কপ৩১: জলবায়ু সম্মেলন থেকে এবার বাংলাদেশ কী চায়
জলবায়ু অভিযোজনের যে তহবিল, তার পরিমাণ বাড়িয়ে তিনগুণ করার দাবি তুলবে বাংলাদেশ। এছাড়া প্রযুক্তি স্থানান্তর, ক্ষয়ক্ষতি এবং অভিযোজনের ব্যাপারেও আলোচনা হবে।
এক একটি জলবায়ু সম্মেলন আসে, আর কার্বন নিঃসরণ কমানো, জলবায়ু অর্থায়ন ও উপকূলীয় বিভিন্ন দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়; আসে নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি।
সেসব প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়ন হয় তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেলেও সেই বাস্তবতা মেনেই এবার পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের সংযোগস্থলে তুরস্কের আনতালিয়ায় আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর হতে যাচ্ছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ৩১)। সম্মেলনে এবার আলোচনার নেতৃত্ব দেবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ‘তীব্র ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত’ দেশগুলোর অন্যতম অস্ট্রেলিয়া।
সম্মেলনে অংশ নিতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তাদের প্রস্তুতি শেষ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্মেলনের উচ্চ পর্যায়ের অধিবেশনেও অংশ নেবেন। এছাড়া বরাবরের মত পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের অনেকে এ সম্মেলনে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রস্তুতি, প্রধান অগ্রাধিকার ও প্রত্যাশা তুলে ধরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, “বাংলাদেশ এ সম্মেলনে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুরক্ষা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।”
বাংলাদেশের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. আতিক রহমানের মতে, “কপ সম্মেলনে প্রত্যেক দেশই হচ্ছে একটা পার্টি। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থাকার সময় এর নেতৃত্বে এগিয়ে ছিল। এখন বাংলাদেশ এলডিসি থেকে ডেভেলপিং কান্ট্রিতে প্রমোট হচ্ছে। তবুও এলডিসির নেতা ও মুখপাত্র হিসেবে আমাদের চাওয়া-পাওয়া এবং আলোচনার সূচিতে কী আছে, সে বিষয়ে ফিডব্যাক দিতে হয়। ওখানে আলোচনা, দরকষাকষির সিদ্ধান্তের চেয়ে বাস্তবায়নের সময়ে মূল সিদ্ধান্তগুলো পরিবর্তিত হয়।”
এবারের সম্মেলন কেন গুরুত্বপূর্ণ
জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাতের মতে, এবারের কপ হচ্ছে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সবাই ১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে অনুধাবন করে যে পৃথিবী অতি দ্রুত উত্তপ্ত হতে যাচ্ছে এবং তারা এর বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ চায়। যার প্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালে আইপিসিসি (ইন্টারগভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেইঞ্জ) গঠিত হয় এবং সেখানে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা শুরু হয়। ইতোমধ্যে তাদের ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এবং সপ্তম প্রতিবেদনটি ২০৩০ সালে বের হবে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশই এ প্রতিষ্ঠানের সদস্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমিয়ে আনতে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমাতে ১৯৯০ সালে একটি সমঝোতা তৈরি হয় এবং ১৯৯২ সালে প্রণয়ন হয় বৈশ্বিক আইন। এরপর ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিবছর নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব কত দূর এগোলো তা নিয়ে যে আলোচনা হয় সেটাই ‘কপ’ বা ‘কনফারেন্স অব পার্টিজ’ নামে পরিচিত।
অতীতে কপ-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইনুন নিশাত বলেন, “এ বছরের বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ মূলত বাস্তবায়নের দিক থেকে। অনেক রাজনৈতিক ও প্রক্রিয়াগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকে। যে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল, তার ফান্ড বা প্রসেস তৈরি হলেও মনিটরিং ও ইভালুয়েশনের মাধ্যমে দেখতে হবে বাস্তব কার্যকারিতা কতটুকু।”
এ বিশেষজ্ঞ বলছেন, “আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রির উপরে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে, যেমন সম্প্রতি ভারতে, যুক্তরাষ্ট্রে ও চীনে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, এখানেও হতে পারে। এই বিষয়ে প্রস্তুতি কাগজে-কলমে অনেক থাকলেও বাস্তবায়ন খুব কম। এছাড়া সব উন্নয়নমূলক কাজে ক্লাইমেট চেইঞ্জ অন্তর্ভুক্ত করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন) মির্জা শওকত আলী ইতোমধ্যে তুরস্কের আনতালিয়ায় পৌঁছেছেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এরইমধ্যে আমরা বৈঠক শুরু করেছি। দুই দিনব্যাপী এলডিসি মিটিং করলাম। বৈঠকে আমরা সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি, তার মধ্যে জলবায়ু অর্থায়নকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তি স্থানান্তর, ক্ষয়ক্ষতি এবং অভিযোজনের ব্যাপারে আলোচনা করেছি।”
বাংলাদেশ এবার জলবায়ু অভিযোজনের তহবিল বাড়িয়ে তিনগুণ করার দাবি জানাবে জানিয়ে মির্জা শওকত বলেন, “জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত তহবিলও বাড়াতে চাই। মিটিগেশন ওয়ার্ক প্রোগ্রামে ১.৫ ডিগ্রির টার্গেট ধরে রাখতে চাই, এবং ইউএই ওয়ার্ক প্রোগ্রামের অধীনে গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপ্টেশনের (জিজিএ) নির্দেশক ও সহনশীলতা অর্জনের জন্য তহবিল নিশ্চিত করতে চাই। সামনে ২০২৮ সালে গ্লোবাল স্টকটেক (জিএসটি) আসছে, সেগুলো নিয়েও আলোচনা হবে।”
২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস চুক্তির ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় একটি বৈশ্বিক পদক্ষেপ হচ্ছে গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপ্টেশন। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় প্রশমন বা কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি খাপ খাইয়ে নেওয়া বা অভিযোজনকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে।
শওকত আলীর ভাষ্য, “জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘের প্রধান আন্তর্জাতিক চুক্তি ইএনএফসিসিসি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রাপ্তিকে শুধু একক দেশের লাভ-ক্ষতি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার প্রাক শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ২ ডিগ্রি বা ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখতে পারলে, তা পুরো পৃথিবীর পাশাপাশি বাংলাদেশেরও বড় প্রাপ্তি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রকল্প ও ফান্ডের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান যথেষ্ট ভালো।
“তবে আমাদের মূল জোর হল ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স অর্জনে পর্যাপ্ত ফান্ডিং আসছে কিনা। বাংলাদেশ সরকার নিজেই এডিপি থেকে প্রতি বছর প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু সম্পর্কিত বাজেটে বরাদ্দ দেয়। জাতীয় পর্যায়ের প্রস্তুতি ও সক্ষমতার দিক থেকে আমরা এলডিসি ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছি।”
কী চেয়েছিল বাংলাদেশ, কী পেয়েছে
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালকসহ অন্যরা কপ সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যা যা উত্থাপন করবেন বলেছেন, এগুলোর প্রায় অনেকগুলোই আগের সম্মেলনগুলোতে উত্থাপন করা হয়েছে। তারপরও গত বছর ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ৩০ সম্মেলনে সরাসরি বড় কোন আর্থিক প্রাপ্তি বা দৃশ্যমান বড় কোনো অর্জন ঘটেনি।
বৈশ্বিক পর্যায়ে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার বা সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরির বিষয়ে তেল-উৎপাদনকারী দেশগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে বড় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা চুক্তি এর মধ্যে হয়নি। ফলে কপ৩০-তে বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনো বড় আর্থিক অনুদান বা বড় প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে এবারের জলবায়ু সম্মেলন থেকে বাংলাদেশ আসলে কী চায়, তা গত ২৪ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
জলবায়ু অর্থায়নে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির ব্যবধান যে ক্রমশ বাড়ছে, তা তুলে ধরে তিনি বলেন, “প্রথমত জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট তহবিল, বিশেষ করে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের অর্থপ্রাপ্তি সহজ করা, লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড চালু, কৃষি ও পানির নিরাপত্তায় প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্প গ্রহণে কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও মানুষের জন্য তহবিলের অর্থপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।”
একই বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু শুক্রবার ব্রিফিংয়ে বলেন, “কপ৩১ সম্মেলনে পর্যাপ্ত অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। বিশেষ করে অভিযোজন ও জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে অনুদান বৃদ্ধি এবং জলবায়ু তহবিলের আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানানো হবে।
“এই ফান্ডের পরিমাণ যখন বাড়ানো হবে, তখন আমাদের মত দেশগুলো সেই ফান্ডের জন্য আবেদন করবে এবং সেখান থেকে অর্থ ছাড় করা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো যাতে আরও বেশি অর্থ পায়, সে বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও দাবি সম্মেলনে তুলে ধরা হবে।”
মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে ১৫.২ বিলিয়ন ডলারের মত।
“এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে কত টাকা চাইব? সেটার নেগোসিয়েশন আসলে এখানে হয় না। এখানে নেগোসিয়েশনগুলো হয় গ্রুপ, অর্থাৎ আপনি একটা দেশ হিসেবে কোন গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত এবং সেই গ্রুপের নীতিগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।”
অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইনুন নিশাত বলেন, “আমাদের চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ রয়েছে। ২০ বছর আগে বাংলাদেশকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হলেও বর্তমানে আমাদের অবস্থান অনেক উন্নত হয়েছে। আমরা এখন ৪৭ নম্বরে আছি। মূল বিষয় হল, কপে শুধু বাংলাদেশের একক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় না।”
সম্মেলনে আলোচনা ও দর কষাকষির পদ্ধতি তুলে ধরে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, “এখানে আলোচনার দুটি স্পষ্ট ধারা রয়েছে। প্রথমত- ব্লু এরিয়া- যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিরা প্যারিস চুক্তি ও বৈশ্বিক আইন ধরে নীতিগত মূল আলোচনা করেন। দ্বিতীয়ত গ্রিন এরিয়া-যেখানে সাধারণ নাগরিক সমাজ, এনজিও ও বিভিন্ন প্রতিনিধিরা দাবি তোলে ও হৈচৈ করে। কিন্তু মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছে তা পৌঁছায় না। শোনার লোক মূলত ব্লু এরিয়াতেই থাকে।”
ফলে বাংলাদেশের জন্য আলাদা করে আলোচনার সুযোগও নেই বলে মনে করেন তিনি।
আইনুন নিশাতের ভাষ্য, “সম্মেলন শুরুই হয় রাষ্ট্রপ্রধানদের দিয়ে। আমাদের সরকারপ্রধানও যাবেন এবং সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ও দ্বিপাক্ষীয়ভাবে অনেক মিটিং হবে। এনজিও মহল হইচই করে ও বিভিন্ন রিপোর্ট তৈরি করে, কিন্তু মূল আলোচনা ও দর কষাকষি হয় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। সরকার প্রধান, পরিবেশমন্ত্রী, পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী, পরিবেশ সচিব ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মূল দায়িত্বে থাকবেন। আর এনজিও প্রতিনিধিরা শুধুই বক্তৃতা দেবেন।
“দ্বিপাক্ষীয় আলোচনা বা বৈঠকে (যেমন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বা গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির প্রধানের সঙ্গে) রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজেদের সমস্যা ও অর্থায়নের বিষয়টি তুলে ধরে প্রভাব ফেলতে পারেন।”
অর্থায়ন, লক্ষ্য, উদ্বেগ
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) বাস্তবায়নে অর্থায়ন না পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ প্রতিনিধিরা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী বলেন, “আমরা ২০২২ সালে ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান (এনএপি) প্রণয়ন করেছি। ২৭টি এলডিসি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও প্ল্যান জমা দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য এখনো সেভাবে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন পাইনি। আমরা আমাদের জাতীয় পর্যায়ের টাকা দিয়ে বাস্তবায়ন শুরু করলেও তহবিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই জলবায়ু অর্থায়ন বেশি চাচ্ছি।”
২০২৪ সালের কপ২৯ সম্মেলনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আজারবাইজানের বাকু সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিউ কালেক্টিভ কোয়ান্টিফাইড গোল (এনসিকিউজি)-এর অধীনে ২০৩৫ সাল নাগাদ মোট জলবায়ু অর্থায়ন হবে ৩০০ বিলিয়ন ডলার। আমরা চাচ্ছি তার মধ্যে সহনশীলতা অর্থায়ন যেন একটা উল্লেখযোগ্য অ্যামাউন্টে আসে এবং সেটা যাতে তিনগুণ হয়।”
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক একেএম সাইফুল ইসলাম মনে করেন, প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া, বৈশ্বিক যুদ্ধবিগ্রহ এবং তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর বাধার কারণে জলবায়ু অর্থায়ন ও নির্গমন হ্রাস প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তিনি বলেন, এবার কপ৩১-এ অভিযোজন তহবিল (উপকূলীয় অভিযোজন ও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন), ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ (সরাসরি অনুদান ও প্রযুক্তি সহায়তা), অর্থায়ন লক্ষ্য (২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতি বছর ৩০০ বিলিয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন), জাস্ট ট্রানজিশন (জ্বালানি খাতের পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প জীবিকা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা) এবং অন্যান্য এজেন্ডা (কার্বন ক্রেডিট, প্যারিস চুক্তির ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য ধরে রাখা এবং গ্লোবাল গোল অন এডাপ্টেশন) আলোচনায় থাকতে পারে।
বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার মতামত এবং জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোট, জি-৭৭ এবং সমমনা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে।
“কপ৩১ সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের প্রত্যাশা হল, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সহায়তায় সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি, যা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করে মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় কাজে আসবে।”
তিনি জানান, সম্মেলনস্থলে বাংলাদেশ সরকার ১০০ বর্গমিটার আয়তনের একটি প্যাভিলিয়ন করছে। সেখানে বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি, অভিযোজন অভিজ্ঞতা, এনডিসি ৩.০, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা, জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি, কার্বন বাজার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্যোগ তুলে ধরা হবে। প্যাভিলিয়নটি অভিজ্ঞতা বিনিময়, নীতি সংলাপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরিতে ব্যবহার করা হবে। এছাড়াও জুট প্যাভিলিয়ন থাকবে।
