“হয়তো উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি হওয়ার কারণে এমন গ্রোথ দেখা যাচ্ছে,” বলেন প্রধান রপ্তানিপণ্য পোশাক খাতের এক রপ্তানিকারক।
Published : 05 Jun 2023, 12:05 AM
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহতের কথা কয়েক মাস ধরেই বলে আসছেন পোশাক ব্যবসায়ীরা; বলা হচ্ছিল ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কথাও। এর মধ্যে মে মাসে আগের বছরের একই মাসের চেয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ, যার পেছনে বরাবরের মতই মূল ভূমিকা রেখেছে পোশাক খাত।
আর এক মাসের ব্যবধানে গত এপ্রিলের (৩৯৫ কোটি ৬০ লাখ) তুলনায় মে মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৮৯ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। অথচ আগের দুই মাসেও রপ্তানি আয়ের চিত্রে বড় ধাক্কা লেগেছিল। হঠাৎ এ চিত্র বদলে রপ্তানির পালে হাওয়া অবাক করেছে অনেককে।
পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম রপ্তানির এ তথ্য শুনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির এই হিসাবটা আমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলছে না। কারণ আমাদের প্রত্যেকের কাছেই ক্রয়াদেশ ৫০ শতাংশের মতো নাই।”
নিজের প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি চিত্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, আগে ব্যাংকে প্রতি মাসে পাঁচ কোটি ডলারের ওপরে রপ্তানি আয় আসত। এখন মাসে তা কমে হয়েছে আড়াই থেকে পৌনে তিন কোটি ডলার।
তাহলে এই রপ্তানিটা কে করল?- এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, “আমি ঠিক এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। আমি একটু খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি।”
রোববার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, মে মাসে ৪৮৪ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে পোশাক পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪০৫ কোটি ৩২ লাখ ডলারের। অর্থাৎ ওই মাসের মোট রপ্তানির ৮৩ দশমিক ৫৮ শতাংশই পোশাক খাত থেকে হয়েছে।
মে মাসের রপ্তানির এই হিসাবে গত ২০২১-২০২২ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। ওই সময় রপ্তানি হয়েছিল ৩৮৩ কোটি ডলারের পণ্য।
পরে পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের নেতা হাতেম রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ব্যাখ্যা দেন এভাবে, “প্রথম কথা হচ্ছে গত বছর মে মাসে রোজার ঈদ ছিল। ফলে মে মাসের প্রথম ১১ দিন ঈদের ছুটির কারণে কাজ একেবারেই কম হয়েছে। ফলে ওই মাসে রপ্তানি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, গত এপ্রিলে ঈদের কারণে অনেক পণ্যের শিপমেন্ট বন্ধ ছিল। সেই শিপমেন্টগুলো এবার মে মাসে এসে হয়েছে।
“এছাড়া পশ্চিমা বিশ্বে সামনে শীত মৌসুমের কারণে এই মাসে বাংলাদেশ থেকে উচ্চ মূল্যের সোয়েটার এবং জ্যাকেটগুলো যাচ্ছে। এই তিনটা কারণেই মূলত মে মাসে রপ্তানির পরিমাণটা বড় করে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমাদের অবস্থা ভালো নয়।”
পোশাক রপ্তানিকারকদের আরেক সংগঠন বিজিএমইএর সহ সভাপতি ও ক্ল্যাসিক ফ্যাশন কনসেপ্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল্লাহ আজিমও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির একই কারণ উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “গত বছরের মে মাসে পোশাক কারখানাগুলোতে ২০ দিন কাজ হয়েছে। আর এবার মে মাসে ৩১ দিনই কাজ হয়েছে। দ্বিতীয়ত গত মাসে (গত এপ্রিল) প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ছিল। ঈদের কারণে গত মাসে বন্ধ থাকায় সেই মাসের অনেকগুলো ডেফার্ড শিপমেন্ট এই মাসে চলে এসেছে। এজন্য রপ্তানি আয় বেশি দেখা যাচ্ছে।
“আমাদের ক্রয়াদেশ বাড়ে নাই। কারখানাগুলো এখনও ৬৫ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ ক্যাপাসিটিতে চলছে। অনেকেই পারলে কারখানা বন্ধ করে দেয়-এই অবস্থা। প্রায় কারখানা এলাকায় গ্যাস নেই। ডিজেল কিনতে কিনতে আমাদের নাভিশ্বাস হয়ে গেছে। গ্যাসের প্রেসার নেই- গ্যাসের কারণে অনেকগুলো কারখানা বন্ধ অবস্থা।”
শিল্পে অগ্রাধিকার দিয়ে অনেকগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শহিদুল্লাহ বলেন, “এ কথা তিনি কেন বলছেন জানি না। ইনফ্যাক্ট গ্যাসের প্রেসার নেই। আপনি কারখানাগুলোতে খবর নিয়ে দেখেন। যেখানে ৫ পিএসআইয়ের ওপর প্রেসার না আসলে কারখানায় কাজ করা যায় না, সেখানে গাজীপুরের কারখানায় প্রেসার মাঝেমধ্যে শূন্য-এক শতাংশে নেমে আসে।”
এখন জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ অর্থাৎ তিন হাজার এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শহিদুল্লাহ বলেন, “ওগুলো সার কারখানায় যাচ্ছে, বাসাবাড়িতে যাচ্ছে। (পোশাক) কারখানায় আমরা পাচ্ছি না।”
সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে চট্টগ্রামভিত্তিক পোশাক কারখানা ওয়েল ডিজাইনার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সহ সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের কাছ থেকে যতটুকু খবর পাচ্ছি, যেটা গ্রোথ দেখা যাচ্ছে, এটা কিন্তু অরিজিনাল গ্রোথ না। কারণ এখানে হয়তো উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি হওয়ার কারণে এমন গ্রোথ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের কারখানাগুলো সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম কাজ পাচ্ছি।
“এখন কিছু জ্যাকেট ও সোয়েটারের অর্ডার আসছে। এগুলোর ম্যাটেরিয়াল ভ্যালু বেশি বিধায় এক্সপোর্ট গ্রোথ বেশি দেখাচ্ছে। কারণ গত জানুয়ারির পর থেকে আমরা মাইনাস ক্যাপাসিটিতে কাজ করছি। আগামী অগাস্ট পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি থাকবে।”
দুই মাসের ‘ধাক্কা’ কাটিয়ে মে মাসে রপ্তানিতে ‘লাফ’
কোনো কারখানা সক্ষমতার শতভাগ উৎপাদনে থাকার ধারণা কতটা যৌক্তিক, জানতে চাইলে নজরুল বলেন, “বাংলাদেশে এখন ১০০ লাইন, ৫০ লাইনের কারখানাগুলো বেশি ভোগান্তিতে আছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় বলে, বাংলাদেশে ক্যাপাসিটির তুলনায় অর্ডার সবসময় বেশি থাকতো। ২০১৯ সালে অর্ডার অনেক বেশি ছিল।
“কোভিডের পরবর্তী বছর ২০২১-২০২২ সালে ওভার ক্যাপাসিটি অর্ডার এসেছে। এরপর অনেক কারখানা ২০৩০ সালের ১০০ বিলিয়ন রপ্তানির টার্গেট করে সক্ষমতা বাড়িয়েছে।”
স্পারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, “বর্তমানে পোশাক শিল্পে কিছু উচ্চমূল্যের আইটেমের ক্ষেত্রে রপ্তানির ভালো অবস্থান আছে। এছাড়া অধিকাংশ পোশাক কারখানায় সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম অর্ডার রয়েছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুতের আসা যাওয়া ও গ্যাসের স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।”
মে মাসে পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির চিত্র
মে মাসের রপ্তানি তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজিএমইএর তরফে জানানো হয়েছে, এই মাসে ৪ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির মাধ্যমে পোশাক খাতে ২৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে। এর মধ্যে এক দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়েছে ওভেন পোশাক, প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৩.১৫ শতাংশ। নিট পোশাক ২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়েছে, প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩২.৫৩ শতাংশ।
মে মাসে ৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা থাকায় অর্জন ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ পিছিয়ে আছে।
চলতি অর্থবছরে (২০২২-২৩) ৪৬ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এরমধ্যে ১১ মাসে পোশাক রপ্তানি অর্জিত হয়েছে ৪২ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। গত বছর (২০২১-২০২২) জুলাই থেকে মে মাসের মধ্যে ৩৮ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। ফলে এবার ১১ মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
আর পোশাকখাতসহ চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে মোট রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫২ কোটি ৭২ লাখ ডলার। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। তার আগের অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৪ হাজার ৭১৭ কোটি ৪৬ লাখ ডলারের পণ্য।
২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৪.৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে রপ্তানি আয় প্রথমবারের মতো ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ৩০৪ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু আয় হয় ৫ হাজার ২০৮ বিলিয়ন। সেই রেকর্ডে ভর করে চলতি অর্থবছরে ৫৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার।