‘পাগলের গল্পগুচ্ছ’ বইটি ১৩ জন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের গল্প নিয়ে প্রকাশ করেছে বিদ্যানন্দ প্রকাশনী।
Published : 04 Feb 2024, 07:51 PM
পাগলাগারদে বসে আছেন ময়লা-ছেঁড়া জামা পরা এক ব্যক্তি, তার এক হাতে লাঠি, অন্য হাতে বই। আর দেয়ালে লেখা রয়েছে ‘পাগল বলে গালি দেই যারে, আদৌ কী শুনি তারে’।
অমর একুশে বইমেলায় এবার এরকমই ব্যতিক্রমী স্টল সাজিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।
মেলার চতুর্থ দিন রোববার বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের ৬৪৮ নম্বর স্টলে গিয়ে দেখা গেল এমন চিত্র।
স্টলে বসানো হয়েছে প্রতীকী এক পাগলকে, যিনি ‘পাগলের গল্পগুচ্ছ’ নামের একটি বই হাতে বসে আছেন। এটি দেখে ছোট-বড় অনেকেই কৌতূহল নিয়ে স্টলে ভিড় করছেন। অনেকেই শিশুদের নিয়ে ছবি তুলছেন।
‘পাগলের গল্পগুচ্ছ’ বইটি ১৩ জন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের গল্প নিয়ে প্রকাশ করেছে বিদ্যানন্দ প্রকাশনী।
পাবনার হেমায়েতপুরের চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন হাসপাতালের মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্র ঘুরে ঘুরে এই গল্পগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে।
গল্পগুলো অনুলিখনের মাধ্যমে পাঠযোগ্য করা হয়েছে বলে জানান গল্প সংগ্রাহক ও অনুলেখক মিজানুর রহমান সৈকত।
মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের প্রতি সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতেই বইটি প্রকাশ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একজন মানুষ যখন কিছুটা ভারসাম্যহীন হয়ে যায়, আমাদের সমাজে তাদেরকে অন্য চোখে দেখা হয়। তাদের শেকলবন্দি করে আটকে রাখা হয়। তাদের কথা কেউ শুনতে চায় না। তাদেরও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা আছে, এটা অনেকেই বুঝতে চায় না। তাদেরকে অচ্ছুৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
“অথচ এসব মানুষদেরও আলাদা একটা চিন্তার জগৎ আছে। তাদেরও যে অনেক গল্প আছে, না বলা অনেক কথা আছে, সেগুলো শুনতে আমাদের ইতিবাচক মনোভাব হয়ে উঠে না। তাই আমরা ১৩ জন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের বলা গল্প নিয়ে এই বইটি প্রকাশ করেছি।”
বইটি প্রচ্ছদ করেছেন সোহেল নামের এক ব্যক্তি, যিনি পাবনার হেমায়েতপুরের মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বইটির মূল্য ৩০০ টাকা। মেলায় ২২৫ টাকা দিয়ে বইটি কেনা যাচ্ছে। এই বইয়ের শতভাগ আয় মানসিক রোগীদের জন্য ব্যয় করা হবে জানান সৈকত।
তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে আমরা পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠাগারের তিনটি ইউনিট স্থাপন করেছি। এই বইয়ের আয় দিয়ে আরও বিভিন্ন স্থানে পাঠাগার তৈরি করা হবে।”
বইটির ভূমিকায় বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কিশোর কুমার দাস লিখেছেন, “আমরা পাগলকে নিয়ে কৌতুক লিখি, গল্প লিখি, সিনেমা বানাই। কিন্তু কোনোদিন পাগলের কাছ থেকে তার গল্প শুনতে চাইনি। পাগলদের প্রতি মানুষের এক ধরনের অবহেলা আছে। পাগলের কোনো কথা শোনা তো দূরে থাক, দূর থেকে পালাতে পারলেই যেন বাঁচি!
“বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবীরা প্রত্যন্ত এলাকায় কাজ করতে গিয়ে এমন শত শত মানুষের দেখা পেয়েছে যাদের কথা অন্য কানে অগ্রাহ্য শোনালেও আমাদের কাছে কল্পকাহিনীর চেয়ে কম মনে হয়নি। কিছু কথার অসামঞ্জস্যের দোষে কোনো মানুষের সব কথাকে অগ্রাহ্য করা অযৌক্তিক। স্বাধীন দেশের প্রত্যকের কথা প্রকাশের অধিকার আছে, সেই মতাদর্শে আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।”
রোববারের যত আয়োজন
রোববার অমর একুশে বইমেলার দোর খোলে বিকাল ৩টায় এবং খোলা থাকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন মেলায় নতুন বই এসেছে ৬৬টি।
বিকাল ৪টায় মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ: কাঙাল হরিনাথ মজুমদার’ শীর্ষক আলোচনা। এখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তপন মজুমদার। আলোচনায় অংশ নেন জাফর ওয়াজেদ এবং আমিনুর রহমান সুলতান।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বলেন, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ছিলেন একইসঙ্গে বিদ্রোহী এবং অধ্যাত্মবাদী। তার কর্মের ব্যাপ্তি ছিল অনেক দূর বিস্তৃত। সৃজনশীল বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি প্রান্তিক অবস্থানে থেকেও সমাজ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন।
‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন চলচ্চিত্রকার ও লেখক তানভীর মোকাম্মেল, শিশুসাহিত্যিক বেণীমাধব সরকার, গবেষক কাজল রশীদ শাহীন এবং কবি ফারুক আহমেদ।
সোমবার যা থাকছে
সোমবারও অমর একুশে বইমেলা বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে।
এদিন বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘সার্ধশত জন্মবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি: মোহাম্মদ রওশন আলী চৌধুরী’ শীর্ষক আলোচনা। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মাসুদ রহমান।
আলোচনায় অংশ নেবেন ইসরাইল খান এবং তপন বাগচী। সভাপতিত্ব করবেন সাইফুল আলম।