Published : 18 Mar 2026, 08:18 AM
দেশে সারের চাহিদার বড় অংশ মেটে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করে। ইরান যুদ্ধে সেই উৎস অনিশ্চিত হওয়ার মধ্যে চারটি সার কারখানা বন্ধ হলে বিকল্প উৎসের খোঁজে নেমেছে সরকার।
বিশ্বের তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হলে ভবিষ্যতের ভাবনায় সরকার এখন বিকল্প হিসেবে মিশর ও চীন থেকে সার আমদানির চিন্তা করছে।
তবে কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সার আমদানি ও উৎপাদনের তথ্য এখনই কোনো সংকটের আভাস দিচ্ছে না। চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়াসহ অন্য সারের বেশ কয়েক মাসের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার কথা বলেছেন মন্ত্রণালয় দুটির কর্মকর্তারা।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গ্যাস সাশ্রয়ে পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা বন্ধ রাখা হলেও চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ নিয়ে শঙ্কার কারণ দেখছেন না তারা।
কর্মকর্তারা বলছেন, এখন মাঠে বোরো ধান রয়েছে। এ মৌসুমে বোরো চাষের জন্য সারের আর প্রয়োজন পড়বে না। রবি শস্যের ক্ষেত্রেও একই তথ্য খাটে। আলু, পেঁয়াজসহ অন্য ফসলের বেশির ভাগ উঠে গেছে। এরপর বর্ষা শেষে আমন মৌসুম শুরু হবে। তখন ইউরিয়ার ব্যবহার হয় কম।
এর পরের বোরো মৌসুমের জন্য মজুদ বাড়াতে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করতে কাজ শুরু করেছে সরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ শাখা প্রধান) আহমেদ ফয়সল ইমাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বস্তি থাকার কথা বলেছেন।
তার ভাষ্য, “স্মরণকালের সর্বোচ্চ মজুদ রয়েছে এখন। এ বছর সারের সংকটের সম্ভাবনা নেই।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরানের পাল্টা হামলায় যুদ্ধ ছড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে এমন দেশগুলোকে নিশানা করেছে ইরান। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি।
আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে থাকায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের দুশ্চিন্তার মধ্যে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে দেশে বেশি ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের কাঁচামাল গ্যাসের সরবরাহ ধাক্কা খেয়েছে। গ্যাস সাশ্রয়ে দেশের চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানা ১৫ দিনের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। কবে সেগুলো আবার উৎপাদনে ফিরবে সেটিও অনিশ্চিত।
অপরদিকে পাল্টা জবাবের মধ্যে ইরান রোববার ইসরায়েল এবং বিভিন্ন আরব দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা লক্ষ্য করে একগুচ্ছ উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছে।
যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার এ শঙ্কা থেকে দেশে সারের উৎপাদন ও আমদানি ব্যাহত হওয়ায় আগামীতে মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে সেই আলোচনা সামনে এসেছে।
মূলত সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি চীন ও মরক্কো থেকে সার আমদানি করে বাংলাদেশ। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইউরিয়া এবং সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া ও ডিএপি আসে।
তবে যুদ্ধ শুরুর পর গ্যাস সাশ্রয়ে কয়েকটি কারখানা বন্ধের খবরের পর সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম তৈরির খবর মিলেছে। ডিলাররা চাহিদার তুলনায় কম বিক্রি করায় কিছু কিছু এলাকায় বেশি মূল্যে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

চালু শুধু এক কারখানা
যুদ্ধ শুরুর সপ্তাহ খানেক পর চারটি ইউরিয়া সার কারখানা ১৫ দিনের জন্য বন্ধ রেখেছে সরকার। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন পাঁচটি কারখানার মধ্যে বর্তমানে চালু আছে শুধু শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড।
চট্টগ্রামের ইউরিয়া ফার্টিলাইজার, ঘোড়াশালের পলাশ ফার্টিলাইজার, যমুনা ফার্টিলাইজার ও আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানির কারখানায় উৎপাদন ৬ মার্চ থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এর বাইরে বেসরকারিভাবে পরিচালিত কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডেও (কাফকো) উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
আগের ঘোষণা অনুযায়ী ১৫ দিন পর এসব কারখানা আবার চালু হবে কি না সেই সিদ্ধান্ত এখনও না হওয়ার কথা বলেছেন বিসিআইসির পরিচালক (উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান।
বিসিআইসির পাঁচটি ইউরিয়া কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস লাগে। চালু থাকা শাহজালাল ফার্টিলাইজার কারখানার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৩০০ টন।

সারের মজুদ কতটা রয়েছে?
জ্বালানি সাশ্রয়ে সার কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তের মধ্যে কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে সার মজুদ ও বিতরণ এবং তা দিয়ে কতদিনের চাহিদা মিটবে তা নিয়ে বৈঠক করে। সেই তথ্য প্রাথমিকভাবে মন্ত্রীদের কাছে এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।
সেই তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মজুদ ইউরিয়া দিয়ে জুন পর্যন্ত, টিএসপি দিয়ে অক্টোবর, ডিএপি ও এমওপি দিয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চাহিদা পূরণ করা যাবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম পর্যাপ্ত মজুদ থাকার কথা তুলে ধরে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস থেকে সরকারের সার আমদানির প্রচেষ্টার তথ্য দেন। বলেন, “মিশরের সঙ্গে একটা চুক্তি শেষ পর্যায়ে রয়েছে; চীনের একটা কোম্পানিও তাদের মাধ্যমে সার কেনার প্রস্তাব করেছে। আমরা সেটি খতিয়ে দেখছি।
“আমরা সবসময়ই চাই নতুন নতুন উৎস এক্সপ্লোর করতে।”
চলতি বছর দেশে রাসায়নিক সারের চাহিদা ৫৭ লাখ ৮৫ হাজার টন। এর প্রায় ৮০ শতাংশ বিভিন্ন দেশ থেকে সরকারিভাবে আমদানি করা হয়। বাকিটা আসে দেশের কারখানাগুলো থেকে। কিছু সার বেসরকারিভাবেও আসে।
সরকারের দুই প্রতিষ্ঠান বিসিআইসি ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সার ব্যবস্থাপনার কাজ করে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সার মজুদের যে তথ্য দেন তাতে দেখা যায়- ৮ মার্চ পর্যন্ত ইউরিয়ার মজুদ রয়েছে ৪ লাখ ৯৩ হাজার টন; টিএসপি ৩ লাখ ৮২ হাজার টন; ডিএপি ৫ লাখ ৯ হাজার টন এবং এমওপি রয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার টন।
চার প্রকারের সার মিলে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ওই সময় পর্যন্ত মজুদ ছিল ১৭ লাখ ২৬ হাজার টন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মজুদের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৬৭ হাজার টন।
বর্তমানে মোট মজুদের মধ্যে বিসিআইসির কাছে রয়েছে ৫ লাখ ৮ হাজার টন; বিএডিসির কাছে ১০ লাখ ৭২ টন এবং বেসরকারি খাতে রয়েছে ১ লাখ ৪৬ টন।
বিতরণের তথ্য বলছে, মার্চ পর্যন্ত যে পরিমাণ বরাদ্দ প্রয়োজন সেটির
তুলনায় মাঠে বেশি সার বিতরণ করা হয়েছে।
মাঠের পরিস্থিতি কী?
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দানাদার ইউরিয়া উৎপাদনকারী জামালপুরের যমুনা সার কারখানা গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ। এখান থেকে বিসিআইসির তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৯০০ ডিলারের মাধ্যমে জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের ২১ জেলার ১৬২ উপজেলার কৃষকের কাছে সার সরবরাহ করা হয়।
দীর্ঘ ২৩ মাস কারখানা বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এটি উৎপাদনে ফেরে। তিন মাস না যেতে গ্যাস সংকটে ১৭ ফেব্রুয়ারি আবার বন্ধ হয়ে যায় কারখানাটি।
জামালপুর জেলা কৃষি অফিসের তথ্য বলছে, যুমনা সার কারখানা বন্ধের প্রভাব এখন পর্যন্ত চাষাবাদে প্রভাব ফেলেনি। বোরো চারা রোপন প্রায় শেষ সময়ে চলে আসায় তারা স্বস্তিতে রয়েছে।
চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৯১৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান, ৪ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে আলু, ৪০ হাজার ৯৮২ হেক্টর জমিতে সরিষা, ৬ হাজার ৪৭৫ হেক্টর জমিতে মরিচ ও ২ হাজার ১৭০ হেক্টর জমিতে পেয়াজ আবাদ করা হয়েছে।
চলতি মৌসুমে সংকট না থাকলেও কারখানা বন্ধ থাকার খবরে কৃষকের অনেকের মধ্যে সার সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে কিছু এলাকায় কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা বেশি নিচ্ছেন ডিলাররা।
মমিনুর রহমান নামে এক কৃষক বলেন, শীতের মধ্যে সার সহজে কেনা গেলেও এখন কারখানা বন্ধের খবরের পর দোকানে গেলে বলে ‘সার নাই’। এজন্য ১ হাজার ৩৫০ টাকার বস্তা ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
আরেক কৃষক এবাদুল হক বলেন, এই মৌসুমে সারের কোনো সমস্যা হয় নাই। এখন তৃতীয় কিস্তিতে ধানের জমিতে সার দিচ্ছি। চাহিদামতই পাওয়া যাচ্ছে।
জেলার মাহমুদপুর বাজারের আলহাজ ট্রেডার্সের মালিক রিয়াজুল ইসলাম এখন পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়ার তথ্য দেন। বলেন, মজুদ থেকে তাদের সরবরাহ করা হচ্ছে। সামনে যদি কারখানা চালু না হয় তাহলে শঙ্কা তৈরি হতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান বলেন, জেলায় চাহিদা অনুপাতে ‘পর্যাপ্ত সার মজুদ আছে’। কৃত্রিমভাবে যাতে সংকট তৈরি না হয় সেজন্য মাঠ পর্যায়ে নজর রাখা হচ্ছে।

কোনো গুজবে কান না দিয়ে কৃষকদের সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার কেনার অনুরোধ করেন তিনি।
দিনাজপুরেও প্রায় একই চিত্র মিলেছে। সারের সংকট না থাকলেও কৃষকের চাহিদা এবং বাড়তি দাম নিয়ে অভিযোগ মিলেছে সেখানেও। তবে জেলায় ৯৮ শতাংশ জমির বোরো চারার রোপন সম্পন্ন হওয়ায় বর্তমানে সারের চাহিদা কমে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দিনাজপুরের উপ-পরিচালক আফজাল হোসেন বলেছেন, যুদ্ধ শুরু আর সার কারখানা বন্ধের আগেই বোরো মৌসুমের সারের চাহিদা মিটে গেছে।
আরও পড়ুন-