দৃষ্টিজয়ীদের বইমেলা

যাদের চোখে আলো নেই, তাদের বই পড়ার পরিসরকে আরও বিস্তৃত ও সহজ করার পরিকল্পনা নিয়ে ২০০৮ সালে যাত্রা করে স্পর্শ ফাউন্ডেশন।

পাভেল রহমানবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 7 Feb 2024, 04:05 PM
Updated : 7 Feb 2024, 04:05 PM

মোহিনী দাশের চোখে দৃষ্টি নেই, তাতে কি! বইমেলায় একটি স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্রেইল বইয়ের পাতায় আঙুল ছুঁইয়ে বিড়বিড় করে পড়ে যাচ্ছিলেন তিনি।

কাছে গিয়ে প্রশ্ন করতেই মোহিনী বললেন, তিনি পড়ছেন কবিতা। কীভাবে তিনি কবিতা পড়ছেন, তা নিয়ে কৌতুহলী হয়ে উঠতে দেখা গেল সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া কাউকে কাউকে।

যে স্টলে মোহিনী ছিলেন, সেটি দৃষ্টিহীনদের জন্য বিশেষভাবে ছাপানো ব্রেইল বই প্রকাশ করে। সেখানে তাদের নতুন বই পড়ার সুযোগও রয়েছে।

এক যুগ ধরে বইমেলায় এ সুযোগ দিয়ে আসছে স্পর্শ ফাউন্ডেশন। একুশে বইমেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বের হওয়ার গেটের পাশেই তাদের স্টল।

এবার বদরুন্নেসা কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করেছেন মোহিনী। কী কবিতা পড়ছেন জানতে চাইলে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' কবিতাটি আবৃত্তি করতে শুরু করলেন।

যাদের চোখে আলো নেই, তাদের বই পড়ার পরিসরকে আরও বিস্তৃত ও সহজ করার পরিকল্পনা নিয়ে ২০০৮ সালে যাত্রা করে স্পর্শ ফাউন্ডেশন। ২০০৯ সালে তারা প্রথম একটি ছড়ার বই ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রকাশ করে। ২০১১ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বইমেলায় অংশ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

স্টলের কর্মী নন্দিতা সাহা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, এ পর্যন্ত ১৩১টি বই ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রকাশ করে বইমেলায় এনেছেন তারা। এবার মেলায় ১৮টি নতুন ব্রেইল বই প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকাশিত নতুন বইয়ের মধ্যে রয়েছে- জিকরুল রেজা খানের 'চেনা চীন অচেনা হাংগেরী', নাজনীন নাহারের 'আলোর নিমন্ত্রণ', ফারসীম মান্নান্ন মোহাম্মদীর লেখা 'একটাই পৃথিবী' এবং বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কবিদের লেখা কবিতা নিয়ে 'কবিতা সংকলন'।

গত বইমেলায় এ প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ করেছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই একাত্তরের চিঠি, বিভূতিভূষণ বন্দ্যেপাধ্যায়ের উপন্যাস চাঁদের পাহাড়, মুহম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন ‘যারা বায়োবট’।

নন্দিতা সাহা বলেন, স্টলে এসে যে কেউ বই পড়তে পারেন। তাছাড়া মেলায় প্রকাশনা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এসব বই পরে আগ্রহীদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

স্পর্শ ফাউন্ডেশনের স্টলের সামনেই বড় করে ব্যানারে লেখা - 'মানুষ দৃষ্টিহীন বলেই অন্ধ নয়, মানুষ প্রজ্ঞাহীন বলেই অন্ধ'।

স্টলের আরেক কর্মী ঊষা বলেন, “সবাই যাদের অন্ধ বা দৃষ্টিহীন বলেন, আমরা তাদের বলি 'দৃষ্টিজয়ী’। চোখে না দেখলেও মনের চোখ দিয়ে তারা পৃথিবী দেখেন। বরং যারা চোখে দেখেও খারাপ কাজ করে, তাদের চেয়ে ভালো দৃষ্টিজয়ীরা।”

বুধবার ছিল বইমেলার সপ্তম দিন। মেলা শুরু হয় বিকেল ৩টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন লেখক আনিসুল হক, শাকুর মজিদসহ অনেকে আসেন মেলায়। বিভিন্ন স্টলে দেখা যায় বইপ্রেমীদের ভিড়।

কথা প্রকাশের ব্যবস্থাপক জাফিরুল বলেন, “লোকজন আসছেন, মেলা অনেকটাই প্রাণবন্ত। বিক্রিও হচ্ছে। তবে পয়লা ফাল্গুন থেকে বই বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করা যায়।“

মেলার পরিচালনা কমিটি জানিয়েছে, ৫০ হাজারের বেশি লোক বুধবার মেলার বিভিন্ন গেট দিয়ে প্রবেশ করেছে।

আর বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, এদিন মেলায় নতুন বই এসেছে ৬৯টি। মেলায় এ পর্যন্ত মোট ৪১৮টি নতুন বই এসেছে।

এদিন লেখক বলছি মঞ্চের অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার ইসহাক খান, প্রাবন্ধিক ও গবেষক মিল্টন বিশ্বাস, শিশুসাহিত্যিক সারওয়ার-উল ইসলাম ও কবি মেঘ অদিতি। 

মূল মঞ্চ

বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হয় ‘স্মরণ: গোবিন্দ চন্দ্র দেব’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক প্রদীপ কুমার রায়। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জয়দুল হোসেন ও সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি বিমল গুহ, শিহাব সরকার ও টোকন ঠাকুর। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মীর বরকত, কাজী মাহতাব সুমন এবং অনন্যা লাবণী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পুঁথি পাঠ করেন জালাল খান ইউসুফী। এছাড়া ছিল নূরননবী শান্তের পরিচালনায় ‘ভাবনগর ফাউন্ডেশন’ পরিবেশিত চর্যাপদের গান এবং মো. সাকিবুল ইসলামের পরিচালনায় নৃত্যসংগঠন ‘মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি একাডেমী’র পরিবেশনা।

সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী সুমন চৌধুরী, শাহনাজ নাসরীন ইলা, ডা. মকবুল হোসেন, অরূপ বিশ্বাস, করবী দাস, স্নিগ্ধা অধিকারী, নূরতাজ পারভীন এবং জান্নাত-এ-ফেরদৌসী। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন এনামুল হক ওমর (তবলা), মো. নূর এ আলম (কী-বোর্ড),  অসিত বিশ্বাস (এসরাজ) এবং নাজমুল আলম খান  (মন্দিরা)। 

বৃহস্পতিবার যা থাকবে

বৃহস্পতিবার বইমেলার অষ্টম দিন। মেলা শুরু হবে বিকেল ৩টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে স্মরণ  আহমদ শরীফ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন রাজীব সরকার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন মোরশেদ শফিউল হাসান ও আফজালুল বাসার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী।