Published : 05 Jan 2026, 10:59 PM
আগের অনিয়ম ও দুর্নীতি যাচাইয়ে পাঁচ বেসরকারি ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে কোনো তদন্ত কার্যক্রম চালাবে না। ‘ফরেনসিক অডিটের’ মাধ্যমে একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো থেকে কত টাকা, কোথায় গেছে সেটিও খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
নতুন ব্যাংকের কার্যক্রমের বিষয়ে জানাতে সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আগের পাঁচ ব্যাংকের মোট জনবলের সবাই সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংকে থাকবে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তারা বাদ পড়ে যাবেন।
‘‘আমরা একটি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করছি ফরেনসিক অডিট চালাতে। কয়েক দিনের মধ্যে তাদের সঙ্গে চুক্তি হবে।
‘‘বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো তদন্ত কার্যক্রম চালাবে না। ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে দেখা হবে আসলে টাকাগুলো গেল কোথায়। আলটিমেট বেনিফিশিয়ারি (শেষ ধাপে কারা লাভবান) কারা, তাদের বিষয়গুলো আমরা বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠাব। তারা ঠিক করবে কাদের নামে মামলা হবে, অভিযোগ গঠন হবে।’’
ফরেনসিক অডিটে অনিয়মের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেল কীভাবে দেখা হবে- এমন প্রশ্নে গভর্নর বলেন, ‘‘আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করব না। ফরেনসিক অডিটের কার্যক্রমের প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেব বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ (পাওয়া যাবে) তিনি যেই হোক, তাদের চিহ্নিত করা হবে, আইনের আওতায় আনা হবে। এটা সংস্থাগুলো করবে।’’
নবগঠিত ব্যাংকটির প্রথম দুই দিনের লেনেদেনে ১০৭ কোটি টাকা তোলা হয় এবং নতুন আমানত জমা পড়ে ৪৪ কোটি টাকা।
বর্তমানে একজন গ্রাহক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করতে পারেন। তবে নতুন জমা দেওয়া আমানতের পুরোটাই উন্মুক্ত থাকবে বলে সংবাদ সম্মেলনে বলেন আহসান মনসুর। বলেন, তারা যেকোন অঙ্কের লেনদেন করতে পারবেন।
অর্থাৎ জমা দেওয়া অর্থের মধ্যে যেকোনো অঙ্কের এমনকি পুরোটা তুলে নেওয়ার সুযোগ থাকছে নতুন আমানতের বেলায়।
একীভূত করার ক্ষেত্রে নতুন ব্যাংক নিয়ে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘অনেক রকমের শঙ্কা ও ভয়ভীতি ছিল। দেশ-বিদেশের অনেক পরামর্শক নানা আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমরা সেগুলো অতিক্রম করতে পেরেছি। আমাদের গল্পটা ইতিবাচক, এবং যে ডাটা পাচ্ছি, তা আমাদের আস্থা আরও বাড়াচ্ছে।’’
আর্থিক সংকটে জেরবার হওয়া শরিয়াহভিত্তিক এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ১ ডিসেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক।
রাষ্ট্রায়ত্ত হিসেবে যাত্রা শুরু করা এ ব্যাংকের মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা।
গত বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্কুলার দিয়ে বলেছে, ব্যাংক রেজ্যুলেশন স্কিম, ২০২৫ কার্যকর হয়েছে। পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যাদের নামে মামলা রয়েছে, তাদের ছাড়া অবশিষ্টরা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জনবল হিসেবে কর্মরত থাকবেন। এর মাধ্যমে একীভূত করার আনুষ্ঠানিকতা শেষ বলে জানানো হয়।
পুরনো আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ও নতুন আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ ঋণ নিতে পারবেন তারা।
গত বৃহস্পতিবার থেকে গ্রাহকদের টাকা তোলার সুযোগ দেওয়া শুরু হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রথম দিকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা তোলার সুযোগ পাচ্ছেন গ্রাহকরা। পরের তিন মাসে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা করে তুলতে পারবেন আমানতকারীরা।

গঠন করা হবে পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ
সংবাদ সম্মেলনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বলেন, আগামী ১৯ জানুয়ারি ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। এখন পর্যন্ত ঠিকঠাক চলছে। খুব শিগগির আরও দুই-তিনজন পরিচালক নিয়োগ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠন করা হবে।
‘‘কয়েকটি শাখায় টাকা ওঠানোর চেয়ে জমা হয়েছে বেশি। এটা আমাদের জন্য ভালো দিক।’’
তিনি বলেন, পাঁচ ব্যাংকের প্রযুক্তি এখনও সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে চলছে। সবগুলো একটিতে রূপান্তর করে সমন্বিত সফটওয়্যার করার কাজটি খুব দ্রুত শেষ হবে হবে।
‘‘বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি টিএম এটি নিয়ে কাজ করছে। কাজ শেষে সব শাখায় একই সফটওয়্যার চলবে।’’
বর্তমানে ১৬ হাজারের বেশি জনবল থাকা পাঁচ ব্যাংকে কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক নেই। অল্প সময়ের মধ্যে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হবে বলে জানান চেয়ারম্যান।
রেমিটেন্স ও আয় বাড়ানো চ্যালেঞ্জ
নতুন ব্যাংকের বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ থাকার কথা তুলে ধরে গভর্নর বলেন, রেমিটেন্স বাড়ানো, ডলারের বিপরীতে তাদের টাকা দেওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমদানি-রপ্তানি তো বাড়াতে হবে, এজন্য ডলার লাগবে। বিভিন্ন ধরনের ইউটিলিটি বিল পরিশোধসহ সব ধরনের ডিজিটাল সেবা নির্বিঘ্ন করতে হবে, এগুলো আয় বাড়াবে। এখন তো খরচ কমানো ও আয় বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
সরকারি অর্থায়ন থাকলেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলবে। এজন্য কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো সরকারি পে-স্কেল বা রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের মত হবে না।
আবারও এ কথা তুলে ধরে গভর্নর বলেন, ‘‘পাঁচটি ব্যাংকের ভিন্ন ভিন্ন বেতন কাঠামো একীভূত করে একটি ইউনিফাইড স্কেলে নেওয়া হবে। এতে অনেকের বেতন কমবে-কারো কারো হয়ত বাড়বে।”
গভর্নর বলেন, সাধারণভাবে একটি নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে মাত্র দুই মাসের মধ্যেই লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই), ক্যাপিটালাইজেশন, সাইনবোর্ড স্থাপন এবং লেনদেন শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
ঘোষণা থাকলেও প্রথম তিন দিনে কিডনি রোগে আক্রান্ত ডায়ালাইসিস করা গ্রাহক ও ক্যান্সার আক্রান্তদের আমানত পুরোটা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ক প্রশ্নে গভর্নর বলেন, ‘‘সমস্যা হয়েছে, এখানে কোনো কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার ছিল না। খুব দ্রুত তা করা হচ্ছে। এসব আমানতকারী ব্যাংকে গিয়ে আবেদন করলে পুরো আমানতই তুলতে পারবেন। আশা করছি, দ্রুত করা হবে এটি।’’
আগামী তিন বছরের মধ্যে ব্যাংকটি পুঁজিবাজারের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন গভর্নর। বলেন, তিন বছরে লাভজনক না হলে তো তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হবে না। তাই পরিকল্পনা হচ্ছে দ্রুত লাভজনক করা।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: উত্তোলন ১০৭ কোটি, জমা ৪৪ কোটি টাকা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: টাকা তুলতে পারছেন পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকরা