জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে ‘হতাশ’ শামা ওবায়েদ সমন্বয় চান দর-কষাকষিতে
“অর্থের অভাবের কথা বলে নতুন প্রতিশ্রুতি দিতেও অনীহা দেখা যাচ্ছে। অথচ যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এমন সীমাবদ্ধতা দেখা যায় না।”
জলবায়ু অর্থায়নে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, কপ সম্মেলনে বাংলাদেশের ভূমিকা ও দর-কষাকষি আরও জোরালো করার জন্য সমন্বয় বাড়তে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কেবল তহবিলের জন্য দর-কষাকষি নয়, বরং গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নেতৃত্বের অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছেন তিনি।
শনিবার সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংলাপে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। আমরা শুধু জলবায়ু তহবিলের জন্য দর-কষাকষি করতে চাই না। আমরা গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশকে নেতৃত্বের অবস্থানে নিতে চাই।”
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ৩১) সামনে রেখে দেশের ৩৩টি নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এ সংলাপ ও জাতীয় অবস্থানপত্র প্রকাশের আয়োজন করা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে এটা সম্ভব নয়। সরকারের একজন প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন কর্মী হিসেবে বলতে পারি, প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে শতভাগ আন্তরিক।
“সরকার গঠনের পর পরিবেশ নিয়ে তিনি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেগুলো পর্যালোচনা করলেই তার সংবেদনশীলতা বোঝা যাবে। তিনি বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে চান।”
বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আলাদা একটি শাখা খোলা হয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করা এবং কপ সম্মেলনে বাংলাদেশের ভূমিকা ও দর-কষাকষি আরও জোরালো করার জন্য আমাদের সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
“আমরা যখন বৈশ্বিক আলোচনার টেবিলে বসব, বিশ্বনেতা ও অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলব, তখন বাংলাদেশের সরকার, বেসরকারি খাত, বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য অংশীজনের একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান থাকা প্রয়োজন।”
জলবায়ু অর্থায়নে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, “অর্থের অভাবের কথা বলে নতুন প্রতিশ্রুতি দিতেও অনীহা দেখা যাচ্ছে। অথচ যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এমন সীমাবদ্ধতা দেখা যায় না।”
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে বিশ্বের সামরিক ব্যয় ছিল ২ হাজার ৮৮৭ বিলিয়ন ডলার।
আন্তালিয়ার কপ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “প্রথমত, জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট তহবিল, বিশেষ করে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের অর্থপ্রাপ্তি সহজ করা, লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড চালু করা, কৃষি ও পানির নিরাপত্তায় প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্প গ্রহণে কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও মানুষের জন্য তহবিলের অর্থপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
“দ্বিতীয়ত, উন্নত দেশগুলোকে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। এই সহায়তা মূলত অনুদান হিসেবে আসতে হবে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ঋণের বোঝা আরও না বাড়ে। পাশাপাশি জলবায়ু প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।”
বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান আধা শতাংশেরও কম হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন এর ভয়াবহ প্রভাব মোকাবেলা করতে হচ্ছে বলে তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
আন্তালিয়া সম্মেলনে অংশ নিতে যাওয়া বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের মানুষের দুর্ভোগের বাস্তব চিত্র ও সম্মিলিত কণ্ঠ জোরালোভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান শামা ওবায়েদ।
নাগরিক সমাজের প্রকাশিত অবস্থানপত্রের সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে কপ সম্মেলনের আলোচনার কৌশল চূড়ান্ত করার সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবিরের সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় সংলাপে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী।
