মিয়ানমারের দূতকে ডেকে ‘কড়া প্রতিবাদ’ বাংলাদেশের

“রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা যেখানে কাজ করছি, সেই প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ঘটনা অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত, অগ্রহণযোগ্য,” বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 Feb 2024, 08:41 AM
Updated : 6 Feb 2024, 08:41 AM

মিয়ানমারে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের যুদ্ধের জেরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হতাহতের ঘটনায় ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়েকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে সরকার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তলবে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আসেন রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়ে। সেখানে তার সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশের অবস্থান তার সামনে তুলে ধরেন মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মিয়া মো. মাইনুল কবির।

পরে এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, “আজকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডাকা হয়েছিল। ডেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

“তাদের আভ্যন্তরীণ যে সংঘাত, সেটির কারণে আমাদের দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ, একইসাথে সেখান থেকে গোলাবারুদ এসে আমাদের এখানে পড়া এবং আমাদের মানুষ আহত-নিহত হওয়া, এই পুরো জিনিসটা তাদেরকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।”

মন্ত্রী বলেন, “রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা যেখানে কাজ করছি, সেই প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ঘটনা অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত, অগ্রহণযোগ্য। এটা আমরা জানিয়েছি।”

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের ক্ষমতা নেয় দেশটির সেনাবাহিনী। ২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষ দিক থেকে মিয়ানমারের তিনটি জাতিগত বিদ্রোহী বাহিনী একজোট হয়ে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণ শুরু করে।

বাহিনীগুলো হল- তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি-টিএনএলএ, আরাকান আর্মি-এএ এবং মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি-এমএনডিএএ। তারা শান, রাখাইন, চীন ও কেয়াহ রাজ্যে লড়াই চালাচ্ছে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সেনাপোস্ট দখল করে ইতোমধ্যে তারা সাফল্য দেখিয়েছে।

আরাকান আর্মি (এএ) এ জোটের অন্যতম অংশ। মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনের সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর একটি সশস্ত্র বাহিনী এটি। তারা রাখাইনের বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই করছে।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইনে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির যুদ্ধ চলছে গত কয়েকদিন ধরেই। শনিবার রাতে বিদ্রোহীরা বিজিপির একটি ফাঁড়ি দখল করে নিলে রোববার সকালে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১৪ সদস্য। এরপর তিন দিনে সেই সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ২২৯ জনে পৌঁছেছে।

এই ২২৯ জনের মধ্যে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি), সেনাবাহিনী, ইমিগ্রেশন সদস্য, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা রয়েছেন। তাদের নিরস্ত্র করে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।

বাংলাদেশ সরকার বলে আসছে, মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর এই সদস্যদের ফেরত পাঠানোর জন্য আলোচনা চলছে। তবে কীভাবে সেটা করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে রাখাইনের বেশ কিছু চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের মানুষের মিয়ানমার- বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় জড়ো হওয়ার তথ্য দিয়েছেন এপারে থাকা তাদের স্বজনরা।

ফলে নতুন করে মিয়ানমারের বেসামরিক নাগরিকদেরও অনুপ্রবেশ শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

রাখাইনে সেনা ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের লড়াইয়ের প্রভাব পড়ছে সীমান্তের এপারের জনগোষ্ঠীর মধ্যেও। আতঙ্কে অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে থাকছেন। 

সোমবার দুপুরে মিয়ানমার থেকে আসা গোলায় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের জলপাইতলী এলাকায় নারীসহ দুজন নিহত হন।

ঘুমধুম ইউনিয়নের মধ্যমপাড়ায় মঙ্গলবার সকালেও একটি মর্টার শেল এসে পড়ে এক বাড়ির উঠানে। তবে সেখানে কেউ হতাহত হননি।

স্থানীয়রা বলছেন, এখনও তারা গোলাগুলি ও মর্টার শেলের আওয়াজ শুনতে পারছেন। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে গুলি হচ্ছে; আবার বিদ্রোহীরাও পাল্টা গুলি চালাচ্ছে।

রাষ্ট্রদূতকে তলব করার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ব্রিফিংয়ে বলেন, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত সীমান্ত অতিক্রম করে মিয়ানমারের ২২৯ জনের আসার খবর তারা পেয়েছেন।

“এরপর কেউ এসেছে কি না জানি না, আসার সম্ভাবনা আছে। তারা আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে এবং কয়েকজন আহত, তাদেরকে প্রাথমিকভাবে কক্সবাজার, পরে চট্টগ্রামে স্থানান্ত করা হয়েছে।”