পৌনে ৬০০ টাকার মাল্টা এখন ৪০০ টাকায়
“মোকামে দাম বেশি রাখলে তো আমাগো করার কিছুই নাই; মোকামে কমলে আমরাও কমামু,” বলেন এক বিক্রেতা।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে মাল্টার দাম প্রতি কেজি পৌনে ৬০০ টাকায় উঠলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে দাম কমে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় মিলছে রাজধানীতে।
আমদানিকারকরা বলছেন, সেপ্টেম্বরে বন্দরে জাহাজ এসেছে কম। সরবরাহ ঘাটতির কারণে দাম চড়ে যায় আমদানি নির্ভর এ ফলের।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বন্দরে জাহাজ আসতে দেরি হয়েছিল গত মাসে। এ মাসের শুরুর দিকেও জাহাজ কম আসে। আবার যে কয়টি আসে তাতে গ্যাপ হয় অনেক বেশি।”
চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন মাল্টার ৩০টির মতো কনটেইনার নামলেও সেপ্টেম্বরে তা কমে অর্ধেকে নামার কথা বলেন সিরাজুল ইসলাম।
তার কথায়, “আগে জাহাজ সিঙ্গাপুর রুট ধরে আসত। সেখানে ফুয়েলিং হত। হঠাৎ সেই জাহাজ সিঙ্গাপুর থেকে আবার শ্রীলংকা যাওয়া শুরু করে। সেখান থেকে বাংলাদেশে আসে ভারত হয়ে।’
“এই যে অতিরিক্ত সময় লেগেছিল, তাতেই বড় একটি ব্যবধান তৈরি হয়। সময়ের ব্যবধান কমেছে পথে থাকা জাহাজগুলো একের পর এক আসতে থাকায়। এলসি নিয়ে কোনো সমস্যা নাই। এখন সাপ্লাই চেইন ঠিক হয়ে যাবে।”
রাজধানীর সবচেয়ে বড় ফলের আড়ত বাদামতলীতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি করা প্রতি কার্টন (১৫ কেজি) মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ১০০ টাকা থেকে ৪ হাজার ৪০০ টাকায়।
এ হিসাবে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি মাল্টার দাঁড়ায় ২৭৪ টাকা থেকে ২৯৪ টাকা। এর সঙ্গে শ্রমিক মজুরি, পরিবহন, বিনিয়োগ ব্যয় ও দোকান ভাড়া যোগ হয়।
বাদামতলীর সিফাত এন্টারপ্রাইজের বিক্রয় কর্মী রাকিব হোসেন বলেন, “এক কার্টুন ৪ হাজার ৩০০ টাকা বিক্রি করছি। অনেক মাল্টা আছে এখন। কয়দিন আগে তো ৭ হাজার টাকা, কোনো সপ্তাহ সাড়ে ৭ হাজার টাকাও বিক্রি করছি।”
বাদামতলী থেকে আনা এসব মাল্টা গুলিস্তানে খুচরায় প্রতি কেজি ৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ।
তিনি বলেন, “ভাই আমাগো তো কেনাবেচার ব্যবসা। মোকামে (আড়ত) দাম বেশি রাখলে তো আমাগো করার কিছুই নাই। মোকামে কমলে আমরাও কমামু।”
যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায়ও প্রতি কেজি মাল্টা ৪০০ টাকা বিক্রির কথা তুলে ধরে ব্যবসায়ী জুনায়েদ মুন্সী বলেন, “কেউ বেশি নিলে, মানে দুই কেজি নিলে ৩৯০ টাকাও বেচি, আবার ৩৮০ টাকাও বেচি। সব কাস্টমার বুইঝা।”
টিকাটুলিতে মাল্টা কেনার সময় নিঝুম সিকদার নামে এক ক্রেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘বড় সাইজগুলো নিলাম। এক কেজির দাম রাখল ৩৯০ টাকা।”
রোগী দেখতে যাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিদেশি ফল না নেওয়াটা এখন অস্বস্তিকর হয়ে গেছে। রোগীর খোঁজখবর নিতে দুয়েক পদের বিদেশি ফল নিতেই হয়।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘিরে ওষুধের পাশাপাশি ফলের দোকানও বসে অনেক। হাসপাতালটির নতুন ভবন লাগোয়া ফুটপাতে ৩৮০ টাকা করে এক কেজি মাল্টা বিক্রি করছেন বিক্রেতা আবুল হোসেন।
মতিঝিলে বাসায় ফেরার পথে বুধবার দরদাম করে ৩৮০ টাকায় মাল্টা কিনলেন ব্যাংকার হাসিবুর রহমান।
তিন কেজি মালটার দর মিটিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ছোটো ছেলেটার জন্য নিলাম। হালকা মিষ্টি হলে ওকে খাওয়ানো যায়, পছন্দও করে। এখন চারিদিকে ডেঙ্গুর ভয়। তাই একটু বাড়তি যত্নও তো নিতে হয়।”
বাদামতলীর পাইকারি ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ মহসিন বলেন, বাংলাদেশে যে জিনিসের দাম একবার বাড়ে তা আর সেই জায়গায় আসে না। সিন্ডিকেট দৌরাত্ম্য হোক বা বস্তবিক কোনো দুর্যোগেই পণ্য মূল্য বৃদ্ধি পেলে আগের স্থানে ফিরে যাওয়ার নজির অতীতে দেখা যায়নি।
মাল্টার দাম নিয়ে তিনি বলেন, “বাজারে তো সিন্ডকেট আছেই। সুযোগ পাইলে দাম বাড়ায়, মাল আটকাইয়া দাম বাড়ায়। এইটা কেডা দেখব। কাঁচামালের দাম ঠিক রাখা কঠিন।”
বাংলাদেশে বছরে মাল্টার আমদানির বাজার সাধারণত দেড় লাখ টন। মাল্টা আমদানিতে মোট শুল্ক ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ শুল্ক পরিশোধ করে ২০২৫ সালে মোট এক লাখ ৫৭ হাজার ২৮৬ টন আমদানি করা হয়। এ হিসাবে প্রতি মাসে আমদানি হয় ১৩ হাজার ১০৭ টন মাল্টা।
চলতি বছরের নয় মাসে আমদানি হয় ১ লাখ ৭ হাজার ৩০ টন। সে হিসাবে প্রতি মাসে আমদানি করা হয়েছে ১১ হাজার ৮৯২ টন।
