‘স্বাস্থ্য ভালো’ দেখাতে ঋণ পুনঃতফসিলে ঝোঁক ব্যাংকের
বিশাল অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিলের পরও ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতে নতুন ঋণ খেলাপি হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকার বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধার সুযোগ নিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ বাড়ছে ব্যাংকগুলোতে। বছর কয়েক ধরে এ প্রবণতা চলতে থাকার মধ্যে ২০২৫ সালে এক বছরের ব্যবধানে পুনঃতফসিল বেড়েছে ৮৪ হাজার ৮২৪ কোটি টাকার বেশি বা ৯৯ শতাংশ।
খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়তে থাকার মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদনের স্বাস্থ্য ভালো দেখাতে গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোর এমন কৌশল নেওয়ার কথা বলছেন ব্যাংকার ও বিশ্লেষকরা।
ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিল করা ঋণের তথ্য বলছে, গত ৫ বছরে পুনঃতফসিল করা ঋণের হার বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৫ গুণ। ২০২৫ সালে খেলাপি হওয়ার আগে পুনঃতফসিল করা হয়েছে ৬০ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং খেলাপির পরে পুনঃতফসিল করা হয়েছে ৩৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে যা বেড়েছে ৮৪ হাজার ৮২৪ কোটি টাকার বেশি বা ৯৯ শতাংশ। ২০২৪ সালে পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতি ও কারণে খেলাপি ঋণকে নিয়মিত করার সুবিধা দিতে বিশেষ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়। এর বাইরে সাধারণ নীতিমালা মেনেও ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, এখন সেই সুযোগের ‘অপব্যবহার’ করা হচ্ছে। বারবার পুনঃতফসিল করা মানেই বিশেষ সুযোগটি জায়েজ হয়ে যায় না।
“খেলাপি ঋণের পরিমাণ যখন বেড়ে যায় তখনই মূলত পুনঃতফসিলে যায় ব্যাংক।”
এক বছরে বিশাল অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিলের পরও ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতে নতুন ঋণ খেলাপি হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকার বেশি।
খেলাপি ঋণ বেশি হলে ব্যাংকের মুনাফা থেকে সেই অনুপাতে বেশি অর্থ নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায়। এজন্য পুনঃতফশিলের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো খেলাপির পরিমাণ কম দেখানোর চেষ্টা করে বলে ব্যাংকাররা তুলে ধরেন।
নিয়মিত ঋণের বিপরীতে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশি এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে মানভেদে শতভাগ পর্যন্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্বিকভাবে ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। এরমধ্যে বড় ঋণ গ্রহীতার ঋণ ৪০ শতাংশ।
ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে বারবার পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন মোস্তফা কে মুজেরি, যিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদের দায়িত্বও পালন করেছেন।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো এ নীতিমালার যথেচ্ছ ব্যবহার করছে কি না, তা মূল্যায়ন করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে। বারবার পুনঃতফসিল করা মানেই হচ্ছে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য এক সময়ে আরো দুর্বল হয়ে পড়বে।
গত ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে ঋণ স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৭৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা বা ২৫ দশমিক ১৪ শতাংশ।
পুনঃতফসিল করা ঋণের এ অঙ্ক গত ডিসেম্বরের মোট খেলাপি হওয়া ঋণের ৮০ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট খেলাপির পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।
ব্যাংকাররা বলছেন, পুনঃতফসিল করার সুযোগ না দিলে ডিসেম্বর শেষেই মোট খেলাপির অঙ্ক বেড়ে ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত।
ব্যাংকের নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, প্রভিশন রাখার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্ত পদক্ষেপের কারণে ‘প্রভিশন শর্টফল’ থেকে বাঁচতে ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিলে বেশি আগ্রহী উঠেছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘খেলাপি ঋণের পুরো তথ্য এখনো উঠে আসছে না। নানা কারণেই সেটি করা হচ্ছে না। ব্যাংক চায় তার ব্যালেন্স শিট (আর্থিক প্রতিবেদন) ভালো দেখাতে। তাই পুনঃতফসিলের প্রস্তাব পেলেই আগ্রহী হয়ে ওঠে। এখন দেখা দরকার কতটা যৌক্তিকভাবে এটা বিচার করা হল।’’
এভাবে পুনঃতফসিলের হার বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তার। বলেন, “এগুলো এক সময়ে খেলাপি হয়েই যাবে। কেন আমরা আগেই দেখাব না। ব্যাংকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ বিষয়ে আরো শক্ত হতে হবে। কেন পুনঃতফসিল করা হচ্ছে তার প্রকৃত ব্যাখ্যা থাকা উচিত।’’
৫ বছরে পুনঃতফসিল বেড়েছে সাড়ে ৫ গুণ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে পুনঃতফসিল করা হয় ২৬ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। কোভিডের মধ্যে বিশেষ সুযোগ থাকার কারণে তা ২০২২ সালে এক লাফে বেড়ে হয় ৬৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে ৯১ হাজার ২২১ কোটি টাকা।
পরের দুই বছরও এ ধারা বজায় থাকে; ২০২৪ সালে কিছু কমে ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা হলেও ২০২৫ সালে পুনঃতফসিল করা হয় ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ।
২০২১ সাল শেষে ব্যাংকিং খাতে পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এ বছরে পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি বাড়ে ৫৯ হাজার ৯২০ কোটি টাকা বা ২০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
সবশেষ ২০২৫ সাল শেষে পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।
বড় ঋণে পুনঃতফসিল বেশি
পুনঃতফসিল করা ঋণের মধ্যে প্রায় শিল্প ঋণের অংশই বেশি; ২৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সাধারণ বড় ঋণ গ্রহীতারা এমন ঋণ নিয়ে থাকেন।
টাকার অঙ্কে শিল্প ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৩২ হাজার ১০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বড় বা করপোরেট ঋণ ৭২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বা ৯৫ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। মধ্যম মানের শিল্প খাতে ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ, ছোট আকারের ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, ক্ষুদ্র ও কুটির খাতের ১ দশমিক ৬ শতাংশ ও অন্যান্য খাতের ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
এছাড়া তৈরি পোশাক খাতের ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, চলতি মূলধনের ১৩ শতাংশ, আমদানি ঋণের ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ, বাণিজ্যিক ঋণের ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ, নির্মাণ খাতের ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং কৃষি ঋণের ৩ শতাংশ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।
অন্য খাতগুলোর মধ্যে জাহাজ ভাঙা খাতের ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ, রপ্তানি খাতের শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ, ভোক্তা ঋণের শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ এবং অন্যান্য ঋণের মধ্যে পুনঃতফসিল করার হার ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ।
পুনঃতফসিলে আগ্রহ কেন
শুধু যে খেলাপি হলেই ঋণ পুনঃতফসিল করা যাবে, এরকম কোনো বিধিনিষেধ নেই। নিয়মিত ঋণও পুনঃতফসিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে ২০২২ সালের জুলাই মাসে জারি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সার্কুলারে।
পুনঃতফসিল করার ক্ষেত্রে মেয়াদী, চলমান ও তলবী ঋণের বেলায় মোট বকেয়া ঋণের আড়াই থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ নগদ টাকায় ডাউন পেমেন্ট দিতে হয়।
অন্যদিকে নিয়মিত ঋণের বেলায় কোনো ডাউনপেমেন্ট দিতে হয় না। আবেদনের পরই ব্যাংক চাইলে তা মঞ্চুর করতে পারে। মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়ে ঋণের অঙ্ক বা সীমা বাড়ানোরও সুযোগ থাকে সেখানে।
এ কারণে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিলেই ব্যাংক ও গ্রাহক নিজ নিজ স্বার্থে ঋণ পুনঃতফসিল করতে এগিয়ে আসতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘অনেক সময় সময়মত গ্যাস, বিদ্যুৎ না পাওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করা সম্ভব হয় না। তাদের রিলিফ দিতেই এমন সুযোগ।”
এ সুযোগের অপব্যবহারের সুযোগ নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “সবসময়ই কিছু গ্রাহক অ্যাডভ্যানটেজ নিতে চাইবে। এখন ব্যাংক কাকে দেবে, কাকে দিলে ভালো হবে, কোন ক্ষেত্রে ব্যাংকের কোনো সমস্যা হবে না, সেটা ব্যাংকের বুঝে নিতে হবে। অনেক সময় প্রভাব বিস্তার করা হয়। সেটাও কতটুকু নেওয়া যায় দেখতে হবে।’’
নীতি সুবিধার যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনেক সময়ে দেখা গেছে, মেয়াদী ঋণ পাঁচ বছরের জন্য নিয়েছে, কিন্তু তিন বছর পরে ব্যবসার আয় হয়ত আসছে না, কিংবা তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বা সময় মত বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা অন্য কোনো কারণে ব্যবসা শুরু করা করা যায়নি।
“এখন ঋণের মেয়াদ যদি না বাড়ায়, তাহলে এত টাকা দিতে পারবে না আগেই বুঝতে পারেন অনেকে। খেলাপি হওয়ার দায় থেকে মুক্তি পেতে তখন মেয়াদী ঋণ পুনঃতফসিল বা পনর্গঠনের সুযোগটি নিতে চান।”
ঝুঁকিতে থাকা এসব ঋণ পুনঃতফসিল করা হলেও ভবিষ্যতে অর্থপরিশোধে ব্যর্থ হলে খেলাপির পরিমাণ আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন, এ সমস্যার সমাধানের উপায় হতে পারে উদ্যোক্তাদের বন্ড মার্কেট বা পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তুলতে উৎসাহিত করা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ব্যাংক সর্বোচ্চ ৫ বছরের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ দেবে। এর বেশি সময়ের জন্য কোনোভাবেই না। তাদেরকে (ব্যবসায়ীদের) পুঁজিবাজারে পাঠাতে হবে। এটাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাজ। যে যে সুবিধা দিলে ব্যবসায়ীরা পুঁজিবাজারে যাবে, তা দিতে হবে।
‘‘যতই মিষ্টি কথা বলি, এমনি এমনি বললে কেউ আসবে না। তাদের আনতে হবে, বাধ্য করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা তো বসে আছে টাকা দিতে। এটা না করলে খেলাপী ঋণ কোনোভাবে কমবে না।”
পুরনো খবর
