Published : 05 Sep 2025, 01:49 AM
দেশের যে পাঁচ দুর্বল ব্যাংক মিলে শরিয়াভত্তিক বৃহৎ ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা কি চলমান সংকট কাটিয়ে অগ্রগামী হতে পারবে?
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলছেন, সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকটি শক্তিশালী হবে, গ্রাহকও সময় মত টাকা ফেরত পাবেন। আর বিদ্যমান কর্মীদের চাকরি হারাতে হবে না।
এই উদ্যোগ যদি লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থও হয়, তবু গ্রাহক টাকা ফেরত পাবেন– এ ভাবনায় অনেকটা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন আর্থিক খাতের অনেকেই। বর্তমানে দুর্বল পাঁচ ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে; গ্রাহকদের প্রয়োজন মত টাকা ফেরত দিতে পারছে না।
কয়েকজন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, সরকারের নেওয়া উদ্যোগ সফল হলে তা ব্যাংকিং খাতের জন্য ইতিবাচক ও উদাহরণ হিসাবে কাজ করবে।
একীভূতকরণ পরিকল্পনার আওতায় থাকা ব্যাংকগুলো হচ্ছে- এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত একীভূত ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মূলধন হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকা দেবে সরকার। বাকি ১৫ হাজার কোটি আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে আসতে পারে। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
একীভূতকরণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে গত মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার পাঁচ ব্যাংকের পর্ষদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈঠক করেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেন, অসুস্থ থাকায় গভর্নর ভার্চুয়ালি এসব বৈঠক সেরেছেন।
“পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক মার্জড হতে চাচ্ছে না। এজন্য গভর্নর স্যার তাদের কাছে কিছু বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন, যেটা পরবর্তীতে তারা দেবেন। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
একীভূতকরণ উদ্যোগ এখনো বহাল আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তাদের মার্জ করার প্ল্যানেই আছে বাংলাদেশ ব্যাংক।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পরিবর্তন হলে ব্যাংক খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে আলোচিত পাঁচ ব্যাংকে আসে নতুন পর্ষদ। তার আগে এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী এস আলমের হাতে।
এ দুই ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় ব্যাংকগুলো থেকে ‘লাখ লাখ কোটি’ টাকা পাচার হয় বলে ভাষ্য গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের। এসব ব্যাংক সংস্কারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠন করে টাস্কফোর্স; আর ‘প্রকৃত’ আর্থিক চিত্র জানতে বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে করা হয় নিরীক্ষা।

আর্থিক যে ক্ষত বের হল
আলোচিত পাঁচ ব্যাংকের তারল্য ঘাটতি, প্রভিশন পার্থক্য এবং সম্পদের মান কমে যাওয়াসহ সার্বিক বিষয়ে একিউআর (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকের কাছে মোট আমানত রয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। খেলাপির পরিমাণ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা; মানে ঋণের ৭৭ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা ইউনিয়ন ব্যাংকের; এর ঋণের ৯৭ দশমিক ৮০ শতাংশই খেলাপি। তার মানে ১০০ টাকা ঋণ দেওয়া হলে বর্তমানে ৯৭ দশমিক ৮০ টাকাই খেলাপি হয়েছে। রয়েছে ২৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) সংরক্ষণের ঘাটতি।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ব্যাংকটির ঘাটতি রয়েছে ৪৫ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকার।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৫ শতাংশ। রয়েছে ১০ হাজার ৯৫ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ঋণের ৬২ দশমিক ৩০ শতাংশই খেলাপি। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ২১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।
আর এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে। ব্যাংকটিতে ১৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে বিভিন্ন হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) কেটে রাখতে হয়। তবে খেলাপি হলে এর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের হার বেশি ধরা হয়।
নিয়মিত বা অশ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে শূন্য দশমিক ২৫ থেকে ৫ শতাংশ, খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হলে নিম্ন বা সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কু-ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।
ঋণ খেলাপি হলেও ব্যাংকটি যেন আর্থিকভাবে চরম ঝুঁকিতে না পড়ে, আমানতকারীদের অর্থ প্রাপ্তিতে সমস্যা না হয়, ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা ও ব্যাংকের ক্রেডিট রেটিং মূল্যায়ন করতে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়মটি অনুসরণ করা হয় আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং রীতি মেনে।
প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে ব্যাংকের ক্রেডিট রেটিং কমে গিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যে খরচ বেড়ে যায়। ঝুঁকি বিবেচনায় আমানতকারীরা ব্যাংক বিমুখ হয়। এতে নগদ টাকার সংকটে পড়ে যায় ব্যাংকগুলো। এর ফলে আর্থিক ব্যবস্থাপনা খরচও বেড়ে যায়।

আরো সহায়তায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘না’
দুর্বল পাঁচ ব্যাংক সম্প্রতি আরো সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে এক্সিম ব্যাংক। তবে একীভূতকরণ উদ্যোগের মধ্যে সেই আবেদনে সাড়া দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংক সংস্কারের জন্য গঠিত টাস্কফোর্সের এক সদস্য বলেন, “৫ অগাস্টের পর এসব ব্যাংকের অবস্থা আরো বেশি অবনতি ঘটে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিভিন্ন সময় তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে সেই অর্থ এখনো এসব ব্যাংক ফেরত দিতে পারেনি। উল্টো এসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে টাকা ধার চাইছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখাপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সামনে যেহেতু এসব ব্যাংকে একীভূত করা হবে, তাই এক্সিম ব্যাংকে আর তারল্য সহায়তা দেওয়া হবে না। কারণ এটা মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এক বছর ধরে এসব ব্যাংকে নানা সময় তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে আর্থিক অবস্থার সেভাবে উন্নতি ঘটেনি। আবার তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তারল্য সহায়তা চেয়েছে; আবার এদের মধ্যে দুটি ব্যাংক একীভূত হতে চায় না।
একীভূত হতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বপন সম্প্রতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে এক্সিম ব্যাংকের সকল সূচক অন্য চার ব্যাংকের তুলনায় ভালো। তাই আমরা সেসব ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হতে চাচ্ছি না। গভর্নরকে আমরা সেটা জানিয়েছি।”
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে একটি ব্যাংক গঠন করা গেলে তা বর্তমান অবস্থা থেকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে যাবে বলে মনে করছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বর্তমানে ব্যাংকগুলোর অবস্থা অনেক খারাপ। যদি মার্জ (একীভূত) করা হয়, তাহলে এখনের থেকে অবস্থা ভালোর দিকে যাবে। কারণ সরকার এতে ফান্ড ইঞ্জেক্ট করছে। তাছাড়া ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করাই প্রধান দায়িত্ব।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ব্যাংকগুলো এখন যেভাবে চলছে, তা আসলে ঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। কারণ এভাবে টাকা ছাপিয়ে বারবার ধার দেওয়া হলেও কোনো অবস্থার আসলে উন্নতি হয়নি।”
পাঁচ ব্যাংক মিলে একটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক গঠনের উদ্যোগকে ‘তত্ত্বীয় বিষয়’ হিসেবে দেখছেন সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়ার ফাউন্ডেশনের রিসার্চ বিভাগের পরিচালক মাজেদুল হক।
এ অর্থনীতিবিদ বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ একীভূতের উদ্যোগ নিয়ে বিফল হলেও অনেক দেশ কিন্তু সফল হয়েছে।
“জাপান ও গ্রিসে যখন এ মডেল সফল হয় নাই, তখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মার্জ করলে খুব একটা সফল হয় না।”
তিনি বলেন, “আমরা যে মডেল করতে চাচ্ছি, তা হাইপোথিটিকাল। এটা সফল হওয়ার সম্ভবনা ৬০ শতাংশ, যা গভর্নর হয়তো মনে করছেন। যদি গুড গভার্নেন্স নিশ্চিত করা যায়, পলিটিক্যাল সরকারের সদিচ্ছা থাকে, তাহলে সংস্কারের যে কাজ- তার ফলাফল ভালো হবে।”
মাজেদুল হক বলেন, “সফলও হতে পারে, ব্যর্থও হতে পারে। তবে একীভূত হওয়ার পর গ্রাহকরা তাদের টাকা ফেরত পাবেন।
“কারণ এ ব্যাংকটির মালিকানায় যাচ্ছে সরকার। তাই একীভূত হওয়ার পর তা মূল উদ্দেশ্যতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলেও গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাবেন।”
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, “একীভূত করা হলেও বর্তমান অবস্থার চাইতে তা ভালো হবে। তাতে আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে।”

গভর্নরের ভাবনা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পাঁচ ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর তা একটি ‘শক্তিশালী’ ইসলামি ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হবে। বিদ্যমান যে কোনো শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের চেয়ে তা বড় হবে। আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে, গ্রাহকরা ফিরে পাবেন তাদের আমানত।
তার ভাষ্যে, “শক্তিশালী ব্যাংক হবে, বড় ব্যাংক হবে। সবচেয়ে বড় ক্যাপিটাল নিয়ে ব্যাংক হবে। তাতে কারো কোনো ধরনের অসুবিধা হবে না। গ্রাহকরা সময় মতো টাকা ফেরত পাবেন।
“আমরা যে পরিকল্পনা নিয়েছি তা সবচেয়ে বড় ব্যাংক হবে, এটার ক্যাপিটাল হবে সবচেয়ে বেশি ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই ৩৫ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে পেইড আপ ক্যাপিটাল (পরিশোধিত মূলধন)।”
এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, “একীভূত হওয়ার পর এনপিএল (নন পারফর্মিং লোন) বড় থাকবে, সেটা তো ওভারনাইট শেষ হয়ে যাবে না। ওটা আস্তে আস্তে কমতে থাকবে। নতুন ডিপোজিট বাড়তে বাড়তে তা ছোট হয়ে যাবে।”
আহসান এইচ মনসুর বলেন, “একীভূত হওয়ার দুই থেকে তিন বছরের মধ্যই চেষ্টা করব বেসরকারিকরণ করতে। যেসব খেলাপি ঋণ আছে, সেগুলোর ভ্যালু থাকলে প্রতিষ্ঠান (অ্যাসেট কোম্পানি) কিনে নিতে পারবে। আর না হলে রাইট অফ (অবলোপন) করতে হবে “
বিদেশি বিনিয়োগকারী নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “একীভূত করার পর ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের’ চাইতেও বড় ব্যাংক হবে এটি। ক্যাপিটাল নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না। গ্রাহকরা তাদের টাকা সময় মতো ফেরত পাবেন।”