্মাণ করতে হবে। ট্যাংক লরি চালকদের জন্য বিআরটিএর আলাদা কাউন্টার করার সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। শোধনাগার সুবিধা সমন্বিত বিভিন্ন গ্যাস ফিল্ডের শোধনাগার আগের মত চালু করতে হবে।