Published : 26 Jul 2026, 11:27 PM
‘ক্যাশলেস’ লেনদেনের দিকে বাংলাদেশ ঠিকঠাক এগোলেও লক্ষ্য অর্জনকে এখনো অনেক ‘দূরের পথ’ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশে ভিসার কান্ট্রি ম্যানেজার সাব্বির আহমেদ।
এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি, সঙ্গে তুলে ধরেছেন নিজেদের নানা পরিকল্পনাও।
তাদের পরিকল্পনার মধ্যে মোবাইলে আর্থিক লেনদেন সহজ করা, স্মার্ট ফোনকে পস মেশিন হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা এবং ওটিপি তুলে দিয়ে চেহার বা আঙুলের ছাপের মাধ্যমে লেনদেন চালু করার মতো উদ্যোগ রয়েছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনা তুলে ধরেন সাব্বির আহমেদ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক কোম্পানি ‘ভিসা’ প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের সেবা দিয়ে আসছে।
একসময় এজেন্সি অফিসের মাধ্যমে কাজ সারলেও ছয় বছর আগে বাংলাদেশে কার্যালয় নেয় কোম্পানিটি।
বাংলাদেশে গ্রাহকদের জন্য ভিসা কীভাবে সেবা দিচ্ছে, সেই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘‘প্রশ্নটা আমাকে অনেকেই করেন; বিশেষ করে যারা সবশেষ গ্রাহক, যারা ভিসা কার্ড ব্যবহার করেন। যখন তারা আমার সঙ্গে পরিচিত হন এবং আমি বলি আমি ভিসাতে চাকরি করি, তখন আমাকে জিজ্ঞেস করে, আসলে ভিসা কী করে।’’
তার ভাষ্য, ভিসা একটা ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট নেটওয়ার্ক (আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থার নেটওয়ার্ক)। বিশ্বের ৪০০ কোটির বেশি গ্রাহককে ব্যাংকের মাধ্যমে সংযুক্ত করেছে।
সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘‘ধরুন আপনি সিঙ্গাপুরে গিয়ে একটা দোকানে কেনাকাটা করলেন এবং ভিসা কার্ড দিয়ে দাম পরিশোধ করলেন। ওই যে ওই দোকানটা, ও কীভাবে জানবে যে আপনার কার্ডে টাকা আছে? বা আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা আছে?

‘‘সেই দোকান ও আপনাকে সংযুক্ত করাই হচ্ছে ভিসার দায়িত্ব। সুতরাং ভিসা যেটা করে, কাস্টমারের ব্যাংক ও সেই সিঙ্গাপুরের দোকানটার যে ব্যাংক, সবাইকে একটা ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে কানেক্ট করে দেয়। এটাকেই আমরা বলি হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট নেটওয়ার্ক।’’
বিশ্বের ৭০০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ভিসার কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৭০ থেকে ৪৮০ কোটি।
এর মধ্যে অনেকের একাধিক ভিসা কার্ড থাকার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘পৃথিবীতে মার্চেন্ট আছে প্রায় ১৫ কোটির বেশি, যারা ভিসা নেটওয়ার্কে আছে।’’
ভিসা সরাসরি গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করে না। ব্যাংকের হয়ে গ্রাহকের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ব্যাংক গ্রাহকের জন্য কার্ড ইস্যু করে।
সব মিলিয়ে আর্থিক লেনদেনের একটি ‘ইকো সিস্টেম’ হিসেবে কাজ করে ভিসা। এখানে চারটি সত্তা কিংবা বলা যায়, চার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কাজ করে। সেই ব্যবস্থাকে ‘ফোর পার্টি মডেল’ বলা হয়।
এর মধ্যে গ্রাহককে একটি সত্তা মন্তব্য করে ভিসার কান্ট্রি ম্যানেজার বলেন, “আপনি একজন ব্যাংকের গ্রাহক, গ্রাহক হিসেবে আপনি কার্ডটা নিয়েছেন ব্যাংকের কাছ থেকে। সুতরাং, সেই ব্যাংক আপনাকে যে কার্ডটা দিয়েছে, সেই ব্যাংক হচ্ছে সেকেন্ড পার্টি।’’
সুপারমার্কেট, হাসপাতাল, হোটেলসহ দোকানগুলো হচ্ছে থার্ড পার্টি বা তৃতীয় সত্তা। সেই মার্চেন্টের ব্যাংক হচ্ছে ‘অ্যাকোয়ারিং ব্যাংক’, যাকে চতুর্থ সত্তা বলছেন ভিসার এই কর্মকর্তা।
এই পুরো চার স্বত্তা মিলে লেনদেনটি ‘মিলি সেকেন্ডে’ সম্পন্ন হয় বলে জানান সাব্বির আহমেদ।
দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে আনতে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ গড়তে চায় সরকার। এজন্য সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা উদ্যোগও রয়েছে।
এই ‘ক্যাশলেস’ অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশ কতটা এগিয়েছে, সেই প্রশ্নে সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘‘ক্যাশলেস অর্থনীতি অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য। তবে এটা সম্ভবত এখনো অনেক দূরের পথ। সুতরাং, ‘লেস ক্যাশ’ হচ্ছে আমাদের এ মুহূর্তের প্রত্যাশা।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে মোট লেনদেনের ৭০ শতাংশ এখনো নগদ অর্থের মাধ্যমে হয়। বাকি ৩০ শতাংশ হয় ডিজিটালে।
এই ৩০ শতাংশের মধ্যে কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) রয়েছে।
এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিইএফটিএন, এনপিএসবি ও আরটিজিএসের মতো লেনদেন ব্যবস্থা থাকার তথ্য তুলে ধরে সাব্বির আহমেদ বলেন, “আমরা এখনো অনেক দূরে আছি। তবে আমার কাছে মনে হয় যে, আমরা ঠিকঠাক পথে এগোচ্ছি।”

বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় ব্যাংক হিসাবধারীরর সংখ্যা কম। সব নাগরিককে ব্যাংক হিসাবের আওতায় আনতে কৃষক ও শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব খোলাটা বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংক হিসাব থাকার ক্ষেত্রে আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশে এখন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি। কিন্তু এই ১৩ কোটির মধ্যে মাত্র সাড়ে ৪ কোটির ডেবিট কার্ড আছে।
‘‘তার মানে কী? তার মানে হচ্ছে, ১০০ জনের মধ্যে ২৫ জনের মতো ডেবিট কার্ড হোল্ডার। বাকি ৭৫ জনের ব্যাংক হিসাব থাকলেও তাদের কোনো কার্ড নেই।’’
ভিয়েতনামে ১০০ জন মানুষের গড়ে ১০৪টি কার্ড আছে; অনেকের একাধিক কার্ড আছে। শ্রীলঙ্কায় ১০০ জনের মধ্যে ৯৩ থেকে ৯৪ জনের কার্ড আছে বলে পরিসংখ্যান তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশের ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ২৬ লাখের কিছুটা বেশি। এর মধ্যে অনেকের একাধিক কার্ড আছে।
একটি কার্ড থাকা গ্রাহকের সংখ্যা ১৫ থেকে ১৬ লাখ হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সুতরাং, ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ক্রেডিট কার্ড ১ শতাংশের কম।”
এটা শ্রীলঙ্কায় ৯ শতাংশ এবং ভারতে ৬ শতাংশ বলে জানান ভিসার এই কর্মকর্তা।
কোভিড মহামারীর সময় থেকে দেশে অনলাইন লেনদেনে বড় রকমের পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে মোবাইলের ফোনের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন বাড়ে।
এ পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে সাব্বির আহমেদ বলেন, “আজ যদি দেখেন, ১৭ কোটির জনসংখ্যার দেশে মোট এমএফএস হিসাব বোধহয় ২২ থেকে ২৩ কোটি। অনেকেরই একাধিক এমএফএস হিসাব আছে।’’
দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশের ‘স্মার্টফোন’ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলা কিউআর কোড আসায় এখন এমএফএস ও অনলাইন ব্যাংকিং আরো দ্রুত ও সহজ হয়েছে।
এসবের পাশাপাশি গুগল পে নিয়েও কাজ চলছে জানিয়ে সাব্বির আহমেদ বলেন, “অ্যান্ড্রয়েড বা স্মার্ট ফোনের মধ্যে গুগলের একটা ওয়ালেট আছে। সেই ওয়ালেটে ডেবিট বা ক্রেডিট বা প্রিপেইড কার্ডটা লোড করে করা যায়। সুতরাং এই ওয়ালেটে যখন এটা লোড হয়ে যাবে, তখন এই মোবাইলটাই আপনার ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড।”
সেক্ষেত্রে লেনদেন একসময় ‘কার্ডলেস’ হয়ে যেতে পারে কিনা, সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ফিজিক্যাল কার্ডলেস যদি বলেন, সেরকম একটা সোসাইটি তো অবশ্যই...এটা কিন্তু আসলে অনেক জায়গায় হয়ে গেছে।
“আজ পশ্চিমে দেখেন; এমনকি অস্ট্রেলিয়া এরকম জায়গা। সেখানে গুগল পে, অ্যাপল পের ব্যবহার ব্যাপক। সেখানে সবাই তার ফোনের মাধ্যমেই লেনদেন করছে।”
ভিসা এখন গুগল পে নিয়ে কাজ করছে। ভবিষ্যতে অ্যাপল পে নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা আছে বলে জানান সাব্বির আহমেদ।
নিরাপদ অনলাইন লেনদেনে ‘টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন’ রয়েছে ভিসার। এর মাধ্যমে ‘সেকেন্ড ফ্যাক্টর’ হিসেবে ওটিপি নাম্বার আসে। এরপর মার্চেন্টকে ওটিপি দেওয়া হলে লেনদেন সম্পন্ন হয়। এখন ওটিপির জায়গায় স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের জন্য ‘ফেইস’ দেখানোর পদ্ধতি চালু করেছে ভিসা।
এ পদ্ধতির কথা তুলে ধরে সাব্বির আহমেদ বলেন, “ফেস ম্যাচ করি অথবা ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিই অথবা যারা অ্যান্ড্রয়েড ফোন ইউজ করি, তারা আমরা প্যাটার্ন ইউজ করি। সো যেভাবে আমরা আমাদের ফোনটাকে আনলক করি, ওটিপির বদলে আপনাকে ঠিক সেটাই করতে বলা হবে।
‘‘আপনার ফেস ম্যাচ করেন অথবা আপনি ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেন অথবা আপনি আপনার প্যাটার্ন দেন, যেভাবে আপনি ফোন আনলক করেন। ঠিক সেটাই আপনি করবেন এবং সেটাই হবে সেকেন্ড ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন।‘’
আর্থিক লেনদেনের প্রতারণা বন্ধের পরিকল্পনা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমরা ওটিপি পুরোপুরি তুলে দিতে চাই। কাস্টমার তার চেহারা মিলিয়ে বা তার প্যাটার্ন দিয়ে বা তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে করবে। ফলে এখানে প্রতারকদের আর সুযোগটা থাকবে না।”
দেশে ডিজিটাল লেনদেন এখন পর্যন্ত বড় ব্যবসায়ীরা বেশি ব্যবহার করে। অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় এলে তার সমস্ত লেনদেন একটা ফরমাল চ্যানেলে থাকবে।”
‘পস মেশিনে’ লেনদেন একটু ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকে তা গ্রহণ করছেন না মন্তব্য করে সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘‘আমরা একটা নতুন সমাধান আনতে যাচ্ছি। এর নাম ‘ভিসা একসেপ্ট’, যেটার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা মূলত স্মার্টফোন ব্যবহার করবে। স্মার্টফোনটাই পস মেশিনের কাজ করবে। ফলে তাদেরকে পস মেসিন কিনতে হবে না।’’
অনলাইন লেনদেনে ব্যাংক ও পুরো লেনদেন ব্যবস্থাকে একটা নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হয় ব্যবসায়ীকে।
ছোট ব্যবসায়ীরা তা দিতে চান না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘‘সেই খরচটা আমরা কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছি।”
ডিজিটাল পেমেন্টের পর অর্থ যোগ হতে দুই দিনের মত সময় লেগে যায়। এটি তাৎক্ষণিক হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আগামী ১০ বছরের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেন ৭০ শতাংশে উন্নীত হওয়ার প্রত্যাশা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি যেটা দেখতে চাই, আমরা যখন সকালবেলা বাসা থেকে বের হচ্ছি, আমরা আর আমাদের ওয়ালেট বহন করছি না, আমরা শুধু মোবাইল ফোনটা সঙ্গে নিচ্ছি।”