Published : 19 Mar 2026, 10:47 PM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে এসে ইরান তার ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক’ চালটি চেলেছে।
কোনো মিসাইল নয়, ড্রোনও নয়; কেবল একটি বাক্য, যা সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
কী বলেছেন তিনি? ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল করতে দেবে, তবে একটি শর্তে। ডলারে নয়, তেলের দাম পরিশোধ করতে হবে চীনের মুদ্রা ইউয়ানে!
ইউটিউব চ্যানেল 'প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রির'এই সঞ্চালক অধ্যাপক জুয়েকিন জিয়াং মনে করেন, ওই একটি বাক্য রণক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া গত দুই সপ্তাহের যে কোনো ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে।
কারণ ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থার জোরে গত ৫০ বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে একক আধিপত্য তৈরি হয়েছে, এটা তার ওপর ‘সরাসরি আঘাত’।
অধ্যাপক জিয়াংয়ের ভাষায়, “অনেকের কাছে 'পেট্রোডলার' কেবল একটি অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক শব্দ মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই আমেরিকার সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি।”
পেট্রোডলার ব্যবস্থার কারণেই আমেরিকা এমন পরিমাণ ঘাটতি বাজেট নিয়ে চলতে পারে যা অন্য যে কোনো দেশকে দেউলিয়া করে দিত। যুদ্ধে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরেও ডলার এখনো বিশ্বের প্রধান মুদ্রা হিসেবে টিকে আছে, কারণ বিশ্বের প্রতিটি দেশের তেলের জন্য ডলারের প্রয়োজন হয়।
“এই ব্যবস্থাটি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমেরিকার বিশ্বশক্তির ভিত্তিও ধসে পড়বে। আর ইরান সেখানেই একটি ঢিল ছুড়ে দিয়েছে,” বলেন জিয়াং।
এর গুরুত্ব বুঝতে হলে ১৯৭১ সালে ফিরে যেতে হবে। তার আগে ডলারের মান ধরে রাখার বিষয়টি সরাসরি স্বর্ণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রতিটি ডলারের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভল্টে সমপরিমাণ স্বর্ণ সংরক্ষণ করতে হত।
এরপর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সেই ব্যবস্থা বন্ধ করে দিলেন। স্বর্ণভিত্তিক নিশ্চয়তা উঠে যাওয়ার পর প্রশ্ন উঠল, তাহলে ডলারের ওপর কেন মানুষ ভরসা রাখবে?
সমাধান এল মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশ্বজুড়ে তেল সংকটের মধ্যে ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। চুক্তির শর্ত ছিল, সৌদি আরব তাদের সমস্ত তেল ডলারে বিক্রি করবে এবং বিনিময়ে আমেরিকা তাদের সামরিক সুরক্ষা দেবে।
পরে ওপেকভুক্ত দেশগুলোও সেই পথ অনুসরণ করে। ফলে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য ডলারে স্থানান্তরিত হয়। ওই চুক্তির মাধ্যমেই ‘পেট্রো-ডলার’ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়, যা বদলে দেয় পুরো পৃথিবীকে।
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তেল ছাড়া গতি নেই। আর যাদের নিজেদের অত তেল নেই, তাদের বিদেশ থেকে কিনতে হবে। আর চীন, জাপান, ভারত কিংবা জার্মানি, তেল কিনতে সবারই লাগবে ডলার।
ফলে বিশ্বজুড়ে মার্কিন ডলারের বিরাট এক চাহিদা তৈরি হল। আর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তা তুলে দিল বিশ্ব অর্থনীতি শাসন করার ক্ষমতা।
সেই ক্ষমতার বলেই যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে পারে। কিংবা বিরোধ বাধলে কোনো দেশকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে একঘরে করে দিতে পারে।
অন্যদিকে ডলারের ওই চাহিদাই যুক্তরাষ্ট্রকে সীমাহীন ঋণ নেওয়ার এবং বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখার সুযোগ করে দেয়।
অবশ্য ইরানই প্রথম দেশ নয় যারা পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করেছে। যারা সেই সাহস করেছে, সেজন্য তাদের মূল্যও দিতে হয়েছে।
২০০০ সালে সাদ্দাম হুসেইন ঘোষণা দেন, ইরাক তেল বিক্রির দাম ডলারে নয়, ইউরোতে নেবে। তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালায়। ইরাকের তেল বাণিজ্য আবার ডলারে ফিরে আসে।
লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি তেল বাণিজ্যের জন্য স্বর্ণভিত্তিক একটি প্যান-আফ্রিকান মুদ্রার প্রস্তাব করেন। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন নেটোর অভিযানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন এবং তার প্রস্তাবটিও সেখানেই শেষ হয়ে যায়।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোও ডলার ব্যবস্থার বাইরে এসে তেল বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেনা পাঠিয়ে তাকে তুলে নিয়ে গেছেন।
অধ্যাপক জুয়েকিন জিয়াং বলছেন, যুদ্ধের মধ্যে থাকা ইরান এবার ওই ঝুঁকি নিয়েছে চীনের সমর্থন নিয়ে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইতোমধ্যে ‘আইআরজিসি সার্টিফিকেট’ নামে অনুমতিপত্র দিচ্ছে, যার মাধ্যমে জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে। প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে, আর এখন তারা ঠিক করছে, তেলের জাহাজ পার করতে দাম চুকাতে হবে ইউয়ানে, ডলারে হলে চলবে না।
চীনের জন্য এটি বড় সুযোগ। বেইজিং বহু বছর ধরে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে চাচ্ছে।
বর্তমানে হরমুজ আংশিক বন্ধ থাকায় এবং প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে ওঠায়, তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর সামনে বাস্তব প্রশ্ন তৈরি হয়েছে —তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষায় থাকবে, নাকি চুপচাপ ইরানের ইউয়ান শর্ত মেনে তেল কেনা শুরু করবে?
ভারত ইতোমধ্যে তেহরানের রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে নিরাপদ যাতায়াতের আশ্বাস পেয়েছে। দেশটি এখন হিসাব কষছে—জ্বালানি আমদানি সচল রাখতে ইউয়ান শর্ত মেনে নেওয়া হবে কি না। তুরস্কও একই পরিস্থিতিতে রয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়। এই ঘাটতিই ইরানকে প্রভাব খাটানোর সুযোগ দিচ্ছে। যত বেশি সময় প্রণালি বন্ধ থাকবে, তত বেশি ইউয়ানভিত্তিক প্রস্তাব আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্র বোমা ফেলে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। চীনকে ইউয়ানে তেল কেনা থেকে বিরত রাখা কিংবা ভারতের নীরব অর্থনৈতিক হিসাব নিকাশ থামানো যুদ্ধের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
অধ্যাপক জিয়াং বলেন, অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় আগে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের একটি চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক শক্তির আর্থিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। এখন ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ এক জলপথে সেই ভিত্তির একটি অংশ নীরবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
“তেহরানের আকাশে কী ঘটছে–তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আগামী ৫০ বছর ডলারের আধিপত্য বজায় থাকবে কি না–সেই প্রশ্নের উত্তর।”