০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

বাজার ‘স্বাভাবিক’ রাখতে রিজার্ভ থেকে আরও ১০ কোটি ডলার বিক্রি

১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা দরে বিক্রি করা হয় এ বিদেশি মুদ্রা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Nov 2026, 01:15 AM

Updated : 05 Nov 2026, 01:15 AM

ডলারের দর ‘স্বাভাবিক’ রাখতে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ থেকে আরও ১০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা দরে এ বিদেশি মুদ্রা বিক্রি করা হয়েছে।

বুধবার নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কয়েকটি ব্যাংকের কাছে এ ডলার বিক্রি করা হয় বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, আমদানি ব্যয়ের চাপ আছে। জ্বালানি তেল আমদানিতে বেশি খরচ হচ্ছে। এলপিজির দামও বেশি। রমজান মাস সামনে রেখে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খুলছেন ব্যবসায়ীরা। সব কিছু মিলিয়ে ডলারের চাহিদা বাড়ায় দর ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

“বাজার স্বাভাবিক রাখতেই রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা হচ্ছে।”

এর আগে গত সপ্তাহে নিলামের মাধ্যমে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দীর্ঘদিন পর সেটিই ছিল এ ধরনের প্রথম নিলাম।

সর্বশেষ নিলামে প্রতিটি ব্যাংককে একক দরপ্রস্তাবে কমপক্ষে পাঁচ লাখ ডলার কেনার জন্য দরপত্র জমা দিতে বলা হয়।

এর আগে গত মঙ্গলবারও ১০ কোটি ডলার বিক্রির জন্য নিলাম আহ্বান করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কয়েকটি ব্যাংক এতে অংশ নিলেও শেষ মুহূর্তে নিলামটি বাতিল করা হয়।

এক দশক আগে রিজার্ভ বেড়ে যাওয়ার ‘মধুর সমস্যায়’ ছিল বাংলাদেশ। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এই অর্থ অলস বসিয়ে না রেখে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা ছিল চিন্তার বিষয়।

কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যায়। তাতে রিজার্ভ কমতে থাকায় দেখা দেয় উদ্বেগ।

২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে টানা তিন বছর রিজার্ভ থেকে বিপুল ডলার বিক্রি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে ২০২১ সালের আগস্টে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানো রিজার্ভ কমে ২৬ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছিল।

তবে অন্তবর্তী সরকারের সময় আহসান এইচ মনসুর গভর্নরের দায়িত্ব নিয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন রিজার্ভ থেকে এক ডলারও বিক্রি করা হবে না। বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নিয়েও একই অবস্থান বজায় রাখেন।

এরই মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফনে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যায়; কমতে থাকে দাম। পতন ঠেকাতে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন) সব মিলিয়ে ৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আমদানি ব্যয় হ্রাস, রেমিটেন্স বৃদ্ধি ও ডলার কেনার কারণে রিজার্ভ বাড়তে থাকে; অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কেটে যায়।

গত ৩০ জুন বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ বেড়ে ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। গ্রস বা মোট হিসাবে ওই দিন রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।

৩০ সেপ্টেম্বর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৬ দশমিক শূন্য ১ বিলিয়ন ডলার।

৩০ অক্টোবর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৬ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার।

বুধবার (৪ নভেম্বর) দিন শেষে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার।

আগামী সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের আমদানি বিল পরিশোধ করতে হবে; তখন রিজার্ভ বেশ খানিকটা কমে আসবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এবং ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন দলের পরাজয়ের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতের পরিস্থিতির উন্নতির আশা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও ডলারের দাম কমেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে কিছুদিন স্থিতিশীল থাকার পর গত কয়েক দিনে আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের বিনিময় হার বাড়তে শুরু করেছে। চলতি সপ্তাহে আন্তব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দর ১২৪ টাকা ছাড়িয়েছে।

গত দুই দিন ধরে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা দরে বিক্রি হয়েছে। এর আগের দুই দিন এই দর ছিল ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরের শুরুতে আন্তব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২৩ টাকা। মাসের শেষ কার্যদিবসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ টাকা ৯৯ পয়সায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় দেড় বছর আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের বিনিময় হার ১২১ টাকা থেকে ১২২ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে চলতি বছরের মার্চ থেকে ডলারের দর আবার বাড়তে শুরু করে।

ব্যাংকের পাশপাশি খোলবাজার বা কার্ব মার্কেটেও ডলারের দাম বাড়ছে। বুধবার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মানি এক্সচেঞ্জগুলোতে ১২৮ টাকা ১০ পয়সা দরে ডলার বিক্রি হয়েছে। কেনা হয়েছে ১২৭ টাকা ১০ পয়সায়।