ব্রয়লার মুরগি: ভোক্তা কিনছে ১৮০ টাকায়, খামারিরা পাচ্ছেন কত?
“সরকারের কারো কোনো মাথা ব্যথা আছে বলে আমরা দেখছি না,” বলেন ক্যাব সভাপতি সফিকুজ্জামান।
রাজধানীর বাজারগুলোতে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। এখান থেকে খামারিরা কত পাচ্ছেন? বাকিটা যাচ্ছে কার কার পকেটে?
দেশের নানা প্রান্তের কয়েকজন খামারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করছেন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায়। এরপর আড়ত, পাইকার, খুচরা বিক্রেতার দোকান ঘুরে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়।
তাহলে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে খামারির কত খরচ পড়ছে?
মফিজুলদের হিসাবের খাতা
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার খামারি মফিজুল ইসলাম মল্লিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তার খামারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব দিয়েছেন। তাতে তার খরচ পড়ছে ১৭১ টাকা।
কীভাবে এত খরচ হচ্ছে? মফিজুলের হিসাবের খাতা বলছে, একদিন বয়সের এক হাজার ব্রয়লারের বাচ্চা ৩৫ দিন পালন করে বিক্রিযোগ্য করতে মোট খরচ ৩ লাখ ৮ হাজার ৫০০ টাকা।
প্রতিটি বাচ্চার দাম পড়ে ৫০ টাকা। অর্থাৎ এক হাজার বাচ্চার দাম ৫০ হাজার টাকা। ৫০ কেজির এক বস্তা খাবারের দাম ৩ হাজার ৯০০ টাকা। এক হাজার মুরগির জন্য ৩৫ দিনে ৫৫ বস্তা খাবারের প্রয়োজন হয়; খরচ পড়ে ২ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ টাকা। ওষুধ বাবদ খরচ ১৩ হাজার টাকা।
এছাড়া লিটার তৈরির (মেঝেতে বিছানো) জন্য ৩৫ দিনে ভুসির প্রয়োজন হয় ৪ হাজার ৫০০ টাকার। শ্রমিকের মজুরি ১৫ হাজার টাকা, পরিবহন খরচ ৫ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিল ৩ হাজার ৫০০ টাকা ও অন্যান্য খরচ হয় ৩ হাজার টাকা।
বিক্রি হওয়ার আগ পর্যন্ত এক হাজার মুরগির মধ্যে রোগসহ বিভিন্ন কারণে ৪০ থেকে ৫০টি মারা যায়। গড়ে ৯৫০টি মুরগির প্রতিটির ওজন ১ দশমিক ৯ কেজি ধরে ১ হাজার ৮০৫ কেজির উৎপাদন হয়। অর্থাৎ এক কেজি মুরগি উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ১৭০. ৯১ টাকা।
মফিজুল মল্লিকের উৎপাদন খরচ ও বিক্রির আয়ের মধ্যে প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ পার্থক্য ৩১ টাকা। তার হিসাবে এ টাকাটি লোকসানের খাতায় চলে যাচ্ছে।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার হুগলি গ্রামের খামারি ইমরান হোসেনের দাবি, মধ্যস্বত্বভোগী, তার ভাষায় ডিলারের কাছে মুরগি বিক্রি করেন প্রতি কেজি ১৩০ থেকে ১৩২ টাকা দরে। কখনো কখনো ১৪০ টাকাও পান।
এই দামে বিক্রি করলে যে তার লোকসান হচ্ছে, সে কথা তুলে ধরে এই খামারি বলেছেন, বাজারে মন্দা এবং গরমে মুরগি মারা যাওয়ায় তিন সপ্তাহ আগে মাইকিং করে প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে মুরগি বিক্রি করেছেন। তাতেও তার প্রায় ৪৯ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।
ইমরান বলেন, ওই ব্যাচে তার মুরগি ছিল ৭০০টি। সেখান থেকে ৭০-৮০টি বড় মুরগি মারা গেছে।
উৎপাদন খরচ ও বিক্রির আয়ে ব্যবধান তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার উৎপাদন খরচ থেকে প্রায় প্রতি কেজিতে ২৫ টাকার ওপরে লোকসান দিছি।”
লোকসানের কারণে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন দাবি করে এ উদ্যোক্তা বলেন, “অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করছি, করপোরেট সিন্ডিকেট আমরা ভাঙতে পারি নাই কখনো।”
বাচ্চা ও খাবারের দাম কতটা বাড়তি?
বাজারে তিনটি কোম্পানির প্রত্যেকের দুই ধরনের মুরগির বাচ্চা পাওয়া যাচ্ছে। ১৮ অক্টোবর কাপ্তান বাজারে পাইকারিতে ‘কাজী রস’ ব্র্যান্ডের ‘এ’ গ্রেডের মুরগির বাচ্চা বিক্রি হয় প্রতিটি ৪৫ টাকা দরে, ‘বি’ গ্রেডের বাচ্চা ৩৩ টাকা। প্রভিটার ‘এ’ গ্রেডের ৪৩ টাকা, ‘বি’ গ্রেডের ৩৮ টাকা এবং প্যারাগনের ‘এ’ গ্রেডের ৪৩ টাকা ও ‘বি’ গ্রেডের ৩৬ টাকায় বিক্রি হয়।
প্রান্তিক খামারিদের আরও ২ থেকে ৩ টাকা বেশি দামে কিনতে হয় এ বাচ্চা।
চলতি মাসের শুরুতে প্যারাগনের ‘বি’ গ্রেডের এক হাজার বাচ্চা কিনেছিলেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার জলদী এলাকার খামারি জিতু কর্মকার।
স্থানীয় আল-আমিন ট্রের্ডাস থেকে বাচ্চা কেনার রশিদে দেখা যায়, প্রতিটির দাম পড়েছে ৪০ টাকা। অর্থাৎ পাইকারি দামের তুলনায় ৪ টাকা বেশি।
পাঁচ মাস আগে মে মাসের রশিদে দেখা গেছে, একই মানের প্রতিটি বাচ্চা কিনতে তার খরচ হয়েছিল ২৬ টাকা। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রতি বাচ্চায় ১৪ টাকা বেশি গুনতে হয়েছে।
বিক্রিযোগ্য করে তুলতে ব্রয়লার মুরগির চার ধাপে খাবার প্রয়োজন হয়। প্রি-স্টার্টার (৭ দিন বয়স), স্টার্টার (৮ থেকে ১৪ দিন), গ্রোয়ার (১৫ থেকে ২৮ দিন), ফিনিশার (২৯ থেকে ৪২ দিন)।
পোল্ট্রি খাদ্যের পাইকারি বাজার ঢাকার নিমতলী সিটি করপোরেশন মার্কেটে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোম্পানিভেদে স্টার্টার ও গ্রোয়ার খাদ্যের দাম ৫০ কেজির বস্তা ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। এর থেকে ৮০ থেকে ১০০ টাকা বেশি পড়ে প্রি-স্টার্টারের দাম। ফিনিশারের দাম ৩ হাজার ৫০ টাকা থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকা।
বাঁশখালীর জিতু কর্মকার একই দোকান থেকে দুই সপ্তাহ আগে আট বস্তা স্টার্টার ও গ্রোয়ার কিনেছিলেন। দোকান থেকে রশিদে দেখা যায়, প্রতি বস্তায় দাম পড়েছে ৩ হাজার ৭২৫ টাকা।
অথচ গত ১৭ মের রশিদ বলছে, একই মানের প্রতি বস্তা খাদ্য তিনি কিনেছিলেন ৩ হাজার ৫০০ টাকায়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জিতু বলেন, “আমাদের সঙ্গে পরিচিতির কারণে সবসময় বস্তায় ১০০ টাকা কম রাখে। অন্যদের কাছ থেকে আরও বেশি রাখে।”
ঢাকার কেরাণীগঞ্জের আঁটিবাজারের মুরগির খাদ্যের খুচরা বিক্রেতা দ্বীন ইসলাম বলেন, কয়েকমাসের মধ্যে বস্তায় ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভুট্টার দাম কেজিতে প্রায় ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ টাকা হয়েছে।
ভুট্টা বা চালের খুদ, সয়াবিন মিল, রাইস পলিশ হল মুরগির খাবার তৈরি প্রধান কাঁচামাল। এসব কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে মুরগির খাবারের দাম বাড়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ফিড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (এফআইএবি) এর সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ারুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সয়াবিন মিল ও ডিওআরবি (চালের কুঁড়া থেকে তেল নিষ্কাশনের পর অবশিষ্টাংশ) এর দাম ২০ থেকে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া কিছু কিছু খাদ্য উপকরণের দাম প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে খামার ও খাদ্য তৈরির কারখানার পরোক্ষ খরচও বেড়েছে গেছে।
মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে কত যাচ্ছে?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৬ অক্টোবর মধ্যস্বত্বভোগীরা খামারিদের কাছ থেকে প্রতি কেজি মুরগি কিনেছেন ১৩২ টাকায়। কারওয়ান বাজারের আড়তে ওই মুরগি তারা দিয়েছেন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা কেজি দরে।
আড়ত থেকে পাইকারি বাজারে যেতেই মুরগির দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা।
সে দিন কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের পাইকারি বিক্রেতা মায়ের দোয়া চিকেন ব্রয়লার হাউজের স্বত্বাধিকারী রাশেদ আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, পাইকারিতে বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ১৬৫ টাকা করে। খুচরা ১৮০ টাকা।
পাইকারির পাশাপাশি খুচরাও বিক্রি করেন তিনি। তার ভাষ্য, “এত বাড়ত না। তেলের দাম একটু বাড়ার অজুহাতে দাম বাড়ছিল। উৎপাদনও আগের মতো নাই।”
সোমবার সকালে রাজধানীর পাইকারি মুরগির বাজারে কাপ্তান বাজারে গিয়ে জানা যায়, বড় (দুই কেজি ২০০ গ্রামের বেশি) ব্রয়লার মুরগির প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৫৮ টাকায়। আর মাঝারি (দেড় থেকে দুই কেজি) ১৫০ থেকে ১৫৪ টাকায়।
কাপ্তান বাজারের মুরগি পট্টির আড়তদার সততা পোল্ট্রি হাউজের স্বত্বাধিকারী মো. আকাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডকটমকে বলেন, তারা খামার থেকে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা কেজি দরে মুরগি কেনেন।
তাহলে খুচরায় ১৮০ টাকা কেন? জবাবে নরসিংদী গিয়ে বা লোক পাঠিয়ে মুরগি আনার খরচ ও ওজনে ঘাটতি হওয়ার যুক্তি দেখালেন আকাশ।
তার দাবি, ১৩০ টাকা কেজি দরে মুরগি কিনে পিকআপে ঢাকায় আনতে গাড়ি ভাড়া দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। একটি পিকআপে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ কেজি পর্যন্ত মুরগি আনা যায়। খামার থেকে দুই হাজার কেজি মুরগি কাপ্তান বাজার পর্যন্ত আনতেই ১০০ কেজি ওজন কমে যায়। গাড়িতেই মরে যায় অনেকগুলো। পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের ক্ষেত্রেও এরকম ঘটে।
স্থানীয় খামারিদের কাছ থেকে মুরগি কিনে (প্রান্তিক খামারি ও ব্যবসায়ীদের ভাষায় ডিলার) ঢাকার পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন ময়মনসিংহের ভালুকার খলিল মিয়া।
তার দাবি, প্রান্তিক খামারির কাছ থেকে যে মুরগিটা ১৩০ থেকে ১৩২ টাকা কেজি দরে কিনেছেন সেটা পাইকারের কাছে বিক্রি করেছেন ১৩৮ টাকা।
খলিল বলছেন, একসময় যেখানে ভালুকায় প্রতি ব্যাচে ৫০ হাজার মুরগি উৎপাদন হতো, লোকসানের কারণে তা এখন নেমে এসেছে মাত্র ৫ হাজারে।
তিনি বলছেন, “খামারিরা তো দাম পায় না।”
প্রান্তিক পর্যায়ে উৎপাদন কমে যাওয়ায় মুরগির সংকট তৈরি হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করে খলিল বলেন, “প্রান্তিক খামারিরা শূন্য হয়ে পড়লে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সেই সুযোগ কাজে লাগায়।”
উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন ঢাকার কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক মো. রেজওয়ান হোসেন খান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ব্রয়লার মুরগির প্রকৃত উৎপাদন খরচ প্রতি কেজিতে ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা। তারা ১০ টাকা লাভে বিক্রি করবে, এটা অন্যায় কিছু নয়।
উৎপাদক থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত কয়েক দফা হাতবদলের ফলে দাম বাড়ে বলে মন্তব্য করে রেজওয়ান হোসেন বলেন, “এখানে অনেকগুলো ধাপ আছে আড়তদার, পাইকারি, খুচরা, মানে দুই তিনটা হাত হয়ে আছে।”
তিনি বলছেন, এ হাতবদলে কেউ যদি ১০ টাকা লাভ করে, আর খুচরা বিক্রেতা যদি ২০ টাকা লাভ করে তাহলে ৪০ টাকার একটা পার্থক্য এমনিতে তৈরি হয়।
কারা এ ‘ফিডম্যান’?
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী রাশেদ বলছিলেন, “আমাদের কাছে আসতে আসতে তিন চার হাত হয়ে যায়। এ কারণে মালের দাম বাইড়া যায়।
“ওই যে ফিডম্যান আছে না? যারা খাদ্য দেয়, ওরাই তো চালান দেয়। ওরা খামারিদের বলে, আমি খাদ্য দেব, বাচ্চা দেব, আপনি খামার পরিচালনা করবেন, আমি বিক্রি করব। এরকম অনেকগুলো আছে। এই সপ্তাহে বেচল না, আগামী সপ্তাহে বেচল। এভাবে দাম ওঠানামা করায়।”
তার কথিত এ ফিডম্যান কারা কিংবা চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের সেই খামারি ইমরান হোসেনের করপোরেট সিন্ডিকেটিইবা কী?
বাচ্চা, খাদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ সরবরাহ করে শর্তসাপেক্ষে স্থানীয় খামারিদের সঙ্গে চুক্তি করে প্যারাগন, কাজী ফার্মস লিমিটেডের মতো কোম্পানিগুলো।
কাজী ফার্মস প্রতি কেজি বিক্রিযোগ্য মুরগির বিপরীতে খামারির কমিশন নির্ধারণ করে দিয়েছে ১৬ টাকা ৫৭ পয়সা। ৩৫ দিনের মধ্যে কোম্পানি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডিলার বা পাইকারদের কাছে নিলামে মুরগি বিক্রি করে দেয়। উৎপাদন সাপেক্ষে কমিশন কম-বেশি হয়।
কুমিল্লা অঞ্চলে কাজী ফার্মসের অধীনে প্রায় ১০০টি চুক্তিভিত্তিক খামার চালু রয়েছে। কোম্পানির আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
ওই কার্যালয়ের একজন কমকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট্কমকে বলেন, সম্প্রতি তাদের চুক্তিভিত্তিক একটি খামার থেকে প্রতিকেজি বিক্রি করে ১৪১ টাকা দরে মুরগি বিক্রি করা হয়েছে।
২০২১ সাল থেকে ব্রয়লার মুরগির খামার চালান বরিশালের উজিরপুর রাজাপুর গ্রামের খামারি মো. ইউসুফ তালুকদার। কিন্তু কয়েকবছর চালানোর পর দেখলেন খরচ ও আয়ের ভারসাম্য থাকছেন না। সে কারণে গত বছর প্যারাগনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন।
ইউসুফ তালুকদার বলছিলেন, “আমার কাছে আর নগদ টাকা নাই বলেই তো আমি কন্টাক্ট ফার্মিংয়ে আসছি।”
তার দাবি, নগদ টাকায় খাদ্য কিনতে যেখানে তার বস্তা প্রতি ৩৬০০ থেকে ৩৭০০ টাকা খরচ হতো, সেখানে তিনি ৩১০০ বা ৩৩০০ টাকায় পাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তার সাশ্রয় হচ্ছে। লাভের হিসাব করলে এটাও সেখানে যোগ হচ্ছে।
ইউসুফের ভাষায়, প্রতি বস্তায় ৩০০ টাকা নিজের কাছে লাভ রয়ে গেল।
কিন্তু কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামানের অভিযোগ, পোল্ট্রি খাতের মূল সমস্যা করপোরেট গ্রুপগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য ও চুক্তিভিত্তিক খামার।
তিনি বলেন, “প্রত্যেকটা জিনিসই এরকম হচ্ছে। এগুলো দেখার দায়িত্ব যে সরকারের, সেটা দেখছে না। বরঞ্চ এটা আবার করপোরেট গ্রুপের হাতে চলে গেছে। তারা বাচ্চা, সবকিছু নিয়ে কন্ট্রোলে নামে।”
এ অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে লিখিত জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, করপোরেট কোম্পানির ‘ব্রয়লার কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’ এবং সামগ্রিক বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন।
তার দাবি, “করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্রয়লার কন্ট্রাক্ট ফার্মিং থেকে দেশের মোট পোল্ট্রি উৎপাদনের আনুমানিক ২০ শতাংশ আসে। বিপরীতে, উৎপাদনের বড় অংশই আসে স্বাধীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের কাছ থেকে। ফলে শুধু চুক্তিভিত্তিক খামারব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের সম্পূর্ণ ডিম-মুরগির উৎপাদন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই।”
খুচরা বিক্রেতার হিসাবটা কী?
১৯৮১ সাল থেকে মুরগির ব্যবসা করেন কেরাণীগঞ্জের আরশিনগরের বাসিন্দা সত্তোর্ধ আমিরুল ইসলাম।
তার ভাষ্য, নব্বইয়ের দশকে ব্রয়লার মুরগি মানুষ খেত না বলে চাইনিজ হোটেল সরবরাহ করতো, এখন সেই মুরগি পাইকারিতেই তিনি প্রতি কেজি কিনছেন ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায়।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলা সিটি ডেভেলপার্স হাউজিং এর ১ নম্বর গেইট থেকে ভেতরে ঢুকলে রাস্তার পাশে একটি টংঘরে এখন মুরগি বিক্রি করেন আমিরুল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, সাদেক খান কৃষি মার্কেট থেকে পাইকারি কেনেন তিনি। বৃহস্পতিবার তার কেনা পড়েছে প্রতি কেজি ১৭০ টাকা। বিক্রি করছেন ১৮০ টাকায়।
দোকান ভাড়া দিতে হয় না তুলে ধরে আমিরুল বলছিলেন, “তবু পোষায় না।”
ভোক্তা অধিকার কী বলছে?
খামার থেকে ভোক্তা পর্যায়ে আসতে এক কেজি ব্রয়লার মুরগিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক ইন্দ্রানী রায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তারা সরাসরি মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা নন।
“বাজার মনিটরিং ও বাজার অভিযানের সময় আমরা মূলত বিক্রেতা সঠিক মূল্য তালিকা প্রদর্শন করেছেন কি না, পণ্য ক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ করেছেন কি না, তা খতিয়ে দেখি। বিক্রেতা যে দামে মুরগি কিনবেন, তার সঙ্গে আনুষঙ্গিক পরিবহন ও পরিচালন খরচ হিসাব করে একটি যৌক্তিক লাভ রেখে বিক্রি করাই স্বাভাবিক নিয়ম। সেটাই দেখা হয়।”
তিনি বলেন, “সরকার যদি মূল্য বেঁধে দেয়, তবে সেই নির্ধারিত দর না মানলে আমরা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
কিন্তু বাজার তদারকিতেই জোর দিচ্ছেন ক্যাব সভাপতি সফিকুজ্জামান।
তার মতে, বাজার তদারকি থাকলে ভোক্তারা ১৫০ টাকার মধ্যেই ব্রয়লার মুরগি কিনতে পারতেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক এই মহাপরিচালক (ডিজি) বলছেন, বাজার তদারকি তো সরকারের দায়িত্ব।
“সরকারের কারো কোনো মাথা ব্যথা আছে বলে আমরা দেখছি না। এটার মানে হল যে ব্যবসায়ীরা তো এখন বাড়িয়ে যদি বিক্রি করে, কেউ তো চ্যালেঞ্জ করছে না...এটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তো অনেকগুলো ডিপার্টমেন্ট আছে।”
সফিকুজ্জামান বলেন, “লাইভস্টক মিনিস্ট্রি, তারা তো এগুলো এনালাইসিস করবে মূল উৎপাদনে কত খরচ হয় এবং কোন জায়গায় বিপণনে কোথায় কী আছে, কত হতে পারে। এটা যেমন আছে, আরেকটা হল আমাদের ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর আছে। আমাদের স্থানীয় প্রশাসন...আমাদের যেকোনো নেতৃত্ব, তারা এগুলো দেখতে পারে।”
