Published : 10 Jun 2026, 10:56 PM
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় জোর দিয়ে বার্ষিক সরকারি ব্যয়ের যে ছক কষছে বিএনপি সরকার, তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে খাদে থাকা অর্থনীতি আবার যেন ‘ঋণ ফাঁদে’ পড়ে না যায়, তা বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতির বিশ্লেষক মোস্তাফিজুর রহমান।
মধ্যম আয়ের অনেক দেশ যে এ ধরনের ‘ঋণ ফাঁদে’ পড়েছে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলছেন, ‘ঝুঁকির’ কথা মাথায় রেখে নতুন সরকারকে নতুন অর্থবছরে ব্যয় সাশ্রয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন ও রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন ইনসাইড আউটে হাজির হয়ে দেশের অর্থনীতির হালচাল, বাজেট প্রত্যাশা আর ঝুঁকি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
অনুষ্ঠানটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে সম্প্রচার করা হয়।
বিএনপি সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো মিলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো যখন সরকার বাস্তবায়ন করতে যাবে, তখন রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়াবে চলতি অর্থবছরের প্রকৃত রাজস্ব আহরণের ৩৫-৪০ শতাংশ বেশি।
“তো সেটা যদি আমরা আহরণ না করতে পারি, তাহলে সরকারকে অনেক ঋণ করতে হবে, হয় অভ্যন্তরীণ, নয় বৈদেশিক। এই ঋণ ফাঁদে পড়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা, আমার মনে হয়- এই ঝুঁকিটা সরকারকে খুবই বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে।”
বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা দেখি যে অনেক দেশ ‘মিডল ইনকাম ট্র্যাপে’ পড়ে গেছে। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে কিন্তু তারপর আর বের হতে পারছে না। আর এই মধ্যম আয়ের এই ফাঁদটা অনেক সময় ‘ঋণ ফাঁদের’ সমার্থক।
“এই ঋণ ফাঁদটায় যাতে আমরা না পড়ি, সে বিষয়টায় খেয়াল রাখতে হবে। এই ঝুঁকিটা মাথায় রেখে আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা, রাজস্ব আহরণ, সাশ্রয়ী ব্যয়, গুড ভ্যালু ফর মানি নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সুশাসন এবং সাশ্রয়ীভাবে প্রকল্পগুলো সমাপ্ত করা–এইসব দিকে নজর দিতে হবে।”
চব্বিশের অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার আগামী ১১ জুন তাদের প্রথম বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বড় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন।
সংকটময় এ সময়ে সরকারের রাজনৈতিক দর্শন অর্থনীতির পরতে পরতে কীভাবে ফুটে উঠবে, তার কিছুটা আভাসও ইতোমধ্যে মিলেছে।
নতুন অর্থবছরের জন্য উন্নয়ন ব্যায়ের আকার (এডিপি) চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতির স্থবির দশার মধ্যেই সরকার উন্নয়নের গতি বাড়াতে চাইছে।
তবে উন্নয়ন কর্মসূচির সেই অর্থ কীভাবে মিলবে, আর বাস্তবায়নে সক্ষমতা আদৌ বাড়বে কিনা, সেই আলোচনাই এখন অর্থনীতির বিশ্লেষকদের মুখে। আর প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ এবং অর্থ লুটের পুরনো প্রবণতা নিয়ে খোদ সরকারের ভেতরেও আলোচনা-সমালোচনা আছে।

প্রতিশ্রুতির সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশার ‘সংযোগ’
নতুন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার মেলবন্ধন ঘটানোর একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে নতুন অর্থবছরের বাজেট।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমাদের পুঞ্জীভূত অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে, যার মধ্যে অন্যতম হল বিনিয়োগ স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি।”
তার ভাষ্য, মূল্যস্ফীতির কারণে গত কয়েক বছরে জীবনমানের অবনমন ঘটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতা।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে এবং দেশে সাধারণ মানুষ যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে, তখনই জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, বিএনপি সরকারের সামনে এখন ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’ হল, তারা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেগুলোর সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশার একটি ‘সংযোগ স্থাপন’ করা।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগে ‘মরাল হ্যাজার্ড’
প্রতিবার বাজেট এলেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া প্রবণতা সব রাজনৈতিক সরকারের মধ্যেই দেখা যায়। জমি ও ফ্ল্যাট কেনাকাটা চাঙ্গা করতে এই সুযোগ দেওয়া হলেও সরকারের তরফে থাকে অপ্রদর্শিত আয় দেশের অর্থনীতিতে আনার সরল ব্যাখ্যা।
বছর বছর এ নিয়ে কম সমালোচনা হয় না। কিন্তু সরকারগুলোকে তাতে কর্ণপাত করতে দেখা যায় না। বিএনপি সরকারও যে সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে না, সে আভাস ইতোমধ্যে মিলেছে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই বৃত্ত থেকে বের হতে না পারার অর্থনৈতিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। তবে এ ধরনের সুযোগ দেওয়ার ফলে যারা সৎ করদাতা, তাদের মধ্যে একটি ‘মরাল হ্যাজার্ড’ বা নৈতিক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়।
“আর অর্থনৈতিকভাবেও এটা লাভজনক হয় না, কারণ খুব বেশি মানুষ এগুলোতে আসেন না।”
তিনি বলেন, যখন মানুষ জানে যে পরে আরও সুবিধাজনক হারে টাকা বৈধ করা যাবে, তখন সময়মত কর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে যায়।
রাজনীতি ও নীতির দিক থেকেও এটি ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ মন্তব্য করে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো বলেন, যদি কখনো প্রযোজ্য করের সঙ্গে অতিরিক্ত পেনাল্টি দিয়ে শেষবারের মত এ সুযোগ দেওয়া হয় এবং স্পষ্ট নীতি নেওয়া হয় যে পরে আর কখনো এই সুযোগ দেওয়া হবে না, তখন হয়ত ‘কিছুটা কাজে লাগতে পারে’।
তবে, তার মতে, এর স্থায়ী সমাধান হল নীতিমালার সংস্কার ও প্রযুক্তির ব্যবহার। যেমন, জমি বা বাড়ি কেনাবেচার ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর জন্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখানোর যে প্রবণতা রয়েছে, মৌজার দাম ‘হালনাগাদ’ করার মাধ্যমে তা দূর করা সম্ভব।
“এইসব জায়গাগুলোতে আমরা যদি মৌজার দাম ইত্যাদি হালনাগাদ করতে পারি, তাহলে এই সুযোগটাও থাকে না। সুতরাং আমার মনে হয় যে প্রযুক্তিকে আরো যদি আমরা ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারি এবং নীতিমালার পরিবর্তন যেগুলো দরকার সেগুলো যদি করতে পারি, তাহলে এটা কমে আসবে।”

‘অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো’
ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগে ‘আস্থা’ ফিরিয়ে আনাই আগামী বাজেটে সরকারের ‘সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার’ হওয়া উচিত বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান।
তার ভাষ্য, “আমাদের দেশে তো এখন যত শিক্ষিত তত কর্মহীনতার হার বেশি।”
এই সংকট মোকাবেলা করতে হলে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ চাঙ্গা করা এবং ‘কস্ট অফ ডুয়িং বিজনেস’ বা ব্যবসা করার ব্যয় কমানো জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
আর সেজন্য শুল্ক কাঠামো পরিবর্তন করা, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, নীতিমালার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, সিঙ্গেল উইন্ডো বাস্তবায়ন, লজিস্টিক্স পলিসির বাস্তবায়ন, বন্দরের সময় কমিয়ে নিয়ে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতির এ বিশ্লেষক।
পাশাপাশি নীতি সহায়তা এবং রাজস্ব খাতের কাঠামোকে ‘বিনিয়োগের অনুকূলে’ পরিবর্তন করার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এটা যদি আমরা করতে পারি তাহলে পরবর্তী যে দুটো চ্যালেঞ্জ- বড় একটা হল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় সৃষ্টি করা আর দ্বিতীয় যেটা সেটা হল–মূল্যস্ফীতি কমানো, দুটোর উপরে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সুতরাং আমার মনে হয় যে বাজেটের মূল এটা হতে হবে যে আমরা বিনিয়োগকে কীভাবে চাঙ্গা করতে পারি।”
তার মতে, বিনিয়োগের পাশাপাশি বাজেটের দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত প্রান্তিক ও স্থির আয়ের মানুষকে ‘স্বস্তি দেওয়া’, যার মাধ্যম সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি।
সিপিডির এই সম্মনীয় ফেলোর পরামর্শ, ডিজিটাল রেজিস্ট্রির মাধ্যমে সুবিধাভোগীর তালিকা থেকে ‘ভুল’ বা ‘অযোগ্য’ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার সমস্যা দূর করতে হবে।
এছাড়া তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে মানসম্মত শিক্ষা, বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে সচল করে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি।
সব সমস্যার মূলে ‘কম আয়’
রাজস্ব ঘাটতির রেকর্ডের মধ্যে চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য প্রকৃত রাজস্ব আহরণের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি রাজস্ব আহরণ লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, সমস্যা বাজেটের আকারে নয়, বরং সম্পদ আহরণের সক্ষমতায়। সেটা শক্তিশালী করতে প্রত্যক্ষ কর, পরোক্ষ কর আহরণ বাড়াতে হবে।
“পরোক্ষ করে অনেক সময় আমরা দেখি যে জনগণ দিচ্ছেন, সরকার পাচ্ছেন না। ভ্যাট অনেক পয়েন্ট থেকে কালেক্টেড হয়, সরকারের কাছে যায় না, এইসব ব্যাপার আছে।”
সেজন্য কর ভিত্তি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে অর্থনীতির এ গবেষক বলেন, “যারা দিচ্ছেন, তাদের ওপর জোর প্রয়োগ করে নয়, আরো ভিত্তি কীভাবে বাড়ানো যায় এবং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করলে এটা আমরা করতে পারি।”
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমার মনে হয় না বাজেটের সাইজ খুব বড়, কারণ আমাদের মত দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো এগুলোর জন্য টাকা লাগবে। এবং সবটাই যে অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে দিতে পারব তা না, এজন্যই ঘাটতি অর্থায়ন।
“আমরা ঋণ করি অভ্যন্তরীণ অথবা বৈদেশিক। কিন্তু সমস্যা সেটা না, সমস্যা হল যে আমরা যদি এটাকে ভালোভাবে ব্যবহার করি, তাহলে সেটা থেকে যে আয় আসবে, ওইটা দিয়ে আমি ঋণ পরিশোধ করতে পারব।”
তবে রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে গিয়ে যে ঋণ নির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন এই বিশ্লেষক।
তিনি বলেন, নতুন বাজেটে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদের পরিষেবা বা ডেট সার্ভিসিং ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের তালিকায় এক নম্বরে চলে এসেছে।
ঋণ নেওয়া উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য স্বাভাবিক হলেও এর মাত্রা যেন ঝুঁকি তৈরি না করে, সেদিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো।

খেলাপি ঋণের পেছনে ‘রাজনৈতিক’ হস্তক্ষেপ?
আর্থিক খাতকে অর্থনীতির ‘ব্লাডলাইন’ হিসেবে বর্ণনা করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগের আস্থা ‘পুনরূদ্ধার করতে পারব না’।
“বাজেটে আমরা আশা করব যে সংস্কারের ব্যাপারে আর্থিক খাতের একটা সুস্পষ্ট ধারণা থাকবে। অলরেডি সরকার কিন্তু ৬০ হাজার কোটি টাকার একটা রিফাইন্যান্সিং উইন্ডোর কথা বলেছে, যার প্রতিফলন বাজেটে হয়ত থাকবে, এখানে অর্থায়ন করতে হবে বাজেটে।”
তার ভাষ্য, “বাজেটে হয়ত আমরা আর্থিক খাতের কিছুটা সংস্কার ইত্যাদির ইঙ্গিত পাব। কিন্তু পুরোটাই নির্ভর করবে বাজেট যখন আমরা বাস্তবায়ন করব, তখন এই সংস্কার কর্মসূচিগুলোকে আমরা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারছি কিনা তার ওপর। যেমন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনভাবে কাজ করার একটা ক্ষমতা এবং সক্ষমতা; এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
“কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাতে রাজনৈতিক কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া অর্থনীতির অগ্রাধিকারের কথা বিবেচনায় রেখে ব্যাংকিং সেক্টরের ব্যবস্থাপনাটা নিশ্চিত করতে পারে। এইসব ব্যাপার বাজেটে ওইভাবে থাকে না। যখন বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হবে, তখন সামষ্টিক অর্থনৈতিক যে ব্যবস্থাপনা, সেই ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার স্বাধীন সত্তা রক্ষা করে যেন সহায়তা করতে পারে। এ বিষয়গুলো আমার মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ হবে।”
খেলাপি ঋণের চিত্র তুলে ধরে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যেখানে সরকারি হিসাবে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, প্রকৃত হিসাব প্রকাশের পর তা দেখা গেল প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৫-৩৬ শতাংশ।
খেলাপি ঋণ কমানোকে ‘একটি বড় চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে তুলে ধরে অর্থনীতির এ বিশ্লেষক বলেন, “এরকম একটা অবস্থায় তো কোনো ব্যাংকিং সেক্টরের টিকে থাকাই খুবই সমস্যা। এখন অন্তত একটা স্পষ্ট জায়গা সৃষ্টি হয়েছে যে প্রকৃত কত।
“কিন্তু যেটা একটু অ্যালার্মিং, সেটা হল, গত কয়েক মাসে আবার এটা (খেলাপি ঋণ) প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।”
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সামনের দিকে যাতে খেলাপি ঋণ আর নতুন করে সৃষ্টি না হয়, এটা হল এক নম্বর। কারণ আমরা দেখেছি যে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বিভিন্ন ব্যাংকের বিভিন্ন দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে এগুলো বেড়েছে, এটা যাতে নতুন করে আর না হয়।
“দুই নম্বর হল, পুরনো যে জঞ্জাল, এটাকে কীভাবে আমরা ক্লিয়ার করতে পারি এবং এই যে এখন সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, বা একীভূত করে এগুলোকে কিছুটা সুস্থিত করা। আমাদের যারা ডিপোজিটর ছিলেন অনেকে, লক্ষ লক্ষ, তাদেরকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া, এই বিষয়গুলোতে হাত দিতে হবে। সো দুই দিক থেকেই আমাদেরকে অ্যাটাক করতে হবে।”
‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন মসৃণ হোক’
২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের কথা থাকলেও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশ পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। জাতিসংঘের সিডিপি প্রস্তুতি পর্বের সময় বাড়ানোর সুপারিশ করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে আগামী সেপ্টেম্বরের সাধারণ পরিষদের সভায়।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কিছুটা বাড়তি সময় পাওয়া গেলে তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে, তবে সময় পাওয়া যাক বা না পাক, প্রস্তুতি দ্রুত শেষ করতে হবে।
“আমাদের প্রস্তুতি পর্ব দ্রুতই আমাদের শেষ করতে হবে, যাতে আমাদের এই যে বাজার সুবিধানির্ভর একটা প্রতিযোগিতার সক্ষমতা, এটা থেকে আমরা দক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতানির্ভর প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় যেতে পারি।
“তাহলে এখানে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, রপ্তানি কর্মকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত আছেন তাদের কস্ট অফ ডুয়িং বিজনেস কমানো, আমরা এখন বলছি যে সিঙ্গেল উইন্ডো করব, লজিস্টিক্স পলিসি বাস্তবায়ন করব, আমরা পেপারলেস ট্রেডিং সিস্টেম করব, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন, পোর্টে টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম আমরা কমাব, এগুলো আমাদের সহায়তা করবে।”
সেজন্য বাজেটের মাধ্যমে প্রণোদনার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি বাজেটের বাইরে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, “এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনকে যদি আমি টেকসই করতে চাই, উইথ মোমেন্টাম, এটাকে যদি স্মুদ করতে চাই, (আমাদের এগুলো করতে হবে)।”
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’
অর্থনীতির নানামুখি সংকটের মধ্যেও বড় অঙ্কের বাজেট ঘোষণা এবং তা বাস্তবায়নের কথা বলছে সরকার। তবে সেজন্য ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানোর ওপর জোর দিচ্ছেন মোস্তাফিজুর রহমান।
তার মতে, এ দুটো বিষয় নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগসহ সবক্ষেত্রেই ‘ইতিবাচক প্রভাব’ পড়বে।
“এটার প্রভাব রাজস্ব আহরণে পড়বে, বিনিয়োগকে চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে পড়বে; প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সরকার যে তার সেবা সাধারণ জনগণের কাছে নিয়ে যায়, সেটার ক্ষেত্রে পড়বে, সব দিকেই পড়বে।”