সরকার দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দিচ্ছে: টিআইবি

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বিভিন্ন দেশ টিআইর এই গবেষণার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিয়ে ফল পেয়েছে। বাংলাদেশ যদি এমন করত, বাংলাদেশও ফল অর্জন করতে পারত বলে আমরা মনে করি।”

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Jan 2024, 03:42 PM
Updated : 30 Jan 2024, 03:42 PM

সরকার দেশের দুর্নীতিবাজ, আইন লঙ্ঘনকারীদের স্বার্থ রক্ষা করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

তার ভাষ্য, সরকারি খাতে, বিশেষ করে সরকারি ক্রয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির ব্যপকতা বেড়েছে।

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচকের (সিপিআই) বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে এসে এ কথা বলেন ইফতেখারুজ্জামান। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিচারে গত এক বছরে বাংলাদেশে দুর্নীতি পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তাদের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের দুই ধাপ অবনমন ঘটেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচকের (সিপিআই) ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বিশ্বের ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৪৯ নম্বরে। গতবার এ তালিকায় বাংলাদেশ ১৪৭ নম্বরে ছিল। আবার অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) বিবেচনা করলে বাংলাদেশ অবস্থান এবার ১৮০ দেশের মধ্যে দশম, যেখানে গতবছর ছিল দ্বাদশ অবস্থানে।

কেন বাংলাদেশে দুর্নীতি পরিস্থিতি আরও খারাপ হল- এমন প্রশ্নে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশে যে বিব্রতকর ও হতাশাজনক চিত্র আমরা পেলাম তার পেছনে কয়েকটি কারণ হল- বাংলাদেশে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের যে কথা বলে আসছে এগুলো প্রতিপালন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অন্যদিক সরকারি খাতে দুর্নীতির ব্যপকতা বেড়েছে, বিশেষ করে সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে।

“অর্থ পাচার এবং আর্থিক অপরাধের বিষয়গুলো গণমাধ্যমে ব্যপক আলোচিত হলেও এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এরকম দৃষ্টান্ত বিরল বা নেই বললেই চলে। যারা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। আবার এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হলেও দেখা গেছে তা স্থগিত করে রাখা হয়েছে।”

তিনি বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা বেড়েছে। এভাবে দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রমোট করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষমতাবানরা এক রকমের বিচারহীণতার সুরক্ষা ভোগ করছেন।

ব্যাংকিং খাতে ‘লবি পাওয়ারের’ প্রভাব বেড়েছে উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এটা আগেও ছিল, এখন আরও বেড়েছে। যারা ঋণ খেলাপের জন্য দায়ী তারাই কিন্তু খেলাপী ঋণের জন্য কী নীতিমালা হবে, সেই নির্দেশনা অনেক সময় দিয়েছেন। এর পাশাপাশি অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন ধরণের আর্থিক অপরাধগুলো বেড়েছে ব্যপকভাবে। আমরা যেটা দেখতে পাই যে বাংলাদেশ বৈশ্বিক মানদণ্ডে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে এখন শীর্ষস্থানে রয়েছে।”

প্রতি বছরই দুর্নীতির এই ধারণাসূচক প্রকাশের পর সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এ বিষয়ে টিআইবির অবস্থান জানতে চাইলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। এটি একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা। বিশ্বের সবচেয়ে সুখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় টিআই এই সূচকটি করে থাকে। এদের গবেষণা পদ্ধতি তর্কের অনেকটা ঊর্ধ্বে। বিভিন্ন দেশ টিআইর এই গবেষণার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিয়ে ফল পেয়েছে। বাংলাদেশ যদি এমন করত বাংলাদেশও ফল অর্জন করতে পারত বলে আমরা মনে করি।”

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনি ইশতেহার নেহায়েত ‘কাগুজে বিষয়’ উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আমরা অন্য গবেষণায় দেখেছি, এই যে নির্বাচনি ইশতেহার, এটা আসলে কাগজে-কলমেই থাকে। এটা আর দেখা হয় না। আবার নির্বাচন এলে এর প্রয়োজন পড়ে। পরিবর্তন, পরিবর্ধন করে আরেকটি ইশতেহার করা হয়। এটা আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে আছে।

“তবে এবার ইশতেহার প্রকাশকালে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা কাজ করবেন এবং কাজের অন্যতম জায়গাটা হচ্ছে দুর্নীতি দমন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কথায় আস্থা রাখতে চাই।”

এইবারের সিপিআইতে ২৮টি দেশের স্কোর বেড়েছে, ৩৪টি দেশের কমেছে এবং ১১৮টি দেশের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। উন্নত বলে পরিচিত অনেক দেশেরই দুর্নীতির সূচক কমেছে।

এই সূচকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে বাজে অবস্থায় আছে কেবল মিয়ানমার ও আফগানিস্তান।

বাংলাদেশে তো কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি নেই তবুও কেন দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ পেছাচ্ছে এমন প্রশ্নে টিআইবির চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেন, “আপনি বলছেন যে আমাদের যুদ্ধাবস্থা না। কিন্তু আমাদের সরকারে যে কর্মকর্তারা আছেন, তাদের সঙ্গে যখন দুর্নীতি বা মানবাধিকার বিষয় নিয়ে কথা বলবেন, তখন আপনার মনে হতে পারে যে, দেশে একটা যুদ্ধ চলছে। তখন তারা বলতে থাকেন ‘এই ষড়যন্ত্র আছে ওই ষড়যন্ত্র আছে’। তাদের ভাব এমন যে সবাই তাদের সঙ্গে শত্রুতা করছে, সবাই তাদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। এই মানসিকতা নিয়েই তারা কাজ করেন।

“একটা প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেটা রিকগনাইজ করে সেটাকে মিনিমাইজ করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার যে মানসিকতা সেটা তাদের নেই। দুঃখজনকভাবে যারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বলে নিজেদের দাবি করছেন এবং বলছেন যে, তারা বিরাট ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় গেছেন, জনগণ তাদের একেবারে সাংঘাতিকভাবে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়েছে। তারাই আবার এই জনগণকেই সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করছেন। এবং সেই মানসিকতা থেকে যতদিন তারা মুক্ত না হবেন ততদিন আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন হবে এবং সেই পরিস্থিতি মনে হয় আমরা খুব সহসাই দেখতে পাচ্ছি না।”

আরও পড়ুন

Also Read: দুর্নীতির ধারণা সূচকে দুই ধাপ পেছাল বাংলাদেশ