Published : 12 Dec 2025, 11:35 PM
ছয় দিন আগে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির খবরে ঢাকার আড়ত ও খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা দর পড়ে গেলেও সেই পেঁয়াজ দেশে ঢোকার পর আবারও দাম চড়েছে।
ঢাকার খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ আগের দাম ১৪০-১৫০ টাকায় ফিরে গেছে। শুক্রবার যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, মতিঝিল, সেগুনবাগিচা ও কারওয়ান বাজারে এই দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে।
বাজারের এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এদিন সরকার ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি চার গুণ করার অনুমতি দিয়েছে।

যাত্রাবাড়ীতে দেশি পেঁয়াজ ১৫০ টাকা দরে বিক্রির বিষয়ে দোকানি সেলিম উল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কাল রাইতে পেঁয়াজ আনছি, আজকে বিক্রি করতে। এইডা ‘ফ্রেশ’ পেয়াঁজ। ১৫০ টাকা কেজি।”
বাজারে পেঁয়াজের যথেষ্ট সরবরাহ থাকলেও দর কেনো কমছে না, জানতে চাইলে সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের বিক্রেতা ওয়াসিম সরকার বলেন, “আমাগো কাছে জিগাইয়া কোনো লাভ নাই। সব তেলেসমাতি আড়তে। হেরাই দাম ঠিক করে।”
রাজধানীর কারওয়ান বাজার আড়তে প্রতি পাঁচ কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৬০০ টাকা। এ হিসাবে প্রতি কেজির দর পড়ছে ১২০ টাকা, বলছেন সেকেন্দার আলী।
তার ভাষ্য, খুচরা বাজারে ও পাড়া মহল্লায় সেই পেঁয়াজ ১৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
“বড় আড়তদাররা ঠিক করে কোন দিন কত টাকায় বিক্রি করবে। আমরা আনি আর বিক্রি করি।”
সবশেষ মৌসুমের সংরক্ষিত দেশি পেঁয়াজের মজুদ ফুরিয়ে আসে শীত আসলে। এ কারণে দামও একটু বাড়তে থাকে।
এ সময়ে তুলনামূলক কম দামের মুড়ি কাটা পেঁয়াজ বাজারে আসলে দরে স্বস্তি পায় ভোক্তা।
এবার মুড়িকাটা পেঁয়াজ প্রথম দিকে ১০০ টাকায় বাজারে আসার পরে এক সপ্তাহ পরই তা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি।
গেল ৩ ডিসেম্বর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা দেশি পেঁয়াজ ৫ ডিসেম্বরে ১৫০ টাকা কেজি হয়।
এ অবস্থায় পরদিন শনিবার ছুটির দিনে হঠাৎ সরকারের তরফে সীমিত পরিসরে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। তার পরদিন রবিবার রাত থেকে ভারতের পেঁয়াজ ঢুকতে শুরু করে। প্রথম দিন ১৫০০ টন আমদানির আইপি (ইমপোর্ট পারমিট বা আমদানি অনুমতিপত্র) দেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় পেঁয়াজ আসার খবরে ঢাকার বাজারে সেদিনই পেঁয়াজের দর নেমে দাঁড়ায় প্রতিকেজি ১২০-১৩০ টাকায়।
শুক্রবার ঢাকার বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮০-১০০ টাকা দরে।

দেশি পেয়াঁজের দাম ফের কেন বাড়লো এমন প্রশ্নে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আকমল সরকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ সাপ্লাই কম। ইন্ডিয়ার পেঁয়াজের চাইতে দেশি পেয়াঁজের দাম ২০-৩০ টাকা বেশি হইবোই। কিন্তু বেশি না আসায় দাম কমাইতেছে না আড়তদাররা।”
ভারত থেকে প্রতি টন পেঁয়াজ ২৪৫ থেকে ২৫০ ডলার দামে আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ডলারের বিনিময় হার সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। এ হিসাবেও প্রতি টন পেঁয়াজ আমদানিতে খরচ পড়েছে ২৯ হাজার ৯৬৩ টাকা থেকে ৩০ হাজার ৫০০ টাকা।
এতে প্রতি কেজি পেঁয়াজে খরচ পড়ছে ২৯ টাকা ৯৬ পয়সা থেকে ৩০ টাকা ৫০ পয়সা। খুচরা বাজারে আসার পর তার দাম রাখা হচ্ছে ৬০ টাকা থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত।
যাত্রাবাড়ী পাইকারি বাজারে পাঁচ কেজি আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৩৫০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা কেজি বিক্রি করার তথ্য দিলেন বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের হোসেন আলী।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “‘নরমাল সাইজেরটা’ ৩৫০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা, এক পাল্লার (পাঁচ কেজি) দাম। আরও বেশি আছে। সবচেয়ে ভালোটা নিতে চাইলে ৫০০ টাকা পড়বে এক পাল্লা। সেইটার চাহিদা কম, আড়তদাররা আরো পড়ে ছাড়বে। আমি আনছি অল্প কিছু।”
হোসেন আলীর ভাষ্য, ভারত থেকে আমদানি করা ভালো মানের পেঁয়াজ খুচরা পর্যায়ে গেলে দাম পড়ছে ১২০টা কেজি। আর সাধারণ মানের পেয়াঁজ পাইকারি হিসাবে প্রতি কেজির দর পড়ছে ৭০-৯০ টাকা কেজি।
অন্যদিকে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এবার ভারতের কৃষকরা পেয়াঁজ রপ্তানি না করতে পারায় দর কমে প্রতি কেজি ১০ থেকে ১৫ রুপিতে নেমে আসে।
আবাদ খরচ না উঠায় মহাসড়কে পেয়াঁজ ফেলে ট্রাক্টর দিয়ে পিষে প্রতিবাদ করেছেন সে দেশের চাষীরা।
বহুল প্রচারিত কৃষি পণ্যর দর প্রকাশকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ‘কিষানডিলস’ এর তথ্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ গুণগত মানের পেয়াঁজের প্রতি কেজি পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ১৮ রুপি ৩০ পয়সা। খুচরা পর্যায়ে যা ১৩ রুপি থেকে সর্বোচ্চ ২৬ রুপি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর বাজার দর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে শুক্রবার দেশি পেয়াঁজ বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে।
২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রতি কেজি দেশি পেয়াঁজ বিক্রি হয় সরর্বনিম্ন ৯৫ টাকা ও সর্বোচ্চ ১৩০ টাকা দরে।

‘আমদানি বেড়ে হচ্ছে চার গুণ’
পেঁয়াজের বাজারের উত্তাপ কমাতে আমদানির পরিমাণ চার গুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শনিবার থেকে প্রতিদিন ২০০ আইপি (ইমপোর্ট পারমিট বা আমদানি অনুমতিপত্র) দেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
এসব আইপিতে দৈনিক ছয় হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করা যাবে।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “প্রত্যেকটি আইপিতে পূর্বের ন্যায় সর্বোচ্চ ৩০ টন পেঁয়াজের অনুমোদন দেওয়া হবে।’’
বিপ্তিতে বলা হয়েছে, গেল ১ আগস্ট থেকে যে সকল আমদানিকারক আবেদন করেছেন তারাই কেবল আবেদন পুনরায় দাখিল করতে পারবেন। অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে হওয়ায় ছুটির দিনেও আইপি দিতে পারবে মন্ত্রণালয়।
রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাটির উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক বনি আমিন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে গেল রোববার বলেছিলেন, “প্রথম দিন ৫০টি আইপির বিপরীতে এক হাজার ৫০০ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এসব আইপিতে সব পেঁয়াজ ভারত থেকে আসবে।”
বাংলাদেশে সাধারণত ভারত ও মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি হয় বেশি।
ভারত ২০২৩ সালে পেঁয়াজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় তুরস্ক ও পাকিস্তান থেকে পেয়াঁজ আমদানি করেছিল সরকার।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে ভারত পেয়াঁজ রপ্তানিতে আবার বিধি-নিষেধ আরোপ করলে দেশে সংকট কাটাতে পাকিস্তান থেকে বেশি আনা হয়।
পেঁয়াজের বাজার কত বড়
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গেল ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে দেশে পেয়াঁজের উৎপাদন হয় ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার ৭০০ টন। বাৎসরিক চাহিদা ৩৬ থেকে ৪০ হাজার টন।
এ হিসাবে চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি হওয়ায় উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু সংরক্ষণ ও পরিবহনজনিত কারণে ২০ শতাংশ পর্যন্ত পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়।
বর্তমানে সেই হার ৬-৮ শতাংশে নেমেছে বলে দাবি করেছেন কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক (কৃষক পর্যায়ে পেয়াঁজ ও রসুন সংরক্ষণ পদদ্ধতি আধুনিকায়ন) হেলাল উদ্দিন।

বাজারভরা সবজি, কমছে না দাম
আগের সপ্তাহে শীতের সবজির দর কমার যে প্রবণতা দেখা দিয়েছিল, শুক্রবার তার মধ্যে কয়েকটির দর ফের বেড়েছে।
এর মধ্যে ঢেঁড়স ও পটল ১০ টাকা বাড়িয়ে ৭০ টাকায় প্রতি কেজি বিক্রি করছিলেন ঢাকার সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের দোকানি ওয়াসিম সরকার।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে প্রতি কেজি গোল বেগুন আগের সপ্তাহের মতো ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে তুলে ধরে বিক্রেতা আবুল কালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, লম্বা বেগুন ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৮০ টাকা। চিকন বেগুন বিক্রি ৪০ টাকা কেজি দরে।
এ বাজারে কাঁচা মরিচ আগের সপ্তাহের দর প্রতি কেজি ১২০ টাকা, নতুন আলু ৮০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা ও করোল্লা ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সেগুনবাগিচায় এক কেজি ওজনের রুই আগের সপ্তাহের দর প্রতি কেজি ৩৩০ টাকায় বিক্রি হয়। তেলাপিয়ার দর ২০ টাকা বেড়ে ২২০ টাকা, পাঙ্গাস ২০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
বাজারগুলোতে গরু মাংসের দামে কোনো নড়চড় হয়নি। প্রতি কেজি ৭৫০ টাকা দরেই বিক্রি হচ্ছে হাঁড়সহ এই মাংস।
মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি বাজারে সোনালী জাতের মুরগি প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ২৯০ টাকা কেজি দরে। আগের সপ্তাহে ২৮০ টাকা দরে বিক্রি করার তথ্য দেন ব্যবসায়ী হোসেন মিয়া। যাত্রাবাড়ীতে প্রতি কেজি ব্রয়লার ১৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
আর সেগুনবাগিচায় প্রতি হালি ডিম আগের সপ্তাহের মতো ৪০ টাকা হালি দরে বিক্রি হয়েছে।