তেলের মূল্যবৃদ্ধি: পণ্য পরিবহনে ভাড়া ‘লাগামছাড়া’
“এক লাফে এত টাকা বেশি গেল; সব খরচা তো মালের ওপর যাইব,” বলেন এক ব্যবসায়ী।
যশোর থেকে ঢাকায় সবজি পরিবহনে মঙ্গলবার ৩১ হাজার টাকা ট্রাক ভাড়া দিয়েছেন আড়তদার আমির হোসেন; যদিও দুদিন আগেও লাগত ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হচ্ছে তাকে। ২২ হাজার টাকার হিসেবে এই রুটে পণ্য পরিবহনে ভাড়া বেড়েছে ৪০ শতাংশ।
রোববার রাতে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর থেকেই পণ্য পরিবহনে ভাড়া বেড়ে গেছে। নির্দিষ্ট করে ভাড়া কত শতাংশ বাড়বে, সেটি ঠিক না হওয়ায় যে যার মত ভাড়া নিচ্ছেন ট্রাক, লরি, পিকআপ ও কভার্ড ভ্যান মালিকরা।
ব্যবসায়ী আমির হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এক লাফে এত টাকা বেশি গেল। সব খরচা তো মালের ওপর যাইব। এখন খরচা বেশি হইলেও সেইভাবে দাম বাড়ানো যাইব না। কম লাভে মাল ছাইড়া দিতে হবে।”
তার কথায়, তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ করে সবজির দাম বাড়ালে বিক্রি কমে যাবে। ধীরে ধীরে মূল্য সমন্বয় করে দাম বাড়ানোর পথে হাঁটবেন ব্যবসায়ীরা।
তেলের নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এরপর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীতে পণ্য পরিবহনে ট্রাক, লরি, পিকআপ ও কভার্ড ভ্যানের ভাড়া ২ থেকে ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা।
মঙ্গলবার টাঙ্গাইল থেকে যাত্রাবাড়ীতে কাগজের ব্যবহৃত কার্টন নিয়ে আসা ট্রাকচালক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, “আমরা মাসওয়ারি চুক্তিতে ভাড়ায় চলি। এখন তেলের দাম বাড়ায় ২ হাজার টাকা ভাড়া বাড়িয়েছে মালিক।
“আগে ১০ হাজার টাকায় মাল নিয়া ঢাকায় আসতাম, আপাতত ১২ হাজার টাকা। সবাই কত বাড়ায় তা দেইখা মালিক একটা রেট ঠিক করব।”
খাদ্যশস্য, শাকসবজি, কাঁচামাল, মৌসুমী ফল, প্রক্রিয়াজাত খাবার, চাল-ডাল-তেলসহ সব ধরনের কৃষিপণ্য এবং ভোগ্যপণ্য পরিবহন হয় দৈনিক ভিত্তিতে।
ঢাকা-বগুড়া রুটে পণ্য পরিবহনে আগে ২০-২২ হাজার টাকা লাগলেও এখন ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাগার কথা বলছেন তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড এলাকার চালক আসলাম হক।
তিনি বলেন, “আমরা তো ভাড়া নেই না, মালিক ঠিক করে। আমরাও অনেক সময়ে ঠিক করে মালিককে জানাই। বগুড়া ট্রাক নিতে এক ট্রিপে ৩০ হাজার টাকার নিচে সম্ভব না।”
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী ট্রাকচালকদের একজন মোখলেছুর রহমান বলেন, একবার যাতায়াতে ট্রাক ভেদে ডিজেল খরচ হয় ১০০-১১০ লিটার। সে হিসাবে ডিজেল খরচ বেড়েছে ২ হাজার টাকা বা তার বেশি।
যদিও এই পথে পণ্য পরিবহনে ভাড়া ৩০-৩১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়ে গেছে ৩৮ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
চট্টগ্রাম থেকে স্টিলের পণ্য নিয়ে মঙ্গলবার ভোড়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে আসা ট্রাকচালক আব্দুল মান্নান বলেন, “ভাড়া তো মালিক নেয়। আগে ২৮-৩০ হাজার টাকা নিত, এখন ৩৫ হাজার টাকা নিচ্ছে। অনেকে ট্রাক রাস্তায় নামাচ্ছে না, তাই ট্রাকও কম।”
মুগডাল ও মসুর ডাল জাতীয় পণ্যর পাইকারি ব্যবসায়ী রহিম উদ্দিন বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় মাল আনতেই ট্রাক প্রতি ৫-৬ হাজার টাকা বেড়েছে, তেলের দাম যা বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি বেড়েছে ভাড়া।”
রোববার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সময় ভোলায় ছিলেন ট্রাকচালক আলাল মিয়া। মালামাল নিয়ে ঢাকায় আসেন মঙ্গলবার দুপুরে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “তেলের দাম বাড়ছে—এখন ভাড়া তো বাড়বে। আগে তো ৪০ হাজার টাকা নিত এক ট্রিপে, এখন তো ৪৫ হাজার টাকা নিছে মালিক।
“বাজার বুঝে ভাড়া ঠিক হবে, আরও কয়েক দিন লাগবে।”
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ভাড়া নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত ৮ ফুট দৈর্ঘ্যর পিক-আপ ভ্যান চালানো বন্ধ রাখার কথা বললেন যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজারে পণ্য পরিবহনকারী লিখন হোসেন।
তার কথায়, “ভাই, কাস্টমারের সঙ্গে চেঁচামেচি করা লাগবে। আগে সবাই বুঝুক, জানুন, ভাড়া বাড়তেছে। আমিও দেখি কত বাড়ানো লাগবে, তারপর গাড়ি নামাব।”
