Published : 05 May 2026, 06:54 PM
পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসিতে) দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি।
তবে বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব এখনো না আসায় পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়নি বলে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে এসেছে মাত্র। এখনো কমপ্লিট না, কারণ বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব এখনো আমরা পাইনি।”
তিনি জানান, প্রস্তাব পাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী কারিগরি কমিটি সেটি যাচাই-বাছাই করবে। এরপর গণশুনানির নোটিস দিয়ে শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত হবে।
কবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, “এটা এখনো বলতে পারছি না। এটা বলা ঠিক হবে না এই মুহূর্তে। বাট এটা এক মাসের মধ্যে হবে না, মাঝখানে ঈদের বন্ধ আছে।”
এর আগে সবশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন খুচরায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পাইকারিতে ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়।
তাতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য গড়ে ৬.৭০ টাকা থেকে ৩৪ পয়সা বেড়ে ৭.০৪ টাকা হয়।
এখন ১৭ থেকে ২১ শতাংশ দাম বাড়লে প্রতি ইউনিটে দাম বাড়বে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা।
পিডিবির প্রস্তাবে কী আছে
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় পরবর্তী দুই বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ বেড়ে যায়।
সেই প্রেক্ষাপটে পিডিবি গড় পাইকারি ট্যারিফ ইউনিটপ্রতি ৫০ পয়সা, ১ টাকা এবং ১ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দেয়। এসব বিকল্পের সঙ্গে গ্রাহক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট খুচরা মূল্যও বাড়ানোর কথা বলা হয়।
গত এপ্রিলে মন্ত্রণালয়ের একটি সারসংক্ষেপধর্মী নথিতে বলা হয়, সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গড় পাইকারি ট্যারিফ নির্ধারণ করে, তবে তা পিডিবির প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের সমান ছিল না। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়, যা সরকার ভর্তুকি দিয়ে আংশিকভাবে সমন্বয় করে আসছে।
বর্তমান ট্যারিফে বিদ্যুৎ বিক্রি চলতে থাকলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি ২০ লাখ টাকা হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয় ওই নথিতে।
তবে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির কারণে গ্যাস, তেল ও কয়লা বেশি দামে কিনতে হওয়ায় এই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলে সেখানে মন্তব্য করা হয়।
পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, পাইকারি ট্যারিফ ইউনিটপ্রতি ৫০ পয়সা বাড়ালে সরকারের ভর্তুকি ৫ হাজার ২৪৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা কমবে। ১ টাকা বাড়ালে কমবে ১০ হাজার ৪৮৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আর ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমতে পারে ১২ হাজার ৫৮৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
মন্ত্রণালয়ের যুক্তি ছিল, মূল্য না বাড়িয়ে বিদ্যুতের বর্তমান সরবরাহ ধরে রাখতে গেলে ভর্তুকির চাপ দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
খুচরায় বাড়তে পারে কত
মন্ত্রণালয়ের ওই নথি অনুযায়ী, ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী লাইফলাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে কোনো মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়নি।
তবে আবাসিক শ্রেণিতে বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব ছিল। বাণিজ্যিক, শিল্প ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের জন্যও নতুন হার নির্ধারণের কথা বলা হয়।
কেন দাম বাড়াতে হবে, তার ব্যাখ্যায় নথিতে বলা হয়, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার কৃচ্ছ্রসাধন, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নানা উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে হলেও এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা সেখানে বলা হয়।
তাছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির সঙ্গে কারিগরি আলোচনা শেষে বিদ্যুৎ খাতের দক্ষতা বাড়ানো, ভর্তুকি কমানো এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিয়ে মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশ করেছিল।
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের উদাহরণও ওই নথিতে টানা হয়। সেখানে বলা হয়, শ্রীলঙ্কা আবাসিক, শিল্প ও হোটেল-সেবা খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। সিঙ্গাপুরে জ্বালানির দাম ‘পাস থ্রু’ আইটেম হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সেখানেও বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে।
মন্ত্রণালয়ের রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী, পিডিবির প্রস্তাবিত বিকল্পগুলোর মধ্য থেকে একটি এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খুচরা ট্যারিফ বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা ওই নথিতে বলা হয়।