০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

মিরপুরে সংঘর্ষের নেপথ্যে ‘অগ্নিকাণ্ড’ দেখছে হকাররা, ডিএনসিসি দেখছে ‘ফ্যাসিস্ট’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টিতে, ঘটনাটি ঘটেছে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের ‘সমন্বয়ের অভাবে’।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 30 Sep 2026, 11:25 PM

Updated : 30 Sep 2026, 11:25 PM

ঢাকার মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর কারণ হিসেবে দোকানে আগুন লাগার ঘটনাকে সামনে আনছেন হকাররা।

তাদের ভাষ্য, আগুন লাগার পর হকাররা ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর চড়াও হন।

অন্যদিকে সংঘর্ষের ঘটনাকে ‘পূর্বপরিকল্পিত’ বলেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এছাড়া ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাত থাকার ইঙ্গিত এসেছে ডিএনসিসি প্রশাসকের বক্তব্যে।

বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুরে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে যাওয়া সড়কে এ অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেটের নিচের দোকান সরানোর সময় ভেকুর আঘাতে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুন ধরে যায়।

আগুন লাগার পর পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। একদিক থেকে হকাররা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। অন্যদিকে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ।

সংঘর্ষের সময় তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের গাড়ি, ভেকু ও কয়েকটি বাসে ভাঙচুরও চলে। সাংবাদিকদের ওপরও হামলার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। এখন পর্যন্ত আটক করা হয়েছে ৩০ জনকে।

আগুন লেগে যাওয়া মার্কেটের দোকানি শরিফুল ইসলাম বলেন, “সিটি করপোরেশনের ভেকু মার্কেটের সীমানার ভেতরে ভাঙচুর করার সময় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুন লাগে। আমার দোকানসহ পাঁচটি দোকান পুড়ে গেছে।”

শরিফুলের ভাষ্য, “আগুন লাগার পর ক্ষুব্ধ হকার ও দোকানিরা সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর হামলা চালালে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের সঙ্গেও হকারদের সংঘর্ষ বাধে।

সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলে যান ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

তিনি বলেন, “হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিকল্পিত এবং ‘ফ্যাসিজমের দোসররা’ এ ঘটনা ঘটিয়েছে।”

তিনি বলেন, “যারা এই অরাজকতায় জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মামলা হবে। তদন্ত করে তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। অবৈধভাবে কাউকে এখানে ফুটপাত দখল করতে দেওয়া হবে না।”

সংঘর্ষের পর কারণ হিসেবে উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে সমন্বয় না থাকার কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

এদিন দুপুরে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে এসে তিনি বলেন, “আমি জেনেছি, এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত যিনি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, তারা সঠিকভাবে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগটা সম্পন্ন করেননি। এটা একটা সমন্বয়ের অভাব ছিল আমার কাছে মনে হয়েছে।”

সংঘর্ষের পর আবার উচ্ছেদ

ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর দুপুর ২টা ২০ মিনিটে আবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। বিকাল ৪টা পর্যন্ত অভিযান চলে। এতে পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি সদস্যদেরও দেখা গেছে।

দ্বিতীয় দফার অভিযানে মিরপুর-১০ নম্বর চত্বরের পাশের ফুটপাতগুলো ভেঙে ফেলা হয়। তবে ফুটপাতের দোকানিরা আগেই তাদের মালামাল সরিয়ে নেন।

সংঘর্ষের পর এলাকায় ডিএনসিসি প্রশাসকসহ স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দেখা যায়। তারা মিছিল নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। তাদের কাউকে কাউকে উচ্ছেদ অভিযানে সহযোগিতা করতেও দেখা যায়।

উচ্ছেদের পর অটোরিকশার দখলে

মিরপুর সরকারি গার্লস স্কুলের নিরাপত্তাকর্মীর পরিচয় দেওয়া সজল বলেন, “এই সড়কের ফুটপাতে এমনভাবে দোকান বসত, একটি গাড়িও যেতে পারত না। এমনও দেখা গেছে, রাস্তা বন্ধ করে দোকান বসিয়ে দিত।

“উচ্ছেদ না হলে এখানে এত বড় রাস্তা ছিল, তা বুঝতেই পারতাম না। কিন্তু এখন আবার অটোরিকশায় রাস্তার দুই পাশ ভরে গেছে। মনে হচ্ছে এটা কোনো স্টেশন।”

উচ্ছেদ অভিযানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা মারুফ হোসাইন বলেন, “হকাররা ফুটপাত ছাড়িয়ে রাস্তার মাঝে দোকান বসাতেন। ফলে এই জায়গাটায় সবসময় যানজট লেগে থাকত। মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ ছিল না।”

উচ্ছেদের পর রাস্তা দেখে ‘মনে প্রশান্তি লাগছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এই ফুটপাত এক সপ্তাহও ফাঁকা থাকবে না। আবার দখল হয়ে যাবে। সব সময় যদি এমন খোলামেলা থাকত, তাহলে কতই না ভালো হত।”

‘উচ্ছেদের নামে মালামাল লুট’

উচ্ছেদ অভিযানের নামে মালামাল লুট হওয়ার অভিযোগ তোলেন কয়েকজন হকার।

জুতার দোকানি ইসমাইল বলেন, “গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযান হচ্ছে। উচ্ছেদের নামে সিটি করপোরেশনের লোকেরা মালামাল জব্দ করেন। পরে সেই মালামাল ফের নিলামে আমাদের কাছেই বিক্রি করেন।

“তাহলে এটাকে উচ্ছেদ না বলে গরিবদের লুট করা হচ্ছে বলতে পারি।”

মেয়েদের পোশাক বিক্রয় করা খাদিজাও একই ধরনের অভিযোগ করেন।

এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় ৩০ জনকে আটক করার তথ্য দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার বলেন, “আটক ব্যক্তিদের তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। এ ঘটনায় যাদের সম্পৃক্ততা থাকবে না, তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। বাকিরা আইনের আওতায় আসবেন।”

এ ঘটনায় দুটি মামলা করার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকতা।

একটি মামলা পুলিশের পক্ষ থেকে, আরেকটি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে হওয়ার কথা রয়েছে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন।

আরও পড়ুন

পুরানো খবর:

মিরপুরে হকার উচ্ছেদ অভিযান: সিটি করপোরেশনের তিন গাড়িতে আগুন
মিরপুর সংঘর্ষের ঘটনায় সমন্বয়ের অভাব ছিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী