Published : 06 Nov 2025, 12:33 AM
আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত শরিয়াভিত্তিক পাঁচ বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরুর পর নতুন ব্যাংকটিকে পুরোদমে দাঁড় করাতে কয়েকটি ‘চ্যালেঞ্জের’ কথা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
বুধবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘‘প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া। প্রত্যেকটা ব্যাংক যেন ঠিকঠাকভাবে চালু থাকে। দুই নম্বর হচ্ছে আইটি সিস্টেমের ইন্টিগ্রেশন (ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকের ব্যবহৃত প্রযুক্তি তথ্যসহ একটিতে রূপান্তারিত করা) এবং আইটি সিস্টেমের উপর নজরদারি রাখা।
“খুবই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আইটিতে, যাতে সেখানে আমাদের টেক ওভার কন্ট্রোল থাকতে হবে।’’
নানা অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ায় বেসরকারি খাতের ডজনখানেক ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য নাজুক হয়ে পড়েছে বেশ কিছুদিন থেকে। এর মধ্যে বেশি সংকটে রয়েছে সেসব ব্যাংক যেগুলোর পরিচালনা পর্ষদ আলোচিত ব্যবসায়িক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
নাজুক এসব ব্যাংককে নানা ছাড় দিয়েও ভালোভাবে চালাতে হিমশিম খায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে উপায় না পেয়ে একীভূত করার দিকে ঝুঁকে পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ২০২৪ সালের এপ্রিলে কয়েকটি ব্যাংককে ‘সমস্যাগ্রস্ত’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তখন ব্যাংকিং খাতে ‘মার্জার’ (একীভূত) করার পদক্ষেপও শুরু হয়। বেসরকারি পদ্মা ব্যাংককে (সাবেক ফারর্মাস ব্যাংক) আরেক বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকে একীভূত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চুক্তিও হয়েছিল।
এরপর অগাস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থ্যানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। আর্থিক খাতে রদবদলের পর পুনরায় ব্যাংক মার্জার আলোচনায় আসে ব্যাংকিং খাতে গঠিত টাক্সফোর্সের সুপারিশে।
এবার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘ভালো’ থাকা সেই এক্সিম ব্যাংক এখন ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এটিসহ শরীয়াহভিত্তিক আরও চার ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেয় অন্তবর্তী সরকারের দায়িত্ব পাওয়া গভর্নর আহসান মনসুর।
বাকি চার ব্যাংক হল ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
এ পাঁচ ব্যাংকের বাইরে আরও দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংক থাকলেও পর্ষদে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা চার ব্যাংক এবং পর্ষদে নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ থাকা এক্সিম ব্যাংক সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে আছে বলে মন্তব্য করেন গভর্নর।
বুধবার চিঠি দিয়ে এসব ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদ ভেঙে দিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পদত্যাগ করতে বলা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আসার আগে গভর্নর ৫ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকও করেন।
দেশজুড়ে এই পাঁচ ব্যাংকের ৭৫০টি শাখা ও ৭৫ হাজার জনবল রয়েছে। ব্যাংকগুলো একীভূত হলে জেলা, উপজেলা ও শহরের একই স্থানে থাকা সব ব্যাংকের শাখা একটি বা দুটিতে মিশে যাবে। এমন অবস্থায় জনবলকে একত্র করা, বাছাই করা ও রাখা না রাখার বিষয়টিকেও ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখছেন তিনি।
মার্জার প্রক্রিয়াকে ‘উচ্চাভিলাষী’ মন্তব্য করে তৃতীয় চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার অবস্থা যাচাই করে সেটিকে সমন্বয় করা এবং ব্যাংকের শাখা নেটওয়ার্কের ন্যাশনালাইজ করা গুরুত্বপূর্ণ।
‘‘এখনতো একটা রাস্তায় হয়তো পাঁচটা শাখা আছে।পাঁচটা থাকবে না, হয়তো একটা-দুটো থাকতে পারে। আমাদের করেসপন্ডিং প্যারালাল একটা সেন্ট্রাল টিম থাকবে। সেন্ট্রাল টিমও আইটি সাপোর্ট দেবে একক ব্যাংকের পর্যায়ে।’’
চতুর্থ চ্যালেঞ্জের বিষয়ে আহসান মনসুর বলেন, ‘‘আমাদের তো আল্টিমেটলি বটম লাইনতো হচ্ছে ফাইনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট, ব্যাংক যে কারণে আজকের এই ব্যবস্থায়। আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে কৌশলপত্রটা সরকারের কাছে দিয়েছি, সেটার ভেতর প্রসেসটা বলে দেওয়া আছে। প্রত্যেক ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক, যাতে এটার আর অবনতি না হয়। কোনো কিছু হলে সেটা যেন আমাদের নজরে আসে।
‘‘মার্জার সম্পন্ন হলে তখন আমরা লিকুইডিটি সাপোর্ট দিতে পারব। সরকার থেকে লিকুইডিটি সাপোর্ট দিতে পারবে এবং সেই টাকা তখন আমাদের যে ৭৫ লাখ ডিপোজিটর আছে তাদের কাছে আমরা পৌঁছে দিতে পারব। ম্যানেজমেন্টটা গুরুত্বপূর্ণ একটা একটা পার্ট হবে।”
এ পর্যায়ে কোনো ধরনের ‘লে-অফ’ ভাবনায় না থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পাঁচ ব্যাংকের সব দায়-দেনা নিতে ‘ব্রিজ ব্যাংক’ হিসেবে রাষ্ট্রের অর্থে ৩৫ হাজার কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধনের একটি নতুন শরীয়াহ ব্যাংক গঠন করা হবে।
মতিঝিলের সেনা কল্যাণ সংস্থা ভবনে এজন্য অস্থায়ী কার্যালয় বসিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক হলেও এর মর্যদা বর্তমানে চলমান অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মত হবে না। বেতন, ভাতা, মর্যদা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাবেন না কর্মকর্তারা।
তিনি বলেন, ‘‘এখানে প্রফেশনাল লোকজন আমরা নিয়ে আসব এবং এটা একটা বেসরকারি ব্যাংকের মতই চলবে। সরকারি পে স্কেল ইত্যাদি এখানে আসবে না অর্থাৎ যারা যে বর্তমানে বর্তমানে যারা যে বেতন পাচ্ছেন তারা সেই বেতনই বর্তমানে পাবেন। পরবর্তীতে আমরা ডিক্লেয়ার করব যে স্যালারি স্ট্রাকচার ন্যাশনালাইজেশন হবে, সেটা আস্তে আস্তে হবে।’’
দায়ী উদ্যোক্তারা ‘ফিরতে পারবে না’
প্রস্তাবিত নতুন ব্যাংকের নাম রাখা হচেছ ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। মুনাফায় ফেরার পর ৩ বা ৫ বছর পরে ব্যাংকটি পুনরায় বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। তালিকাভুক্ত করা হবে পুঁজিবাজারে।
বিলুপ্ত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তারা নতুন ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে কি না, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা- এমন প্রশ্নে গভর্নর বলেন, ‘‘না, তাদের ব্যাপারে দৃশ্যমান অগ্রগতির ব্যাপারে আমি বলব অনেকগুলোই মামলা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকার মামলা করবে না। তারা তো ব্যাংকের টাকা নিয়েছে, তাদের সম্পদ নিয়ে গেছে, ব্যাংক মামলা করবে।’’
এস আলম গ্রুপের দিকে ইঙ্গিত করে গভর্নর বলেন, ‘‘প্রায় ৩০টার মত মামলা তাদের নামে হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে, সিআইডি তদন্ত হচ্ছে।
আদালতে চলমান মামলা শেষ হলেও ব্যাংকের দুর্দশার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা পুনরায় আর্থিক খাতে ফিরতে পারবে না এমন আশা ব্যক্ত করে আহসান মনসুর বলেন, ‘‘যারা যারাই কোন ধরনের অপকর্ম করেছে তাদের বিরুদ্ধে তো সরকার আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে, কোনভাবেই তারা ফিট অ্যান্ড প্রপার টেস্টে আবার বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বা এসে কোন একটা অবস্থান নেবে এটা আমি অন্তত কল্পনা করি না।
‘‘আমাদের দেশ ওই পথে যাবে, সেটা আমরা চিন্তা করতে পারি না। আমরা অবশ্যই আশা করব যে, যারা অপকর্ম করেছেন তারা আইনগতভাবেই চিরকালের জন্য বাংলাদেশের আর্থিক খাত থেকে বিদায় হয়ে যাবে।’’
আরও পড়ুন
মার্জার: ৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা পাবেন চলতি মাসেই, শেয়ার ‘শূন্য’ ঘোষণা গভর্নরের
৫ ব্যাংক একীভূত করে একটি করতে সরকারের সায়
মার্জার প্রক্রিয়া শুরু: ৫ ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দিয়ে এমডিদের পদত্যাগের নির্দেশ