চরম তাপমাত্রা সন্তানসম্ভবা নারী ও নবজাতকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে: নতুন সমীক্ষা
জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এর আগে প্রকাশিত নতুন এই জরিপ বলছে, গরমজনিত জটিলতা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।
চরম তাপমাত্রা গর্ভবতী মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রসূতি সেবামূলক কাজ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জলবায়ু সম্মেলন কপ ৩১-এর আগে প্রকাশিত নতুন এক জরিপে বলা হয়েছে যে, গরমজনিত জটিলতা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।
এই তথ্য এমন এক বছরে সামনে এল, যখন বিশ্বের ৩৩টি দেশে ইতিহাসের সবচেয়ে গরম জুলাই মাস রেকর্ড হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং জনগোষ্ঠীর প্রতি চরম তাপমাত্রার ক্রমবর্ধমান হুমকিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
‘গ্লোবাল চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশন ওয়েলকাম’ এর প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে যে, মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা ৭৩ শতাংশ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী জানিয়েছেন, গর্ভবতী নারীদের ওপর চরম গরমের ক্ষতিকর প্রভাব এবং এর ফলে নানা জটিলতা আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, অন্তত ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা গত পাঁচ বছরে ভ্রূণ বা নবজাতকের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বাড়ার কথা জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, চরম গরমের সঙ্গে সময়ের আগে জন্ম হওয়া বা কম ওজনের শিশুর জন্ম হওয়ার মতো সমস্যার যোগ ক্রমেই বাড়ছে।
আর ঠিক এ সময়েই আগামী মাসে তুরস্কে যে বড় বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ৩১) হতে যাচ্ছে, তার আগে প্রস্তুতিমূলক বৈঠকের আয়োজন করেছে ফিজি।
জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল এমন একটি সমীক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে দেখা গেছে, পাঁচ মহাদেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী গত পাঁচ বছরে প্রচণ্ড গরমের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্য জটিলতা বা রোগের লক্ষণ দেখেছেন।
তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত গরমের ফলে সময়ের আগে সন্তান প্রসব, মৃত সন্তান জন্ম নেওয়া, শিশুর ওজন কম হওয়া এবং মায়ের নানারকম শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।"
সাংবাদিকদেরকে দেওয়া গবষণা প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলো নিয়ে একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই জরিপ বা সমীক্ষায় অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভারত, যুক্তরাজ্য এবং জিম্বাবুয়ের ১,০০০ জন প্রসূতি ও মাতৃস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অংশ নিয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র গরমের কারণে গর্ভবতী মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় সব ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী (৯৮-৯৯ শতাংশ) নিজেই এমন ভুক্তভোগী মা ও শিশুদের চিকিৎসা দিয়েছেন বা সেবা করেছেন।
গর্ভবতী এবং সন্তান জন্মদানের পরের নারীরা চরম গরমের কারণে বিশেষ ঝুঁকির সম্মুখীন হন। গবেষণায় অতিরিক্ত গরমের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে অকাল প্রসব, শিশুর কম ওজন, মৃত শিশু জন্মদান এবং মায়ের বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গরম ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেই নির্দিষ্ট সময়ের আগে শিশু জন্মের ঝুঁকি প্রায় ৫ ভাগ বেড়ে যায়। আর চরম গরম বা তাপপ্রবাহের কারণে প্রসবের সময় জটিলতা হওয়ার ঝুঁকি ২৫ ভাগ বেড়ে যায়।
জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৩ শতাংশ) গর্ভাবস্থায় এমন জটিলতা দেখেছেন, যার জন্য অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ বা চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল এবং তারা বিশ্বাস করেন যে, এটি অতিরিক্ত গরম বা তীব্র তাপপ্রবাহের সংস্পর্শে আসার সাথে সম্পৃক্ত ছিল।"
স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা (যেমন- চিকিৎসক বা নার্স) নবজাতকদের ক্ষেত্রে কম ওজন বা শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া (৩৪ শতাংশ), পানিশূন্যতা ও গরমজনিত অসুস্থতা (৩৬ শতাংশ) এবং খাওয়ানো, শ্বাস-প্রশ্বাস ও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সমস্যার কথা (৩৩ শতাংশ) জানিয়েছেন।"
চরম গরম বা তীব্র তাপপ্রবাহ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, যেখানে এক-চতুর্থাংশের বেশি উত্তরদাতা (২৭ শতাংশ) জানিয়েছেন যে, গর্ভবতী নারী এবং পরিবারের জন্য চিকিৎসা কেন্দ্রে যাতায়াত করা বা স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া আরও কঠিন হচ্ছে।
অন্যদিকে, ২৯ শতাংশ উত্তরদাতা জরুরি বা জরুরি বিভাগে রোগী আসার সংখ্যা বাড়ার কথা জানিয়েছেন।
ওয়েলকাম-এর চেয়ারপারসন এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড এক বিবৃতিতে বলেছেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধাত্রী ও চিকিৎসকরা আমাদের বলছেন যে, অতিরিক্ত গরমের কারণে গর্ভবতী মা ও নতুন জন্ম নেওয়া শিশুদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। কোনও মায়েরই মনে এমন ভয় থাকা উচিত নয় যে, এই তীব্র গরম তার পেটের সন্তানের ক্ষতি করতে পারে।”
সূত্র: এনডিটিভি
