আইনের শাসন বলে যে একটা জিনিস, সেটা আমরা পাচ্ছি না: ইউনূস

“মানুষ যেভাবে বাঁচতে চায়, যেভাবে থাকতে চায়, সেভাবে থাকতে পারছে না,” বলছেন এই দণ্ডিত নোবেলবিজয়ী

আদালত প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 April 2024, 11:53 AM
Updated : 2 April 2024, 11:53 AM

শ্রম আইনের মামলায় দণ্ডিত নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস দুর্নীতি মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে এসে ‘আইনের শাসন’ না পাওয়ার কথা বলে আক্ষেপ করেছেন।

সাংবদিকদের তিনি বলেছেন, “আমার মাঝে মাঝে দুঃখ হয় এটা নিয়ে, সারা দুনিয়া বাংলাদেশ থেকে (ক্ষুদ্রঋণ) শিখতে চায়। আমাদের গৌরব বোধ করার কথা। তা না করে আমরা এমন কাজ করছি, যেন একটা পাপের কাজ করে ফেলেছি আমরা। এমন অনুভূতি হওয়ার তো কোনো কারণ ছিল না।”

গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের লভ্যাংশের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় মঙ্গলবার ঢাকার জজ আদালতে হাজিরা দেন ওই কোম্পানির চেয়ারম্যান ইউনূস।

ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন এ মামলায় দুদকের দেওয়া অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে মামলাটি বিশেষ জজ আদালত-৪ এ পাঠিয়ে দেন।

গত ১ জানুয়ারি শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় ইউনূসসহ চার জনকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয় ঢাকার একটি শ্রম আদালত। এরপর ১ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের টাকা আত্মসাতের মামলায় অভিযোগপত্র দেয় দুদক।

ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের চেষ্টাকে ‘শান্তি স্থাপন’ বিবেচনা করে ২০০৬ সালে ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। সরকারের অর্থায়ন ও সহযোগিতায় গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইউনূস এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

২০১১ সালে অবসরের বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ায় তার পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই বছর মার্চে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ইউনূসকে অব্যাহতি দেয়, তখন তার বয়স প্রায় ৭১।

ইউনূস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে যান এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আপিল বিভাগের আদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্তৃত্ব হারান।

দেশে ও বিদেশে বাম ধারার অনেক বুদ্ধিজীবী দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষুদ্র ঋণের বিরুদ্ধে বলে আসছেন। তাদের মতে, দারিদ্র্য বিমোচনে এই ঋণের ভূমিকা প্রমাণিত নয়। তবে ইউনূস বলছেন, ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থার জন্য জাতি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ ‘গর্ব’ করতে পারে। 

তার ভাষায়, “সারা দুনিয়ার সামনে এমন সব জিনিস নিয়ে এসেছি, তারা আমাদের কাছ থেকে জানার জন্য, বোঝার জন্য সেটা তাদের দেশে করার জন্য; সেটা উন্নত দেশ হোক, সেটা অনুন্নত দেশ হোক– কোনো পার্থক্য নেই। সবাই চায় আমাদের কাছ থেকে শিখতে। যে জিনিস সারা দুনিয়া শিখতে চায়, তাদেরকে তো আমরা বাধ্য করছি না! উৎসাহ নিয়ে তারা আসছে। সেই সুযোগটা আমরা দেব।”

ইউনূস তার ‘সামাজিক ব্যবসা’ ধারণার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, “মানুষ বিশ্বাস করে এটাতে, তারা এটাতে এগিয়ে এসেছে। দেশ-বিদেশের মানুষ এটাতে বিশ্বাস করছে। যে কারণে তারা উৎসাহিত হয়ে সারা দুনিয়ার থেকে এটা করার জন্য যেটাকে আমরা সামাজিক ব্যবসা বলছি। কী জিনিস, কী ব্যাপার, এটা কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আমরা হাজির করি নাই।

“তাদের মনে হয়েছে, এতে মানুষের মঙ্গল হবে। মানুষের মঙ্গলের জন্য আমরা করি। সেই জন্য দেশ-বিদেশের নেতারা এটা জানতে চায়, বুঝতে চায়, কর্মীরা বুঝতে চায়, দেশে প্রয়োগ করতে চায়। সেই জন্য নানা দেশে যাই। এই যে নানা দেশে যেতে হয়, এটা শুধু নিজের স্ফূর্তির জন্য যাওয়া তো না, এটা তাদের নেহাত আগ্রহ, যেহেতু তারা করছেন।”

সাংবাদিকদের উদ্দেশে ইউনূস বলেন, “আপনাদের কাছে এটাই অনুরোধ, দেশের মানুষের কাছেও জিজ্ঞেস করেন, আমরা সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারছি না কেন? কোথায় বাধা আমাদের? সেই জিনিসটা জানার জন্য। আমরা যেহেতু এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পেরেছি যে, মানুষ আমাদের কাছে শিখতে চায়। দেশ-বিদেশে, সারা দুনিয়ার এই মাথা থেকে ওই মাথা পর্যন্ত শিখতে চায় এবং সেটাতে তাদের জাতির মঙ্গল হচ্ছে বলে তারা মনে করে।

“আমরা বলছি যে, বর্তমানে যেভাবে আমরা অগ্রসর হচ্ছি, সারা দুনিয়া অগ্রসর হচ্ছে। তাতে দুনিয়া সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে, শেষ হয়ে যাবে। বিনষ্ট হয়ে যাবে। সেটা থেকে উদ্ধারের একটা রাস্তা আমরা তৈরি করছি। সেই জন্য মানুষের এত আগ্রহ। তারা বিশ্বাস করছেন যে, এই রাস্তা করলে সারা দুনিয়া উদ্ধার পাবে। যে জন্য আমরা তিন শূন্যের পৃথিবীর কথা বলে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে কী, একটা তিন শূন্য, কিন্তু মানুষ মনে করছে এটাতেই আমাদের মুক্তি। কাজেই মুক্তির পথ হিসেবে তারা মনে করছে।”

ইউনূস বলেন, “দুনিয়াতে পুঁজিবাদের কথা হয়েছে, কমিউনিজমের কথা হয়েছে, হচ্ছে, এখনো হচ্ছে। আমরা তো ওই রকম কোনো মতবাদ প্রচার করছি না! আমি শুধু বলছি, আপনি ইচ্ছা করলেই কাজটা করতে পারেন। করলে দুনিয়ার মঙ্গল হবে। আমরা এই বালা-মুসিবত থেকে– পৃথিবীর যে বালা মুসিবত, আমি তো নিজের বালা-মুসিবতের কথা বললাম, দেশের বালা-মুসিবতের কথা বললাম, পৃথিবীর একটা বালা-মুসিবত আমাদের চারদিকে ঘিরে আছে, সেই বালা-মুসিবত থেকেও আমাদের উদ্ধার করতে হবে। এবং সেটা করার পথে আমরা কিছুটা আলোর নির্দেশনা দিতে পারছি যে, এই পথে গেলে আমরা সেই মুক্তিটা পাব। সেই পথে অগ্রসর হচ্ছি। কিন্তু পদে পদে আমরা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছি।”

বাধাপ্রাপ্ত কেন হচ্ছেন? সাংবাদিকরা এ প্রশ্ন করলে ইউনূস বলেন, “সেটা আপনারা বিচার করেন। আমরা কী ব্যাখ্যা দেব বলেন।”

দেশের বালা-মুসিবত কী, সেই প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “আপনারা তো রোজ লিখছেন সেটা। কী– সেটা আমাকে বলতে বলছেন কেন? বালা মুসিবত হচ্ছে মানুষ যেভাবে বাঁচতে চায়, যেভাবে থাকতে চায়, সেভাবে থাকতে পারছে না। আইনের শাসন বলে যে একটা জিনিস, সেটা আমরা পাচ্ছি না কোথাও। রোজ আপনারা লিখছেন সেগুলো, আমরা আপনাদের কাছ থেকে তো শিখছি, বুঝে নিচ্ছি।”

ইউনূস নিজে কী দেখছেন, সেই প্রশ্ন সাংবদিকরা রেখেছিলেন। উত্তরে ইউনূস বলেন, “আপনারা যেভাবে দেখছেন, আমিও সেভাবে দেখছি। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে দেখছি। আপনিও দেশের নাগরিক হিসেবে দেখেন। আমরা তো দেশের অংশীদার। আমরা সবাই মিলেই তো এ দেশ।”

আইনের শাসন কোথায় নেই, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে দণ্ডিত এই নোবেলবিজীয় বলেন, “এটা আপনি পাতা উল্টে উল্টে লিস্ট করেন, আমি বলে দেব। অসুবিধা নেই তো। এগুলো আপনারা দেখবেন।”

সাংবাদিকরা তখন ইউনূসের মুখ থেকেই বিষয়গুলো জানতে চান। উত্তরে তিনি বলেন, “আমি কাগজের বস্তাটা আপনার হাতে তুলে দেই। এগুলো বক্তৃতা করে তো কোনো লাভ নেই!”

ইউনূস বলেন, “আমার অনুরোধ, এই রমজান মাসে আমরা সবাই মিলে নিজেদের দিকে তাকাই। আমরা নিজ নিজ ভূমিকা পালন করতে পারছি কি না? আমরা যেটা করতে চাচ্ছিলাম, সেটা করতে পারছি কি না? না করতে পারলে কীভাবে আমরা প্রতিবাদ জানাব। কীভাবে আমাদের কথাগুলো আমরা শোনাতে পারব, সেই শোনাবার পথ আমরা বের করি। পথ আমাদের বের করতেই হবে। এটা ছাড়া কোনো উপায় নেই।”

গত ৩ মার্চ আত্মসাতের এ মামলায় জামিন পাওয়ার পর আদালত থেকে বেরিয়ে ইউনূস সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তারা যেন তার ছবি তুলে তা সংগ্রহ করে রাখেন, কারণ তার ধারণা, ছবিটি ‘ঐতিহাসিক’ হয়ে যাবে।

সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে একজন সাংবাদিক বলেন, জজ আদালত অভিযোগপত্র আমলে নিয়েছে। এখানে ইউনূস ন্যায়বিচার পাচ্ছেন কি না।

জবাবে ইউনূস বলেন, এখনো তো বিচার শুরু হয়নি।

“আমি যে কথাটা আগে বলেছি, আবারও বলছি, এইটার থেকে আপনিও মুক্তি পাবেন না, দেশের কোনো মানুষ মুক্তি পাবে না। এটার কথা বলতে হবে, আমার কী ভূমিকা ছিল সেখানে? এই যে উনার হেনস্তাটা হলো, আমি কি হেনস্তা মনে করেছিলাম? আমি কি প্রতিবাদ করেছিলাম? যদি মানুষ হেনস্তা মনে করে থাকে। আর যদি মনেই করে থাকে যে হেনস্তা হয়নি, তাহলে তো ভিন্ন কথা। কিন্তু এর জবাব সবাইকে দিতে হবে একদিন।”