Published : 06 Nov 2025, 12:12 AM
নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা কার্যকরের পর দেশের বাজারে মোবাইল হ্যান্ডসেটের দাম বাড়বে বলে ‘গ্রে মার্কেটের’ ব্যবসায়ীরা যে শঙ্কার কথা বলছেন, তা উড়িয়ে দিচ্ছেন দেশি মোবাইল ফোন সেট উৎপাদকরা।
তারা আশ্বস্ত করছেন, এর ফলে হ্যান্ডসেটের দাম এক টাকাও বাড়বে না। উল্টো তাদের কারখানাগুলো পুরোদমে চলা শুরু করলে হ্যান্ডসেটের দাম কমানোর পাশাপাশি রপ্তানিও করা যাবে বলেও আশা করছেন দেশি উৎপাদকরা।
বুধবার রাজধানীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন দেশি মোবাইল ফোন উৎপাদকদের সংগঠন এমআইওবি (মোবাইল ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অব বাংলাদেশ) এর সভাপতি জাকারিয়া শহীদ।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস থেকে দেশে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ বা এনইআইআর কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এ প্রক্রিয়ায় সিমকার্ডের মতো প্রতিটি হ্যান্ডসেটও নিবন্ধনের আওতায় আসবে।
দেশের টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি হ্যান্ডসেট ‘গ্রে মার্কেট’ থেকে আসা। অর্থাৎ, কর ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে দেশে আনা হয় এসব হ্যান্ডসেট।
গ্রে মার্কেট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ৯০ শতাংশ হ্যান্ডসেটের বাজার তাদের দখলে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত লাখো ব্যবসায়ীকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি দেশের বাজারে মোবাইল ফোনের দামও বাড়িয়ে দেবে।
তবে দেশি উৎপাদকরা বলছেন, বর্তমানে দেশে আইফোন ছাড়া আর সব বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের ফোন সেট তৈরি হয়। নিবন্ধনের আওতায় এলে দেশে কর ফাঁকি দিয়ে আসা মোবাইল ফোনের বাজার ছোট হবে আর দেশি হ্যান্ডসেটের বাজার বড় হবে। দেশে উৎপাদন বাড়লে মোবাইল ফোনের দামও কমবে।
এমআইওবির সহসভাপতি রিজওয়ানুল হক বলছেন, “আমাদের যে কারখানার সক্ষমতা তা দেশি চাহিদার চেয়ে বেশি। আমরা চাইলে রপ্তানিও করতে পারি। আমরা যখন শুরু করেছিলাম তখন গ্রে মার্কেট ছোট ছিল। এখন তা ৬০ শতাংশের বেশি।
“পৃথিবীর যে কোনো দেশের মোবাইল ম্যানুফাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি দেখেন, এই ইন্ডাস্ট্রি টেকানোর পূর্ব শর্তই হচ্ছে আগেহ্যান্ডসেট নিবন্ধনের বাধ্যবধকতা দিতে হবে, এনইআইআর ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।”

পাকিস্তানের উদাহরণ তুলে ধরে রিজওয়ানুল বলেন, “আমরা বাংলাদেশে এনইআইআর প্রকল্প শুরু করি সাত বছর আগে। তারও দুই বছর পরে পাকিস্তান জানতে পারে যে বাংলাদেশে এটা হচ্ছে, এরপর তারা কিন্তু এটা শুরু করে বাস্তবায়নও করেছে প্রায় আমাদের চার বছর আগে। এই মুহূর্তে পাকিস্তানের বাজারে কিন্তু ৯৯ শতাংশ বৈধ হ্যান্ডসেট এবং ১ শতাংশ হচ্ছে অবৈধ বা গ্রে মার্কেটের।”
দেশের রপ্তানির বেশির ভাগটাই যে তৈরি পোশাক সে বিষয়টি তুলে স্মার্ট টেকনোলজিস এর কর্ণধার জহিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা সেলাই করে পয়সা রোজগার করি। এরপর সরকার অনুমতি দিল দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনের জন্য। যেন আমরা দক্ষতা অর্জনের পর রপ্তানি করতে পারি।
“এখন এখানে কারখানা হওয়ার পর আমরা দেখছি, অসাধু ব্যবসায়ীরা ‘গ্রে’ তে ইমপোর্ট করা শুরু করল। এখন তাদের দৌরাত্ম্যের কারণে সমস্ত লোক, যারা বিনিয়োগ করেছে, অনেক ব্যবসায়ী জীবনের সমস্ত সঞ্চয় এখানে বিনিয়োগ করেছে, তারা আজকে বিপদে পড়েছে।”
এমআইওবির সভাপতি ও এডিসন গ্রুপের (সিম্ফনি ফোন) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া শহীদ বলেন, “এর আগেও দুইবার এনইআইআর কার্যকর হয়েও নিস্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিল একটা মহলের কারণে। তারা নানা কথা বলে, মার্কেটে মনোপলি হবে, ভোগান্তি বাড়বে, তাদের ব্যবসায়ীরা না খেয়ে মারা যাবে, কিন্তু এরকম কিছুই হবে না। আমরা আশ্বস্ত করছি এটা হওয়ার পর মোবাইল ফোনের দাম বাড়বে না।
“দেশে উৎপাদিত ফোনের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম ও সাশ্রয়ী। গত দুই বছরে ডলার ও মোবাইল উপকরণের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়লেও স্থানীয় উৎপাদকরা খরচ নিয়ন্ত্রণে রেখে দাম বাড়াননি।”
নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় যেন ভোগান্তি না হয় সেজন্য নেওয়ার উদ্যোগের প্রসঙ্গ ধরে জাকারিয়া বলেন, “নিবন্ধন প্রক্রিয়াটা যেন চোখের নিমিষেই শেষ করা যায়, গ্রাহক বুঝে ওঠার আগেই, আমরা সেরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।
“সেই সহজীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে আমরা আছি। এটা নিয়ে ভোগান্তির কোন শঙ্কা থাকবে না। আমাদের ২০ হাজার রিটেইলের (বিক্রয়কেন্দ্র) প্রায় এক লাখ লোক আছে তাদেরকে আমরা এই কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে সম্পৃক্ত করবো।”
আর গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরাও যেন টিকে থাকতে পারে সেজন্যও তারা উদ্যোগ নিচ্ছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, “আর ফোন আমদানি করার ক্ষেত্রে যে কর বৈষম্য, সেটা নিয়ে আমরা সরকারকে অনুরোধ করবো এটা কমিয়ে একটা পর্যায়ে আনার জন্য। আর যারা এটার সুবিধাভোগী তারা তো করবেনই। আর আগে থেকে যেই ফোনগুলো বাজারে এসে স্টক করা হয়েছে, সেগুলো যেন ব্যবহারযোগ্য করা যায় সেটা বিটিআরসির সঙ্গে বসে একটা সমাধান বের করবো আমরা।
“কাজেই গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা যেভাবে বলছেন তাদের মেরে ফেলা হচ্ছে এরকম ভাষ্যের কোনো কারণ থাকবে না। আমরা চাই সকলের স্বার্থেই দেশের বৈধ বাজার তৈরি হোক।“
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জাকারিয়া বলেন, বর্তমানে দেশি-বিদেশি মিলে প্রায় ১৭টি মোবাইল ফোন কারখানা দেশে উৎপাদন করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে, যেখানে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোন এখন কেবল স্থানীয় বাজারেই নয়, ভবিষ্যতে বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি করছে।
মোবাইল ফোন উৎপাদন ঘিরে দেশে আধুনিক প্যাকেজিং, প্রিন্টিং, ব্যাটারি, চার্জার, হেডফোন, ডাটা কেবলসহ আরো অনেক ধরনের উপকরণের শিল্প গড়ে ওঠা, বিনিয়োগ ও কর্মস্থানের বিষয়টিও তুলে ধরেন জাকারিয়া।