Published : 16 Sep 2025, 09:32 PM
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বেসরকারি খাতে সার আমদানির ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির একাধিক কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।
মঙ্গলবার ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে তা খতিয়ে দেখা হবে। কৃষি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি দেখতে বলা হয়েছে।”
বেসরকারি পর্যায়ে সার আমদানি করতে গিয়ে নতুন করে ‘অনিয়মের সুযোগ’ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একদল ব্যবসায়ী। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে শোরগোল চলছে।
অভিযোগ উঠেছে, একজন ব্যক্তিকে নিয়ম ভেঙে একই কার্যাদেশে দুটি দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দরে একটি লটের সার আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরও গত ১১ সেপ্টেম্বর এক ফেইসবুক পোস্টে সার কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন।
কয়েকটি কোম্পানিকে দেওয়া কার্যাদেশের কপি তুলে ধরে তিনি লেখেন, “সরকারি অর্থ লোপাটের এ ধরনের অভিনব উদ্যোগ আমি আগে দেখিনি। এ যেন আয়োজন করে রাষ্ট্রের টাকা লুটপাট। ঘটনাটি ঘটেছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, কৃষি মন্ত্রণালয়। বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সার আমদানি করতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তা যোগসাজশে, সম্প্রতি সার আমদানির জন্য আহ্বান করা দরপত্রের বিপরীতে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই নজিরবিহীন অনিয়মের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
“সার আমদানি সংক্রান্ত পরিপত্র অনুযায়ী প্রাপ্ত দরের মধ্যে সর্বনিম্ন দরের ক্রমানুসারে কার্যাদেশ প্রদান করার বিধান রয়েছে। কিন্তু তা অমান্য করে মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে দরপত্রের প্রাপ্ত দরের বাইরে ‘নেগোসিয়েশন’ এর মাধ্যমে কার্যাদেশ প্রদান করে।”
এরপর কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বিবৃতি দিয়ে অনিয়মের কথা অস্বীকার করা হয়। বরং বিগত দিনের কিছু ‘অনিয়ম দূর করায়’ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের ‘স্বার্থহানি’ হয়েছে এবং সরকারের অর্থ সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সরকার যে প্রক্রিয়ায় কার্যাদেশ প্রদান করেছে, তাতে প্রতিটি কার্যাদেশের বিপরীতে টনপ্রতি ২০ থেকে ১৫০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় ‘কমানো’ সম্ভব হয়েছে। আমদানি নিয়ে যে ‘অপপ্রচার’ চালানো হচ্ছে, তা ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’।
“সার আমদানিতে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ ভিত্তিহীন, মনগড়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অসত্য তথ্য সম্বলিত। কৃষি মন্ত্রণালয় প্রকাশিত পোস্ট/ প্রতিবেদনগুলোর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।”
দেশে প্রতিবছর প্রায় ৬৯ লাখ টন সার ভর্তুকি মূল্যে বিতরণ করে সরকার। ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার বিদেশ থেকে আমদানি করে ভর্তুকি মূল্যে সারাদেশে বিতরণ করা হয়। সরকারি পর্যায়ে আমদানির পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও সার আমদানির সুযোগ রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের পরিপত্রের ৮(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মোট মূল্যে দাখিল করা আবেদনগুলো থেকে সর্বনিম্ন মূল্যের ক্রমানুসারে বেসরকারি পর্যায়ের আমদানিকারকরা সার ভর্তুকির অন্তর্ভুক্তির জন্য মনোনীত হবে।
“মূল্যের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সমসাময়িক সময়ে বিএডিসি কর্তৃক আমদানি করা সারের মূল্য এবং সারের আন্তর্জাতিক মূল্য প্রকাশকারী বুলেটিন আরগুস ও'ফার্টিকন এর মূল্য তালিকায় প্রদর্শিত দরের সাহায্য নেওয়া হবে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত মর্মে বিবেচিত হবে।’’
এ পদ্ধতি অনুসরণ করে নন-ইউরিয়া সারের আমদানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতি ধাপের টেন্ডারে একটি আমদানিকারক কোম্পানিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ (কম বেশি ৩০,০০০ মেট্রিক টন) সারের জন্য দরপ্রস্তাব দাখিল করতে হয়।
সরকারের সারভিত্তিক আমদানি চাহিদা ওই সিলিং এর চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় দর প্রস্তাবে অংশগ্রহণকারীরা একই দেশের একই সারের জন্য দাখিল করা দরের মধ্যে সর্বনিম্ন দরের পাশাপাশি দ্বিতীয়, তৃতীয় প্রভৃতি দরদাতা কোম্পানির জন্য ক্ষেত্র বিশেষে টন প্রতি ২০ ডলার থেকে ১৫০ ডলার বা তারও বেশি ব্যবধানে সার সরবরাহের সুযোগ তৈরি হত। এতে সরকার বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ঘটত বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য।
মন্ত্রণালয়ের সার বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আগের নিয়ম বাদ দিয়ে নতুন পদ্ধতিতে আমরা সরকারের ৩২১ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছি। আগের নিয়মে ফাঁকি ছিল। একই সার একই দরপত্রে বিভিন্নভাবে বাড়তি দরে সরবরাহ করার সুযোগ পেতে বেসরকারি আমদানিকারকরা। ফলে তারা কয়েকজন মিলে সিন্ডিকেট হয়ে যেত।”
তার ভাষ্য, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেবল সর্বনিম্ন দরে সার সরবরাহে সম্মতি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রয়াদেশ দেওয়ার উদ্যোগ নেয় যা গত অর্থ বছর থেকেই তা কার্যকর করা হয়।
সবশেষ দরপত্রে প্রতিটন ডিএপি সার চীনের জন্য ৮৪৮ ডলার, রাশিয়ার জন্য ৮৬৫ ডলার, মরক্কো, জর্ডান ও মিশরের জন্য ৮৭৪ ডলার ঠিক করা হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, অবস্থান ও দূরত্বের কারণে বিভিন্ন দেশ থেকে সার আনার জাহাজ ভাড়া কম বেশি হয়ে থাকে বলে একই সারের সিএফআর মূল্য একই সময়ে দেশভেদে ভিন্ন হয়। এ নিয়ে ‘বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই’।