শিশু আদালত আইন মানছে কি?

শিশু আদালতে যে ধরনের কোমল ও সংবেদনশীল পরিবেশ থাকা দরকার, তা থাকছে না।

প্রকাশ বিশ্বাস, আদালত প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 August 2022, 07:05 PM
Updated : 3 August 2022, 07:05 PM

শিশুদের কোনো কাজ আইনের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ হলে তার বিচারে সংবেদনশীল আলাদা এজলাসের পাশাপাশি বিচারক ও আইনজীবীদের আলাদা পোশাকবিধি মানার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।

অনেক সময় হাতকড়া পরিয়েই সংশোধনাগারে থাকা শিশুকে অন্য পেশাদার অপরাধীদের সঙ্গে গাড়িতে অথবা কারাগারে থাকা শিশুকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে নিয়ে আসা হয়।

এতে শিশুর মনস্তত্ত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিশুকে আসামি বা অভিযুক্ত বলা যাবে না। বলতে হবে আইনের সঙ্গে সংঘাতে আসা শিশু।

শিশু আইন অনুযায়ী, আইনজীবী এবং বিচারকদের পোশাক এমন হতে হবে তা যেন কোনোভাবেই শিশুদের মনে আতঙ্ক এবং ভীতির উদ্রেক না করে।

কিন্তু শিশুদের বিচারে পোশাকবিধি মানছেন না কেউ। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কালো কোট আর গাউন পরেই বিচার কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন আইনজীবী ও বিচারকরা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের বিচারকরাই একই এজলাসে শিশু আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

ঢাকার মোট নয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকরাই শিশু আদালতেরও বিচারকাজ চালাচ্ছেন। এ বিচার চলে একই এজলাসে।

একই বিচারক, একই আইনজীবী, একই এজলাসে শিশু আইনের বিচার কাজ পরিচালনা করায় যে ধরনের মনোযোগ ও মানসিকতা থাকা দরকার তা থাকছে না।

শিশু আইনের বিচারে কোমল ও সংবেদনশীল আলাদা এজলাস জরুরি বলে জানিয়েছেন আইন ও বিচার বিভাগের জ্যেষ্ঠ আইন কর্মকর্তা, শিশু আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীসহ জ্যেষ্ঠ ফৌজদারী আইনজীবীরা।

নেই আলাদা এজলাস

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার ৩ নম্বর শিশু আদালতের একজন কমর্চারী জানান, তাদের আদালতে শিশু আইন মেনে কাজ করা সম্ভব হয় না।

শিশু আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আফরোজা ফারহানা আহমেদ অরেঞ্জ এমন সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন, “শিশু আইনের আওতায় বিচারে আসা শিশুকে আসামি বলা যায় না।

“সে যত বড় অপরাধ করুক পত্রিকায় তাদের ছবি, নাম কিছুই প্রকাশ করা যায় না।”

তিনি বলেন, “শিশু আদালতের মামলায় এজলাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কোনো মামলার বিচার কাজ চলার পর বিচারিক বাস্তবতায় যতটা সম্ভব শিশু বান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করি।

“কিন্তু আলাদা এজলাস নেই বলে পুরোপুরি সেটা সম্ভব হয় না।”

বিষয়টি মানতে পারেননি নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের প্রয়োজনীয় আশ্রয়, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসহ আইনি সহায়তা দেওয়া ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার।

“একই বিচারক একই আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা শুনছেন, শিশুদের বিচার করছেন, আবার পাচারের মামলাও শুনানি নিচ্ছেন। এ বিষয়টিইতো অবৈজ্ঞানিক।

“নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে শিশু আদালতের বিচার চলায় শিশুরা ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি ইত্যাদি মামলার শুনানি নিজ কানে শুনতে পায়। এটা তাদের চরিত্র ও মানসকিতার ওপর প্রভাব ফেলা স্বাভাবিক।”

শিশু আইনে বিচারের পরিবেশ নিয়ে অনুপ্রেরণা যোগানোর মতো কোনো কার্যক্রমও নেই বলে জানান আইনজীবী ও অধিকারকর্মী জীবনানন্দ চন্দ জয়ন্ত।

অবকাঠামোর সঙ্কট তুলে ধরে তিনি বলেন, “তাছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার অতিরিক্ত চাপ রয়েছে অথচ এসব আদালতকেই শিশু আদালত হিসাবে কাজ করতে হচ্ছে।

“একই এজলাসে বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের বিচারে শিশু আইন মানা যায় না।”

অপর একটি শিশু আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ রেজাউল করিম সমস্যাগুলো স্বীকার করে বলেন, “শিশু আইন অনুযায়ী শিশু আদালতের বিচার করা বিদ্যমান বাস্তবতায় কঠিন।

“সে জন্য আলাদা এজলাস হলে ভালো হয়। কিন্তু তার জন্য বড় আয়োজন করতে হবে। এ অবকাঠামোগত সংকট বিদ্যমান বাস্তবতায় মোচন কিভাবে সম্ভব বলতে পারব না।”

শিশু আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আফরোজা ফারহানা আইনের সঙ্গে সংঘাতে আসা শিশুদের নেতিবাচক প্রবণতাগুলো সংশোধনে উদ্যোগী হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।

“আমি শিশুদের অত্যন্ত আদর করে আমাদের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের আসনের পাশে তাদের বসাই। তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করি, তাদের কথা মন দিয়ে শুনি। শুনি তাদের অভিভাবকদের কথাও।”

শিশু আদালতে মাদকসহ কিশোর গ্যাংয়ের মামলা এবং খুন-ছিনতাইয়ে মামলায় আসা শিশুদের চরিত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে সে বিষয়ে সতর্ক করেন এই আইনজীবী।

আফরোজা ফারহানা বলেন, “আইনের আওতায় আসা শিশুদের মধ্যে দেখা যায় কারো মধ্যে নখ ইচ্ছে করেই বড় বড় করে রাখা, হাতে গায়ে উল্কি আঁকা, ফেইড ছেঁড়া জিন্সসহ অন্যান্য পোশাক পরা শিশু।

“সংশোধনাগারে এসব শিশুকে এসব থেকে বিরত থাকার পরামর্শ ও ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।”

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের ঢাকা জেলা ইউনিটের সমন্বয়ক মশিউর রহমান বলেন, “বিচারে আলাদা এজলাস যেমন থাকা উচিত। তার চেয়ে বেশি উচিত শিশুদের সংশোধনাগার সংশোধন করা।

“সেখানে প্রচণ্ড নৈরাজ্য রয়েছে। আইন তো মানাই হয় না। শিশুরা সেখানে সংশোধিত না হয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।”

যা আছে শিশু আইনে

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিশু আইন-১৯৭৪ যুগোপযোগী করে শিশু আইন-২০১৩ প্রণয়ন করা হয়। ২০১৮ সালে এ আইনের সংশোধন করা হয়।

আইনে ফৌজদারি অপরাধে বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে কোনো শিশু জড়িত থাকলে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন না দিয়ে শিশুর জন্য আলাদা প্রতিবেদন তৈরি করার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রে শিশু হিসেবে আলাদাভাবে আমলে নেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে। এ সময় দায়রা আদালতের সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্যাবলী সম্পাদনের ক্ষমতা দিয়ে শিশু আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে শিশু আইন প্রবর্তনের পর থেকে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী বিচারের ক্ষেত্রে যে ধরনের উদ্যোগ এবং প্রস্তুতি থাকা দরকার সেটা নেই।

২০১৩ সালের শিশু আইনের ১৯ (৪) ধারায় বলা হয়, অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, শিশু-আদালত কর্তৃক শিশুর বিচার চলাকালীন, আইনজীবী, পুলিশ বা আদালতের কোনো কর্মচারী আদালতকক্ষে তাহাদের পেশাগত বা দাপ্তরিক ইউনিফরম পরিধান করতে পারবেন না।

২৫ (১) ধারায় বলা হয়েছে, শিশু-আদালত প্রয়োজন মনে করলে, কোনো মামলা শুনানিকালে, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে সংশ্লিষ্ট শিশু ব্যতীত ধারা ২৩ এ উল্লিখিত যে কোনো ব্যক্তিকে উক্ত আদালত থেকে বহির্গমণের জন্য নির্দেশ প্রদান করতে পারবেন এবং উক্তরূপ নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উক্ত আদালত পরিত্যাগ করিতে বাধ্য থাকবেন।

২৮ (১) ধারায় বলা হয়েছে শিশু-আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলায় জড়িত বা সাক্ষ্য দেওয়া কোনো শিশুর ছবি বা এমন কোনো বর্ণনা, সংবাদ বা রিপোর্ট প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম অথবা ইন্টারনেটে প্রকাশ বা প্রচার করা যাবে না যা সংশ্লিষ্ট শিশুকে শনাক্তকরণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহায্য করে।

(২) উপ-ধারা (১) এ যা কিছুই থাকুক না কেন, শিশুর ছবি, বর্ণনা, সংবাদ বা রিপোর্ট প্রকাশ করা শিশুর স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হবে না মর্মে শিশু-আদালতের নিকট প্রতীয়মান হলে উক্ত আদালত সংশ্লিষ্ট শিশুর ছবি,বর্ণনা, সংবাদ বা রিপোর্ট প্রকাশের অনুমতি প্রদান করতে পারবে।

যেমন ছিল দুটি মামলার বিচার

২০১৮ সালের ২৭ মার্চ শ্যামলী রিং রোডের স্টার আবাসিক হোটেলের সামনে থেকে ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা দুইজনকে ২০টি ইয়াবা বড়িসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন।

আদাবর থানায় তাদের বিরুদ্ধে এস আই আনোয়ার হোসেন ১৯৯০ সালের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯ (১) এর ৯ (ক) ধারায় মামলা করেন।

ওই মামলায় একজনকে ২০ এবং অপরজনকে ১৯ বছর অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক দেখানো হয়।

পরে জন্ম সনদ, মাধ্যমিক পরীক্ষার সনদপত্র অনুযায়ী ১৯ বছর দেখানো ব্যক্তির বয়স ১৮ বছরের কম বলে নিশ্চিত হয় ঢাকার তৎকালীন শিশু আদালত ও অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ প্রথম আদালত।

ওই আদালতের বিচারক মো. আল মামুন শুনানি নিয়ে কাগজপত্র যাচাই করে তাকে শিশু হিসাবে গণ্য করে জামিন দেন।

পরে ওই বছরের ২৪ এপ্রিল একজনের বয়স ১৭ বছর উল্লেখ করে অপর ব্যক্তি জোবায়ের বিন হাসানের বয়স ২০ বছর উল্লেখ করেন ওই থানার এস আই মনিরুজ্জামান মনি।

মামলাটি পরে ঢাকার ৫ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল ও শিশু আদালতে বিচারের জন্য স্থানান্তর করা হয়। গত বছর ওই মামলার বাদী আনোয়ার হোসেন আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেন।

এসময় আইনের সঙ্গে সংঘাতে আসা শিশুর পক্ষে তার উপস্থিতিতে বাদীকে কালো কোট ও গাউন পরেই জেরা করেন আইনজীবী মো. হাম্মাদ এমদাদ হোসাইন।

বিচারকও কালো কোট এবং গাউন পরা ছিলেন। এজলাসও শিশু আদালতের বিচারের জন্য খালি করা হয়নি।

ঢাকার ১ নম্বর শিশু আদালতে গত বছর একটি মামলায় পুরনো ঢাকার শিশু আবু আওহিদ সাফির, সামিন এবং তারিফের পক্ষে মামলার শুনানিতে যান আইনজীবী রফিকুল ইসলাম।

শিশু আদালতের আইন অনুযায়ী তিনি কালো কোট গাউন ছাড়া সাদা শার্ট পরে শুনানি করতে গেলে বিচারক তাকে ‘কোর্ট ডেকোরাম’ না মানার জন্য উষ্মা প্রকাশ করে ‘কটূ মন্তব্য’ ছুড়ে দেন।

শিশু আদালতে মামলার সংখ্যা

ঢাকার ১ নম্বর শিশু আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এম এ বারী জানান, ওই আদালতে ২১৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ৫ নম্বর শিশু আদালতের পেশকার কামাল হোসেন জানান, গত জুন মাসের হিসাব অনুযায়ী তাদের আদালতে ২২৩টি মামলা রয়েছে।

৬ নম্বর শিশু আদালতের পেশকার সাইফুল ইসলাম জানান, শিশু আইনের বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৪৮৯টি। ৭ নম্বর শিশু আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আফরোজা ফারহানা আহমেদ অরেঞ্জ জানান তার আদালতে রয়েছে ২৫০টির মতো মামলা।

৮ নম্বর শিশু আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, তাদের আদালতে রয়েছে প্রায় ৫০০ মামলা। এছাড়া অন্য আদালতগুলোর মামলার সংখ্যাও কাছাকাছি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক